ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সামাজিক মাধ্যম

রাজনীতি, সামাজিক মাধ্যম ও ডুমস্ক্রলিং: মানসিক স্বাস্থ্যের নীরব আঘাত

রাজনীতি, সামাজিক মাধ্যম ও ডুমস্ক্রলিং: মানসিক স্বাস্থ্যের নীরব আঘাত
×

সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের নিজের ধারাটি আপনাকেই তৈরি করতে

বদরুল হাসান এবং দীপক গুপ্তা

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:০৯ | আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:১১

গভীর রাত—ঢাকা, দিল্লি, কাঠমান্ডু, কলম্বো কিংবা ইসলামাবাদ, স্বাভাবিকভাবে এই সময় একজন পেশাজীবী বা উন্নয়নকর্মীর ঘুমিয়ে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই তা হয় না। দেখা যায়, ফেসবুকের একটি পোস্ট ঘিরে ছোট্ট একটি রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে, আর সেখানে জমেছে মন্তব্যের সারি। একের পর এক নোটিফিকেশন আসছে, তর্ক ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। মূল পোস্টটির গুরুত্ব হারিয়েছে হয়তো অনেক আগেই, তবু সরে আসা কঠিন। মনে হয়—কিছু একটা বাদ পড়ে যাচ্ছে। এই অনুভূতিকেই বলে ফিয়ার অব মিসিং আউট -ফোমো তথা কোন তথ্যপ্রবাহ থেকে বঞ্চিত হবার আশঙ্কা। 

দক্ষিণ এশিয়ায় যারা শাসনব্যবস্থা, উন্নয়ন, জননীতি, গণমাধ্যম বা নাগরিক সমাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের জন্য রাজনীতি সম্পর্কে অবহিত থাকা পেশাগত কারণে অনেকটা অনিবার্য। কিন্তু দশক ধরে সেই সচেতনতার ধরন বদলে চলেছে। আগে রাজনীতির খবর আসতো নির্দিষ্ট সময়ের পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ে দরোজার নিচ দিয়ে বা রেডিও-টেলিভিশনে প্রচারিত সংবাদের মাধ্যমে। এখন তা আসে অবিরামভাবে—সামাজিক মাধ্যমের স্বয়ংক্রিয় বাছাই পদ্ধতি বা অ্যালগরিদম পরিচালিত ফিড বা সংবাদধারা প্রবাহের মাধ্যমে, নিরন্তর স্ক্রলের ভেতর দিয়ে। তাও প্রায়ই আবেগের আবরণে।
ফলে রাজনীতি এখন আর বিচ্ছিন্ন তথ্য নয়; এটি যেন আমাদের চারপাশে এক ধরনের স্থায়ী আবহ তৈরি রেখেছে। যার মানসিক প্রভাবও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আবেগের আবরণে সামাজিক মাধ্যমের স্বয়ংক্রিয় বাছাই পদ্ধতি

অ্যালগরিদমের যুগে রাজনৈতিক তথ্যের অতিরিক্ত চাপ
দক্ষিণ এশিয়ার ডিজিটাল জনপরিসরে রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চ সদা সরগরম। নির্বাচন, মেরুকরণ, ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, স্থান-কাল-পাত্র, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি, দুর্নীতির অভিযোগ কিংবা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা—এসব বিষয় থেকে তৈরি হয় অবিরাম উত্তেজনাপূর্ণ কনটেন্ট। 
আগের মতো কোনো নির্দিষ্ট সংবাদচক্র নেই। সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো দিন-রাত একেরপর এক নানা কনটেন্ট সামনে নিয়ে আসে। ইচ্ছা-অনিচ্ছায় রাজনৈতিক তথ্যের এক ধরনের অতিরিক্ত চাপ অনুভূত হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, অনলাইনে নেতিবাচক খবর একের পর এক দেখা—যাকে ডুমস্ক্রলিং বলা হয়—তা উদ্বেগ, মানসিক চাপ এবং সুস্থতার অবনমনের সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘ সময় ধরে এমন সংবাদ পরিবেশের দেখা সমাজের প্রতি অবিশ্বাস এবং অস্তিত্বগত উদ্বেগও বাড়াতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার মতো রাজনৈতিকভাবে মেরুকৃত অঞ্চলে এই অতিরিক্ত চাপ প্রায় কাঠামোগত বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

