সমকালীন প্রসঙ্গ
পাহাড়ের উৎসবগুলো শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে
নদীতে ফুল নিবেদনের মধ্য দিয়ে এ বছর পাহাড়ে শুরু হয় বর্ষবরণ উৎসব। ছবি-সমকাল
ঞ্যোহ্লা মং
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৩:৩৯ | আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮:২০
এপ্রিল মাস আসার আগেই পাহাড়ে উৎসবের আমেজ শুরু হয়ে যায়। পাহাড়ি নারীরা জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারি মাসেই নতুন পোশাক সংগ্রহের কাজ শেষ করেন। মার্চ এলেই দর্জিদের কাজের চাপে কাঙ্ক্ষিত পোশাকটি সেলাই না হওয়ার শঙ্কা জাগে তাদের মনে। আগের তুলনায় উৎসব উদযাপনের দিন বেড়ে যাওয়ায় পোশাক সংগ্রহের সংখ্যাও বেড়েছে। বেড়েছে উৎসব উদযাপনের খরচও। পাহাড়ে এ নিয়ে প্রতিবছর চা দোকানের আড্ডায় তুমুল আলোচনা, তর্ক চললেও ফল একই। খরচের পাগলা ঘোড়া যেন থামছে না।
পাহাড়িদের জীবন প্রণালি প্রকৃতিনির্ভর হলেও বর্তমান সময়ের তরুণরা আধুনিকতার নামে বাজারনির্ভর সংস্কৃতির দিকেই ধাবিত হয়েছে। তরুণরা সবকিছুতেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। উৎসব আয়োজন থেকে শুরু করে ব্যয় করার রেকর্ড সৃষ্টিতেও। জেলা-উপজেলা শহরের সংগঠন, সমাজ প্রতিনিধিদের দেখাদেখি প্রতিটি গ্রামে আজ উৎসব মানে যেন মানুষ জড়ো করা। উৎসব মানে যেন শামিয়ানা টাঙিয়ে মাইক ব্যবহার করে শব্দদূষণ ঘটানো।
পাহাড়ি গ্রামীণ সমাজে উৎসব মানে ছিল বটবৃক্ষের ছায়ায় নিজেদের ঐতিহ্যবাহী খেলাসহ পথচারীদের মাঝে খাবার পানি পরিবেশন। এখন শহর হওয়ায়, আধুনিক হওয়ার নামে প্রায় গ্রামে বটবৃক্ষগুলো কাটা পড়েছে। উচ্চ স্বরে সাউন্ড বক্স বাজাতে না পারলে যেন উৎসব উদযাপন সম্পন্ন হয় না। আগের দিনে পাড়া-প্রতিবেশী মিলে একত্রে উদযাপন করলেও এখন আর তা হয় না। একই পাড়া কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রতিযোগিতা করে উৎসব আয়োজন চলে। পাড়া-মানুষের ভাগাভাগিতে শিশু, তরুণরাও ভাগ হয়।
ব্রিটিশ শাসনামলে প্রকাশিত টিএইচ লুইনের ‘A FLY ON THE WHEEL or How I Helped to Govern India’ বইয়ের ২২০ পৃষ্ঠায় পাহাড়তলী এলাকায় মহামুনি বিহারকে কেন্দ্র করে মেলার বর্ণনা পাওয়া যায়। পাহাড়ের প্রথম ক্যাডার কর্মকর্তা শরদিন্দু শেখর চাকমার লেখায় বড় মেলা হিসেবে রাজানগর ও পাহাড়তলী বৌদ্ধ মন্দিরের উল্লেখ আছে। তাঁর বর্ণনায়, এ মেলা চলত ১৫-২০ দিন। মেলার প্রথম তিন দিন থাকত শুধু পাহাড়িদের জন্য। এবং প্রথম তিন দিনের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকত পার্বত্য চট্টগ্রাম পুলিশ বাহিনী। আচাই প্রু মারমা (৭৮) জানান, তিনি যখন খাগড়াছড়ি য়ংড বৌদ্ধবিহারের ছাত্র ছিলেন, বিহারকে কেন্দ্র করে মাসব্যাপী মেলা বসত। এ ছাড়া মানিকছড়ি, পানছড়ি আর রামগড়ে অবস্থিত মহামুনি বিহারকে কেন্দ্র করে মেলা হতো। আবার মহালছড়ি উপজেলায় মাইসছড়ির শাক্যমুনি ও গুইমারাতে চাইন্দামুনি