বিশ্ব বই দিবস
গিলগামেশ থেকে আরণ্যক: মৃত্যু যেভাবে যুক্ত করে বই
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:০১ | আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫:৫৫
পৃথিবীর প্রাচীনতম মহাকাব্য ‘গিলগামেশ’ ছিল পাথরের চাকতি বা ট্যাবলেটে লেখা। ১২টি ট্যাবলেটে সংরক্ষণ করা ছিল এই মহাকাব্য। ইলিয়াড, ওডিসিরও প্রায় দেড় হাজার বছর আগে নাকি রচিত হয়েছিল এই সাহিত্য। অথচ পাওয়া গেল এই সেদিন। ১৮৪৯ সালে উত্তর ইরাকের মসুলের কাছে নিনেভেহ নামে এক শহরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হলে জানা গেল, বই নিয়ে মানুষের সুকুমার বৃত্তির নিদর্শন দেড় হাজারের বেশি পুরোনো। ধ্বংসাবশেষের মধ্যে ছিল অ্যাসিরীয় রাজা আশুরবানিপালের গ্রন্থাগার। ধারণা করা হয়, এটিই বিশ্বের প্রথম গ্রন্থাগার, যেখানে বিষয় হিসেবে বই ভাগ করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের তথ্যানুযায়ী, এই আবিষ্কারের ফলে ৩০ হাজার ট্যাবলেট (পাথরখণ্ড) উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।
আশুরবানিপালের সময়কালের হিসাবে এখন পর্যন্ত পাওয়া পৃথিবীর প্রথম পাঠাগারের বয়স তাহলে ৬২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দেরও আগের। গিলগামেশের সূত্র ধরে জানা গেল দেড় হাজার বছর আগেও উন্নত পাঠাগারের প্রয়োজন অনুভব করেছিল মানুষ। প্রাচীন এই পাঠাগারের কথা উঠে এলো আজকের দিবসটির স্মরণে। আজ বিশ্ব বই দিবস। দিনটিকে ‘বিশ্ব গ্রন্থ ও গ্রন্থস্বত্ব দিবস’ হিসেবেও পালন করা হয়। বই সম্পর্কিত সব বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ২৩ এপ্রিল জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেস্কা) উদ্যোগে দিবসটি পালন করা হচ্ছে ১৯৯৫ সাল থেকে।
তবে বছরের এই দিনটিকেই বই দিবস হিসেবে পালনের সঙ্গে আবার জড়িয়ে আছে বিশ্বসাহিত্যের তিন কিংবদন্তির প্রয়াণের তারিখটি। ইংরেজি ভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক উইলিয়াম শেকসপিয়ার, স্প্যানিশ ঔপন্যাসিক মিগুয়েল দে থের্ভান্তেস (লা মানচার দন কিহোতোর জনক) এবং পেরুর বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও লেখক ইনকা গার্সিলাসো দে ভেগা তিনজনেরই প্রয়াণ দিবস ২৩ এপ্রিল।
বই দিবস হিসেবে পালনের ইতিহাস বুঝতে গেলে যেতে হবে স্পেনে একশ বছরেরও বেশি সময়ের আগের ইতিহাসে। স্পেনের লেখক ভিসেন্ত ক্লাভেল আন্দ্রেস ছিলেন মিগুয়েল দে থের্ভান্তেসের ভাবশিষ্য। গুরুর স্মরণে তাঁর প্রয়াণ দিবস হিসেবে ১৯২৩ সাল থেকে আন্দ্রেস স্পেনে বই দিবস পালন শুরু করেছিলেন। সেই তারখটিকেই পরে ইউনেস্কো বিশ্ব বই দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পালন শুরু করে। মূলত বই পড়া, বই ছাপানো, বইয়ের কপিরাইট সংরক্ষণসহ বিভিন্ন বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে দিবসটি পালন শুরু হয়। বিশ্ব বই দিবসের অন্যতম লক্ষ্য হলো লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের মধ্যে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এই দিবসটি পালন করছেন লেখক, পাঠক ও প্রকাশকরা।
যাক দাপ্তরিক কথা। পাঠক আশুরবানিপালের পাঠাগারের কথা শুনলেন। সে বহুকাল আগের কথা। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে এই হাতে মোবাইল, চোখের সামনে ল্যাপটপ, প্রযুক্তির সময়েও উন্নত বিশ্বের বহু দেশে মানুষ প্রতিযোগিতা করে বই পড়ে। সেসব দেশের লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা হয় মানবসভ্যতার ইতিহাস, পৃথিবীর গল্প।
বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বড় গ্রন্থাগার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেস। সুবিশাল এই লাইব্রেরির সংগ্রহে আছে সর্বাধিক সংখ্যক বই, রেকর্ডিংস, মানচিত্র ও পাণ্ডুলিপি। সংখ্যায় তিন কোটি ৩০ লাখের বেশি। সংগ্রহের দিক থেকে এরপর রয়েছে ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব চায়না। এখানে রয়েছে দুই কোটি ৮৯ লাখের বেশি বইয়ের সংগ্রহ। আর দুই কোটি ৬০ লাখের বেশি সংগ্রহ নিয়ে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গ্রন্থাগার ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব কানাডা। এক কোটি ৫৫ লাখের বেশি সংগ্রহ নিয়ে বিশ্বের চতুর্থ বড় লাইব্রেরি ব্রিটিশ লাইব্রেরি। তবে বিশ্বে কারা সবচেয়ে বেশি বই পড়েন এরও হিসাব কিন্তু ঠিকই রয়ে যাচ্ছে কোথাও না কোথাও।
সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন ২০২৫ সালে একটি জরিপ প্রকাশ করেছিল। তারা জানায়, ২০২৪ সালের বৈশ্বিক তালিকা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি সময় বই পড়েন। প্রতি সপ্তাহে গড়ে তারা প্রায় ৭ ঘণ্টা বই পড়েন, যা বছরে প্রায় ৩৫৭ ঘণ্টার সমান। সিইওর জরিপেই নাকি ধরা পড়েছে বাংলাদেশের মানুষের বই পড়ার আগ্রহ সবচেয়ে তলানিতে। রুশ বংশোদ্ভূত মার্কিন কবি জোসেফ ব্রডস্কি বলেছিলেন, বই পোড়ানোর চেয়েও গুরুতর অপরাধ হলো বই না পড়া। ১৯৮৭ সালে নোবেল বিজয়ী জোসেফ ব্রডস্কি প্রথম মার্কিন রাজকবি, যিনি সব স্তরের আমেরিকানের কাছে কবিতাকে সহজলভ্য করতে জাতীয় কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিলেন। তিনি নাকি দেয়ালে দেয়ালে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন কবিতা। তবে এরও অনেক আগে মার্ক টোয়েইন বলেছিলেন, বই পড়ার অভ্যাস নেই আর পড়তে জানে না এমন লোকের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
অথচ কী অনুতাপের বিষয়, এই বাংলা ভাষাতেই জন্মেছেন এমন দুজন লেখক, যারা মহাকাশ থেকে মহাকালকে ধারণ করে আছেন বই দিয়েই। বলছি বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় আর জীবনানন্দ দাশের কথা। বই দিবসের দিনে এখানে আরেকটি তথ্য উল্লেখ করতে হয় উইলিয়াম শেকসপিয়ার, মিগুয়েল দে থের্ভান্তেস আর গার্সিলাসো দে ভেগার পাশাপাশি বাংলা চলচ্চিত্রের কালজয়ী নির্মাতা ও লেখক সত্যজিৎ রায়েরও প্রয়াণ দিবস ২৩ এপ্রিল।
আমরা শুরু করেছিলাম গিলগামেশ দিয়ে। গিলগামেশকে ঐতিহাসিকরা ‘আধা কিংবদন্তি’ ও ‘আধা বাস্তব’ রাজা বলে স্বীকার করে নিয়েছেন। মহাকাব্য মতে, গিলগামেশের বাবা ছিলেন মানুষ, কিন্তু মা দেবী। গিলগামেশ নেমেছিলেন অমরত্বের সন্ধানে। জীবনানন্দ দাশ লিখবেন, ‘আমরা মৃত্যুর আগে কি বুঝিতে চাই আর? জানি না কি আহা, সব রাঙা কামনার শিয়রে যে দেয়ালের মতো এসে জাগে ধূসর মৃত্যুর মুখ।’ আর বিভূতিভূষণের দেবযানে পাবেন মৃত্যুর পরও অন্যলোকে বেঁচে থাকার কল্পনা থেকে আদতে অমরত্বের আকাঙ্ক্ষারই প্রতিভাস। আরণ্যকে ঢুকলে দেখবেন অরণ্য হলো এক অনন্ত জীবন আর মৃত্যুর আধার। নতুন অরণ্যের জন্ম, পুরোনো গাছের পতন– এই চক্রের মাঝেই লুকিয়ে থাকে মৃত্যু।
পাঠক বুঝবেন মানুষ লেখক মরে যায় কিন্তু তাঁর লেখা গল্পের মৃত্যু হয় না। আত্মস্বরূপের অভিজ্ঞানগত অকৃত্রিমতায় এইসব সাহিত্য অবিচ্ছিন্ন। সেই সকল অকৃত্রিম অনুভবের কিছু না পড়েই ফুরিয়ে দেবেন নিজের একটা জীবন? বই দিবসে আপনিও শুরু করতে পারেন বাংলা ভাষায় লেখা কোনো একটি বই।
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: কথাসাহিত্যিক ও সহকারী সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- বই
- বিশ্ব বই দিবস