পরিচয়-ঘণিষ্ঠ রাজনীতি মানসিক চাপ বাড়ায়
সব রাজনৈতিক খবর সমানভাবে আমাদের নাড়া দেয় না। যেসব কনটেন্টে হুমকি-ধামকি, নৈতিক ক্ষোভ এবং দেশ-কাল-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা পরিচয়ের প্রশ্ন একসঙ্গে জড়িয়ে থাকে—সেগুলোই সবচেয়ে বেশি আবেগ তৈরি করে। দুর্নীতি বা কেলেঙ্কারির গল্প, সাম্প্রদায়িক বক্তব্য, তীব্র দলীয় অবস্থান কিংবা সংঘাতমুখী বিতর্ক—এসব কনটেন্ট সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ সময় মানুষের মনোযোগ ধরে রাখে। সম্ভবত প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম এমন কনটেন্টকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
ঐতিহাসিক কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনীতিতে পরিচয়, ধর্ম বা জাতি বোধের সঙ্গে ব্যক্তিগত অনুভূতির গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে। ফলে, এসব কনটেন্ট অনেক সময় দূরের কোনো তথ্য হিসেবে নয়, বরং ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে অনুভূত হয়। একধরণের অদৃশ্য ঐক্য-অনৈক্য তৈরি হয়। তখন মানসিক চাপও বেড়ে যায়।

তর্কে জড়ানো মানসিক ক্লান্তি বাড়ায়
রাজনৈতিক ক্লান্তির কারণ শুধু খবর দেখা নয়; বরং তাতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়া। খবর পড়া তথ্য দেয়, কিন্তু মন্তব্য করা বা তর্কে জড়ানো কেবল মানসিক উত্তাপ বাড়ায়।
অনলাইন বিতর্কে একবার ঢুকে গেলে, যুক্তিযুক্ত বিশ্লেষণের পাঠচুকিয়ে তা পরিণত হয় আত্মরক্ষা, কখনো একগুয়েমিতে। মনে হয় নিজের মূল্যবোধ বা পরিচয় আক্রমণের মুখে পড়েছে, অতএব ছেড়ে কথা বলা যাবে না!। গবেষণা বলছে, ডুমস্ক্রলিংয়ের সঙ্গে ফোমো, অতিরিক্ত সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার এবং মানসিক চাপের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে এর ফল আরও স্পষ্ট। অনলাইন রাজনৈতিক বিতর্কে ব্যয় হওয়া মানসিক শক্তি বাস্তব জীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকে দুর্বল করে। ফলে ক্ষতি শুধু আবেগগত নয়; পেশাগত কার্যকারিতারও।
ডুমস্ক্রলিংয় এমনই একটি প্রক্রিয়া, যা নিজেই নিজেকে শক্তিশালী করে। উদ্বেগ বাড়ে, মানুষ আরও খবর দেখতে থাকে; নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়; আবার স্ক্রল শুরু হয়। এভাবেই তৈরি হয় উদ্বেগ ও স্ক্রল করার এক ধরনের চক্রায়মান ফাঁদে।