মেলা বসত। শাক্যমুনি মেলা বসত ফেব্রুয়ারিতে, চাইন্দামুনি মার্চ মাসে আর মহামুনি মেলা চলত এপ্রিল মাসে। খাগড়াছড়ি সদরে পানখাইয়াপাড়ার মংসা অং মারমা (৬৩) য়ংড বিহারকে কেন্দ্র করে সপ্তাহব্যাপী মেলা বসতে দেখেছেন। একই পাড়ার কার্বারী নিংঅং মারমা (৫৩) য়ংড মেলা তিন দিন পর্যন্ত হতে দেখেছেন বলে জানান। আবার চাইহ্লা মারমা (৬৪) দেখেছেন মাসব্যাপী য়ংড মেলা বসতে। তিনি জানান, মেলা এক মাসব্যাপী হয়েও শেষ হতো না। শেষ হতে হতে আরও সপ্তাহ বা ১০ দিন চলে যেত। তিনি স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘য়ংড মেলা এত জমত, শেষ হতে চাইত না। বাজারে বাজরে ঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দিতে হতো, য়ংড মেলা শেষ হয়েছে।’ চাইহ্লা মারমার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করতে মংসা অং মারমা ও নিংঅং মারমাও বয়স্কদের মুখে এমনটি শুনেছেন বলে জানান।
বর্তমানে গুইমারা উপজেলায় এক দিনের চাইন্দামুনি মেলা বেশ জমলেও বাকি তিনটি মহামুনি মেলা এক দিন মাত্র চলে। অবশ্য এখন সেই ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলো ছাড়াও সাংগ্রাই, বিজু, বৈসু সময়ে প্রতিটি জেলা, উপজেলা ছাড়িয়ে ইউনিয়ন পর্যায়েও মেলার আয়োজন চলে। কিছু জায়গায় মেলা আয়োজন যেন আজ রীতির রূপ পেয়েছে। বছরটি এলেই যেন মেলাটি বসানো বাধ্যতামূলক। ঐতিহ্য উপস্থাপনের নামে অধিকাংশ মেলা যেন শুধুই লোকজনের সমাগম ঘটানো। পাহাড়ি নারীরা যেসব জিনিস বেচাবিক্রি করেন সেগুলোর অধিকাংশই পাহাড়ের সমাজ, সংস্কৃতি ঐতিহ্যের সঙ্গে সামজ্ঞস্যপূর্ণ নয়। নিজেদের পাতায় মোড়ানো পিঠার বদলে বিরানি, ভাজি করা ছোলা-বুটের বেচাবিক্রি চলে। এমনকি বারবিকিউ বিক্রি হয়। নিজেদের পাতায় মোড়ানো পিঠা, তেল ছাড়া পিঠা চলে কম। এসব মেলার দোকানে কয়েক প্রজাতির সবজির মিশ্রণকে পাচন বলে বিক্রি করা হয়। আমরা পাচন খাওয়ার জন্য সারাবছর প্রস্তুতি নিয়ে থাকি, সেই পাচন তরকারিকে প্রতিদিনের সবজি রান্নার সঙ্গে তুলনা করতে চলেছি। পাচন রান্নার প্রক্রিয়ায় নিজেদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য জড়িত। এটি ভুলে ব্যবসায়িক রূপ দিয়েছি।
আমি প্রতিদিন পাচন রান্নার প্রতিযোগিতার বিপক্ষে নই। তবে পাচন রান্নার যে আনন্দ, গুরুত্ব, সংস্কৃতি– সে দিকগুলোকে উপেক্ষা করে সবজিকে পাচন বলে চালিয়ে দেওয়া নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে হালকা করার সমান বলে বিশ্বাস করি।
পাহাড়ে মেলা আয়োজন, পাচন রান্না আর লটারি বিক্রির প্রতিযোগিতা বাড়লেও সাংস্কৃতিক অন্য দিকগুলো বাড়েনি। নিজেদের ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো আজ হুমকির সম্মুখীন। ঘিলা খেলা কীভাবে খেলতে হয় আজকালকার শিশুরা জানে না। মারমাদের ‘দ’ খেলার নিয়মগুলো জেলা-উপজেলা শহরের ছেলেমেয়েরা বলতে পারে না। আলাড়ি খেলার নিয়ম শুধু বয়স্কদের মুখে পাওয়া যায়।
