ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

আমাদের লোকনায়কেরা যেভাবে হারিয়ে গেল

আমাদের লোকনায়কেরা যেভাবে হারিয়ে গেল
×

মামুনুর রশীদ

মামুনুর রশীদ

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের বাল্যকালে অনেক ধরনের নায়ক দেখেছি। গণজীবন থেকে উঠে আসা এইসব নায়কের মধ্যে ছিলেন স্কুলের শিক্ষক, রাজনৈতিক দলের নেতা, সঙযাত্রার গায়ক-অভিনেতা; যারা গণবিরোধী চরিত্রগুলোকে অনুকরণ করতেন। তারপর ছিলেন নানা ধরনের গায়ক, অধিকাংশই বাউল; নানান ধরনের পরোপকারী–মহামারিতে লাশ নিয়ে চিতায় তোলেন অথবা গোরস্তানে কবর দেন। প্রবল বৃষ্টিতে ঢল নামলে ফসল বাঁচানোর জন্য কিছু লোক বুক দিয়ে প্রবল স্রোতকে আটকানোর চেষ্টা করেন। গ্রামের হতদরিদ্র অসুস্থ কোনো বিধবাকে চিকিৎসার জন্য কাঁধে করে হাসপাতালে নিয়ে যান। পহেলা বৈশাখ বা যে কোনো সময়ে তারা মেলা বসান, শিশুদের জন্য নানা বিনোদনের ব্যবস্থা করেন। স্কুলে কোনো অনিয়ম ঘটলে তারা রুখে দাঁড়ান। গ্রামের চেয়ারম্যান বা মেম্বারদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। 
এইসব নায়কের নানা আন্দোলন, সংগ্রাম–এমনকি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। আমাদের চলচ্চিত্রে, নাটকে, ছোটোগল্পে, উপন্যাসে এইসব চরিত্র দেখা যেত। আমাদের সমাজ জীবনে এই নায়কদের উপস্থিতি একটা বাসযোগ্য সমাজ নির্মাণ করত। অর্থ তাদের জীবনে কোনো নিয়ামক ছিল না। 

দুঃখজনক হলো, স্বাধীনতার পর আমরা যখন আত্মশাসনের অধিকার পেলাম, তখন এইসব নায়ক দুর্বল হতে শুরু করলেন। এক ধরনের পেশিশক্তি, অস্ত্র এবং অন্যদিকে ধর্মে রাজনৈতিক ব্যবহারের ফলে কিছু ভিলেনের আবির্ভাব হতে থাকে। এই নায়করা তখনও লড়াইটা চালিয়ে গেলেন। কিন্তু রাষ্ট্র তাদের পক্ষে না গিয়ে এই ভিলেনদেরই নানা দলে বিভক্ত করে দিল। অন্যদিকে গণনায়কদের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ল, দারিদ্র্য ও ছিন্নমূলের সারিতে তাদের স্থান হলো। 

ওইসব নায়কের একটা বড় আশ্রয়ের জায়গা ছিল ছাত্ররা। ছাত্ররা সব সময়ই এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মনোবৃত্তি পোষণ করত। কিন্তু স্বাধীন দেশে ছাত্র সংগঠনগুলো কোনো না কোনো দলের কর্তৃত্বে চলে গেল। ফলে ছাত্রদের মধ্যে সঠিক বিদ্রোহের জায়গাটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে গেল। যেসব নায়ক কৃষক ও শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করতেন, তারাও দলবদ্ধ হয়ে সংকীর্ণতার পথে যাত্রা করলেন। কালক্রমে ৫০ বছর ধরে এই সংগঠনগুলো একেবারেই শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। 

এর মধ্যে অতি সন্তর্পণে ধর্মে রাজনৈতিক ধারা ব্যবহারকারীরা ধর্ম ব্যবসায়ীদের জন্য জায়গা তৈরি করল। ওয়াজ মাহফিল, ইসলামী জলসা ইত্যাদির মাধ্যমে এরা গ্রামবাংলার নিরীহ ও ধর্মভীরু মানুষের মধ্যে স্থান করে নিল। এই নতুন মাত্রা সমাজকে আরও বিভক্ত করল। ধর্মের মধ্যেই সুফি ভাবনায় বিশ্বাসী মাজারকেন্দ্রিক এবং সুফি সংস্কৃতির লোকদের কোণঠাসা করার একটা পরিকল্পনা তাদের বহু আগে থেকেই ছিল এবং সেই উদ্দেশ্যে কাজ করার জন্য কিছু ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি তারা নিয়ে নিয়েছিল, যার একটা বড় ধরনের বহিঃপ্রকাশ আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেখেছি। সমাজে যে কোনো বিষয়ে নানা ধরনের মত ও পথ থাকে। এই পথগুলো মানুষের দ্বারা স্বীকৃত এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে। হঠাৎ করে কোনো ধরনের বলপ্রয়োগের ফলে সেসব যদি ধ্বংসের পথে চলে যায়, তা সমাজের জন্য শুভ কিছু বয়ে আনে না। 