প্রয়োজনীয় সচেতনতা কখন অতিরিক্ত চাপে পরিণত হয়
জননীতি বা শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে রাজনৈতিক সচেতনতা অপরিহার্য। কিন্তু প্রয়োজনীয় তথ্য আর অতিরিক্ত এক্সপোজারের সীমারেখা এখন ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অ্যালগরিদমিক ফিড অনেক সময় আমাদের ইচ্ছা ছাড়াই রাজনৈতিক কনটেন্ট সামনে নিয়ে আসে।
দক্ষিণ এশিয়ার আন্তঃসংযুক্ত রাজনৈতিক আলোচনাও এই চাপ বাড়ায়। একটি ফিডেই একসঙ্গে দেখা যায় জাতীয় রাজনীতি, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, প্রবাসী বিতর্ক, ধর্মীয় উগ্রতা এবং বৈশ্বিক মন্তব্য। ফলে একজন পেশাজীবী একাধিক রাজনৈতিক পরিবেশের চাপ একই সঙ্গে গ্রহণ করেন। যার অনেক ক্ষেত্রেই তথ্যগত লাভ খুব সীমিত।
জনস্বার্থে যত বেশি মানুষ রাজনীতিতে সচেতন থাকতে চান, ততই তারা রাজনৈতিক তথ্যের অতিরিক্ত চাপে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন। বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ বা বিশ্লেষণধর্মী উৎস থেকে সংগঠিতভাবে তথ্য গ্রহণ করলে তা সহায়ক হতে পারে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বিতর্কে জড়ানো প্রায়ই তথ্যের চেয়ে আবেগের উত্তাপই বেশি তৈরি করে।
অনেক পেশাজীবী নীরবেই অবিরাম তথ্যচাপ থেকে ক্লান্তি অনুভব করেন

টেকসই রাজনৈতিক সচেতনতার প্রয়োজন
সমাধান সামাজিক মাধম্যে রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে সচেতন নাগরিক ও পেশাজীবীদের রাজনৈতিক বাহাসে অংশগ্রহণ করা একটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু প্রয়োজন এমন একটি ভারসাম্য, যেখানে সচেতনতা বজায় থাকে, অথচ মানসিক স্থিতিও রক্ষা পায়।
গবেষণা বলছে, এখানে তিনটি সীমারেখা সহায়ক হতে পারে—ইচ্ছাকৃতভাবে তথ্য গ্রহণ করা এবং অনিচ্ছাকৃত এক্সপোজারের মধ্যে পার্থক্য করা; কনটেন্ট দেখা-পড়া ও তাতে প্রতিক্রিয়া জানানোর মধ্যে দূরত্ব রাখা; এবং উচ্চসংঘাতপূর্ণ সামাজিক মাধ্যমের পরিবর্তে বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ বা বিশ্লেষণধর্মী উৎস অনুসরণ করা।
দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক মানসিক চাপ খুব কম আলোচিত একটি বিষয়। অথচ অনেক পেশাজীবী নীরবেই এই অবিরাম তথ্যচাপ থেকে ক্লান্তি অনুভব করেন। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্লান্তি বিচারবোধ, মনোযোগ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি সক্ষমতাকেই দুর্বল করে দেয়, যা জনস্বার্থে কাজ করার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ক্রমে কেবল উগ্রতা ও উত্তেজনার দিকে এগুচ্ছে। সামাজিক ও ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্যের প্রবাহও সময়ের সাথে তাল রেখে উত্তেজনাপূর্ণ থাকবে। তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত রাজনৈতিক সচেতনতা কমানো নয়, বরং টেকসইভাবে যুক্ত থাকা।
যেসব পেশাজীবী সব সময় রাজনীতি ও খবরের মধ্যে ডুবে থাকার বদলে মানসিক স্থিতি ও ভারসাম্য বজায় রাখেন, তারা এই ধরনের পরিবেশেও ভালোভাবে পরিস্থিতি বুঝতে পারেন। তারা ঠিকঠাক মতন কাজকর্ম করে মানসিকভাবে স্থির থাকতে পারেন। কার্যত আমাদের পরিসরে বিশৃঙ্খল এই রাজনীতি প্রায় কখনোই থামবার নয়। তাই সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের নিজের ধারাটি আপনাকেই তৈরি করতে হবে, যাতে আপনি অযথা মানসিক বা স্নায়ুচোপের শিকার না হোন। 

বদরুল হাসান: উন্নয়ন ও মানবিক নীতিবিশেষজ্ঞ [email protected]
ড. দীপক গুপ্ত: সিনিয়র কনসাল্টিং এডভাইজার, এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চল, জাতিসংঘ [email protected]
 

আরও পড়ুন

×