আমাদের ছেলেবেলায় গ্রামীণ খেলাধুলা মানেই ছিল প্রকৃতিনির্ভর নানান উপকরণ। বাজার থেকে খুব কম জিনিসই সংগ্রহ করতে হতো। খেলাধুলার শেষে শুধু পুরস্কার হিসেবে উপহারসামগ্রী বাজার থেকে কিনতে দেখা যেত। এখন প্রাকৃতিক উপকরণ সব বিলুপ্তির সুযোগে পাহাড়ে লটারি প্রতিযোগিতা বেড়েছে। মেলা মানেই ‘মাংগং’-এর মতো জুয়া আর মদ বেচাবিক্রি চলে। ফলে প্রায় সময়ে দ্বন্দ্ব, ভয়ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হতে দেখা যায়।
আমাদের ছেলেবেলায় মায়েরা এক বা একাধিক পদ তৈরি করে অতিথিদের পরিবেশন করতেন। এখন যত বাড়িতে যাই, ১৫-২০ পদের রান্নার প্রদর্শনী যেন সাধারণ রীতি হয়ে উঠেছে। শহরের চাকরিজীবী, ভূমি মালিকরা ব্যয় করে বিজু পালন করতে থাকলে আগামীতে গ্রামীণ ভূমিহীন মানুষদের জন্য উৎসব পালন অসম্ভব হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ উৎসবই ধর্মীয়। বাংলা নববর্ষ বা বিজু, সাংগ্রাই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই উদযাপন করেন। পাহাড়ে উৎসবটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক শুধু নয়; অর্থনৈতিক দিক থেকেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সব সম্প্রদায়ের লোকজন সকল জনগোষ্ঠীর বাড়িতে বেড়াতে যান। বৈচিত্র্যপূর্ণ বাংলাদেশ নির্মাণে এসব উৎসবের ভূমিকা অপরিসীম। এমন উৎসব বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের প্রকৃত সংস্কৃতি, রূপ, রং আর বৈচিত্র্য বেঁচে থাকবে।
এমন উৎসবে যাতে সবাই শামিল হতে পারেন, খরচের মাত্রা টেনে ধরার মধ্য দিয়ে উদযাপনের আদি প্রথাকে অনুসরণ করতে পারি। উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্তদের মাঝে এ উপলব্ধি বেশি জরুরি। উৎসবটি সবার নাগালে রাখতে সবাইকে সচেতনভাবে উদযাপন করা উচিত। প্রতিযোগিতা আর খরচের উৎসব হয়ে গেলে এমন অসাম্প্রদায়িক উৎসব একদিন পয়সাওয়ালাদের উৎসবে রূপ পেতে বাধ্য।
শহরবাসীদের গ্রামীণ মূল্যবোধ ধারণ করে উৎসব উদযাপন করা উচিত। গ্রামীণ কৃষকের মতো উদযাপনই হবে সুন্দর বৈশাখী উদযাপন, নতুন বছরকে বরণ আর পুরাতন বছরকে বিদায় জানানোর উদযাপন। বাঙালি সমাজে বাংলা নববর্ষ দিনে নতুন কাপড় পরে, দল বেঁধে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে যান আবার অনেকে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। পরিবারে নিজেরা ভালো-মন্দ রান্না করেন। এবং মোটামুটি এক-দুদিনের মধ্যে আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু পাহাড়ের জনগোষ্ঠীদের বেলায় ওপরের সব কয়টি ছাড়াও বাড়িতে বাড়িতে বাহারি খাবার পরিবেশনের আয়োজন চলে। মারমা জনগোষ্ঠীর অনেকে এখন বলে থাকেন, ‘মারমারা উৎসব শুরু করতে জানলেও শেষ করতে জানেন না।’