এ পথগুলোর সমান্তরালে রয়েছে আমাদের জীবনের এক মহানায়ক নদী। এই নদীপথ বিশাল। কবি বলেছেন, ‘ধ্যানে তোমার রূপ দেখি গো স্বপ্নে তোমার চরণ চুমি,/ মূর্তিমন্ত মায়ের স্নেহ! গঙ্গাহৃদি-বঙ্গভূমি!’ বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে যে রেখাগুলো বঙ্গোপসাগরের দিকে গিয়ে বিলীন হয়েছে, সেই নদীপথগুলো ছিল আমাদের জীবনের ঠিকানা। পললে পললে গড়ে উঠেছিল পাললিক বঙ্গভূমি। বহমান নদী আমাদের জীবনে শুধু অর্থনৈতিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমাদের শিল্প-সাহিত্য সর্বোপরি আমাদের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল এই নদীকে কেন্দ্র করে। 

সেখানেও বলপ্রয়োগ। বলপ্রয়োগে তার গতিপথ পরিবর্তন করে ভরাট করে এক মরুভূমির জন্ম দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে এত বিশাল ষড়যন্ত্রে সে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, অভিমানী হয়ে ওঠে এবং দুই কূল ভাঙতে থাকে। একটি কথা প্রচলন করার চেষ্টা করা হয়েছে তা হলো, নদীশাসন। নদীকে শাসন করা এত সহজ! হাজার বছর ধরে সে তার গতিপথ নির্মাণ করেছে, সেই গতিপথকে মানুষের পক্ষে সরানো কি সম্ভব? বরং উচিত ছিল তার সঙ্গেই সহাবস্থান করা। পৃথিবীর অনেক দেশেই সেই নজির আছে। 

ভারতবর্ষে রেললাইন স্থাপনের আগে কোনো বড় ধরনের বন্যার সংবাদ পাওয়া যায়নি। খনার বচনেও এই বন্যার কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু রেললাইন স্থাপনের পর বন্যা একটা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়াল। অদূরদর্শী রাজনীতিবিদরা নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ফুড ফর ওয়ার্কের নামে গম দিয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না রেখে রাস্তা তৈরি করে ফেলেছেন। যে নদী ৬০ বছর আগেও নাব্য ছিল, সেই নদীগুলোও খুব দ্রুতই শুষ্ক হতে শুরু করে। নদীর জায়গায় ঘরবাড়ি, কলকারখানা, দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে ব্যাপকভাবে। 

সরকার প্রায়ই এসব নদীর জায়গা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে। পুনরুদ্ধারের যে চিত্র দেখা যায়, তাতে এমন সব স্থাপনা তারা নির্মাণ করেছে, তার মধ্যে বহুতলবিশিষ্ট দালানকোঠাও রয়েছে। দু-এক জায়গায় ছোটোখাটো দালানকোঠা ভেঙেও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে হঠাৎ করেই এই উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। প্রভাবশালী নদীখেকোরা তাদের শক্তি খাটিয়ে সরকারি সিদ্ধান্তকে পর্যুদস্ত করে। এই দখলের মানসিকতাও বিকৃত রাজনীতিরই ফল। এভাবে তারা বন উজাড় করেছে, পাহাড় কেটে বিনাশ করেছে। এসব ভিলেনের সঙ্গে আমাদের নায়কেরা কিছুতেই পেরে উঠছেন না। যদিও ততদিনে নায়করা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন অথবা কেউ কেউ ভিলেনও হয়ে গেছেন।

নদী ভরাট, নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের পরিণাম ইতোমধ্যে আমরা পেতে শুরু করেছি। নানা ধরনের রোগ-ব্যাধি, পরিবেশদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর প্রবল প্রভাব পড়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কোনো সরকারি প্রচেষ্টাই সফল হবে না। প্রয়োজন আমাদের নায়কদের। নায়করা যদি এগুলো প্রতিরোধ করতে না পারেন তাহলে একটা গড্ডলিকা প্রবাহে দেশটাই পঙ্গু হয়ে যাবে, যার অনেকটা কাজ ওই ভিলেনরা করে ফেলেছে।

এই ভিলেনরা যে প্রকৃতির অবদানকে দ্রুত অর্থে পরিবর্তন করতে পারে, নদী থেকে বালু উত্তোলন তার একটা বড় প্রমাণ। সরকারি নির্দেশ ছাড়াই প্রতিদিন বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, যা একেবারে অপরিকল্পিত এবং দারুণভাবেই  স্বেচ্ছাচার। সরকার পরিবর্তন হলেও আবার আরেক দল সরকারের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এই কাজে লেগে পড়ে। প্রচুর পরিমাণে নির্মাণকাজ চলছে এবং নির্মাণকাজে বালুর প্রয়োজন তীব্র। কাজেই নদীর তলদেশের বালু সেখানে সোনার দামে বিক্রি হয় এবং নগদ অর্থের জন্য লোভী এই ভিলেনরা তাদের প্রভাব খাটিয়ে নদীকে বালুশূন্য করে তুলছে। তাই শেষ কথা হচ্ছে, মানুষের জাগরণ। গণনায়কদের রুখে দাঁড়াতে হবে। নদীর আরেক নাম জীবন। সেই জীবনকে রক্ষা করার দায় জনগণের। 

মামুনুর রশীদ: নাট্যব্যক্তিত্ব
 

আরও পড়ুন

×