গ্রামীণ সংস্কৃতিচর্চার দিন হিসেবে গ্রহণ করতে পারলে উৎসবটি সবার হয়ে থাকবে। গ্রামবাংলার উৎসবটি গ্রামীণ মানুষগুলো উদযাপন করতে না পারলে উৎসবটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। তাদের থেকে ছিনিয়ে এনে শহরে উদযাপন করতে থাকলে শহুরে মানুষের উৎসবে পরিণত হবে। একই সঙ্গে সচেতন পরিবারের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখায় ক্ষতি হওয়ার দিকটি যুক্ত হওয়ায় অভিভাবকদের আতঙ্কিত হতে দেখা যায়। এসব দিক আয়োজকদের উপলব্ধিতে আসা জরুরি বলে মনে করেন অনেকে।
বিজু, বৈসুতে কাউকে আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণ করতে হতো না। প্রতিবেশী আর আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে এ বছর খাগড়াছড়ি সদরের নিউজিল্যান্ড পাড়াবাসী নিজেদের মতো করে আয়োজন করেছিল। কিন্তু ঘোরাঘুরিতে প্রতিবেশীদের বাড়িতে যাওয়া-আসার সংস্কৃতিতে ভাটা পড়েছে বুঝতে পারি যখন নিউজিল্যান্ডসহ দক্ষিণ পানখাইয়া পাড়ার সংলগ্ন সড়কে রান্না করা নানান পদের খাবার ফেলে দেওয়ার স্তূপ দেখি। পর্যবেক্ষণের সত্যতা মেলে টমটমে দুই বয়স্ক নারী যাত্রীর কথোপকথন শুনে। তারাও হতাশ, আয়োজনের তুলনায় উপস্থিতি কম। তাদের মতে, তরুণরা নিজেরা নিজেদের পরিচিত বাড়িতেই শুধু বেড়াতে যায়। অপরিচিত কিংবা প্রতিবেশীদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছে কম। দুই বয়স্ক নারীর মতে, যেসব বাড়িতে তরুণ, কিশোর-কিশোরী ছেলেমেয়ে কম, তাদের বাড়িতে অতিথিদের জন্য আয়োজন সব নষ্ট হয়েছে। এ সবই এবারের বিজু, বৈসু কিংবা সাংগ্রাইয়ের কিছু নেতিবাচক দিক।
উৎসবকে উৎসবের জায়গায় রাখতে সবাইকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। উৎসব প্রতিযোগিতার জন্য নয়, দেখানোরও নয়। এটি চর্চার। এটি একটি প্রথা, যা উদযাপনের মাঝে কোনো ক্ষতি নেই। এই প্রথা পালনের মাঝে মানবসমাজের আদি মূল্যবোধের চর্চা বাড়বে। সুন্দর সমাজের জন্য আদি মূল্যবোধের চর্চা আবশ্যক। পানখাইয়া পাড়ার মংসাঅং মারমা, নিংঅং মারমা আর মংনু মারমার মতে, মারমারা দুর্বল হয়েছে এমন মাসব্যাপী মেলাগুলোতে সময় দিতে গিয়ে। দল বেঁধে মাসকে মাস মেলাগুলোতে নানান জুয়া খেলায় মেতে থাকতেন। খাগড়াছড়ি এলাকায় আগেকার মারমাদের এটি ছিল একটি চিরাচরিত ঘটনা। বর্তমানে বিহারকেন্দ্রিক মেলার আয়োজন কমেছে বটে, নানান সংগঠনকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রতিযোগিতা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। সংস্কৃতিকর্মী অংক্য মং মারমাও মনে করেন, মারমারা শুধু উৎসবকে ঘিরে নয়, পাশাপাশি সারাবছর ধর্মীয় বিভিন্ন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে প্রচুর সময় ও অর্থ ব্যয় করে থাকেন, যা সচেতনভাবে অনেক ক্ষেত্রে অপচয় রোধ করা সম্ভব।
এবারের উৎসব পালনের মাঝে পর্যবেক্ষণকৃত কিছু নেতিবাচক দিক উল্লেখ করা হলেও দারুণ কিছু ইতিবাচক দিকও লক্ষ্য করেছি, সেসব বিষয়ে পরর্বতী পর্বে প্রকাশের আগ্রহ থাকল।
ঞ্যোহ্লা মং: পরিচালক, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খাগড়াছড়ি
- বিষয় :
- পাহাড়ি সংস্কৃতি
- উৎসব পালন
