ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ফিলিস্তিনে সার্বভৌমত্বহীন নির্বাচন কীসের প্রতিনিধিত্ব করে

ফিলিস্তিনে সার্বভৌমত্বহীন নির্বাচন কীসের প্রতিনিধিত্ব করে
×

ছবি: সংগৃহীত

মারিয়াম বারঘুতি

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫:০২ | আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫:০৫

আজ ২৫ এপ্রিল ফিলিস্তিনিরা চার বছর মেয়াদের জন্য পৌরসভা ও গ্রাম পরিষদের প্রতিনিধি বেছে নিতে স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন। বছরের পর বছর ধরে জাতীয় নির্বাচন বারবার স্থগিত হওয়ার পর এইবার তারা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। আর ২০০৬ সালের পর থেকে দেশটিতে কোনো আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা, আল-বিরেহ ও নাবলুসের মতো শহরগুলোতে রাস্তার ধারে স্থানীয় প্রার্থীদের বিলবোর্ড দেখা যাচ্ছে, আর গ্রামগুলোতে খোলা জায়গায় প্রার্থীদের পোস্টার লাগানো হয়েছে। এই নির্বাচন ঘিরে একদিকে যেমন সংশয় রয়েছে, তেমনি অন্যদিকে রয়েছে সতর্কতার সাথে প্রত্যাশাও। ফিলিস্তিনিদের জন্য এই নির্বাচনই এখন সীমিত হলেও এক ধরনের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একমাত্র অবশিষ্ট নির্বাচনী ব্যবস্থা। 

নতুন করে গণতান্ত্রিক মুহূর্ত বলে একে চিহ্নিত করার পরিবর্তে শাসনের পুনরুৎপাদনকেই প্রতিফলিত করে, যদিও এই নির্বাচনগুলোর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এরই মধ্যদিয়ে বহুকিছু বেরিয়ে আসে। যেমন– অবিরাম চাপ, সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব, হ্রাসপ্রাপ্ত সম্পদ এবং ইসরায়েলি-পরিকল্পিত বিভাজন সত্ত্বেও ফিলিস্তিনিরা ঠিক সেইসব কাঠামোর মাধ্যমেই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়, যা তাদের সীমাবদ্ধ করে রাখে।

এই নির্বাচনগুলো কোথায় এবং কাদের জন্য অনুষ্ঠিত হচ্ছে তার মধ্যেও বাস্তবতা ফুটে উঠে। দখলকৃত পশ্চিম তীর জুড়ে ভোটগ্রহণ চলছে, কিন্তু গাজায় তা কেবল একটি পৌরসভাতেই সীমাবদ্ধ। দেইর আল-বালাহ, যা ফিলিস্তিনিদের সেই খণ্ডিত রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটকে উন্মোচিত করে, যার মধ্যদিয়ে তাদের চলাফেরা করতে বাধ্য করা হয়েছে। 

সার্বভৌমত্বহীন প্রতিনিধিত্ব
ফিলিস্তিনি প্রেক্ষাপট মৌলিকভাবে অগণতান্ত্রিক পরিস্থিতিতে রয়েছে। শুধু এই কারণে নয় যে, ফিলিস্তিনিরা প্রায় দুই দশক ধরে জাতীয় নির্বাচন করেনি, বরং এই কারণে যে তারা এমন এক দমনমূলক শক্তির দ্বারা শাসিত, যাকে তারা বেছে নেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সরকার সমর্থনপুষ্ট ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ফিলিস্তিনি জীবনের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণ ও বলপূর্বক পরিচালনা করে। ফিলিস্তিনে বসবাস করার মানে হল নিজ জনগোষ্ঠী থেকে জোরপূর্বক বিচ্ছিন্ন থাকা, রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা ও অংশগ্রহণের জন্য গ্রেফতারের অবিরাম হুমকির মুখে জিম্মি থাকা এবং ক্রমবর্ধমান দখলদারিত্ব বিস্তারের মধ্যে স্থায়ীভাবে জরুরি অবস্থার মধ্যে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। এর ফলে কার্যকরী বা প্রকৃত রাজনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ প্রায় অনুপস্থিত।

গাজায় ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বহাল রাখার মাধ্যম বোমা ও গুলিবর্ষণ। কিন্তু দখলকৃত পশ্চিম তীরে এটি সামরিক শক্তি এবং নীতি ও আইনি কাঠামোর এক জটিল জালের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা পরিকল্পিত সহিংসতার মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়েছে। এই বাস্তবতায়, ইসরায়েলি অনুমোদন ছাড়া কোনো নীতি বা আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না। বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনিরা তাদের নিজেদের নেতৃত্ব ইসরায়েলের সাথে সরাসরি সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বাসঘাতকতা ও গুপ্তচরবৃত্তিতে লিপ্ত হতে দেখতে বাধ্য হয়েছে।

এর গোড়া নিহিত রয়েছে অসলো চুক্তির মধ্যে। এই চুক্তির মাধ্যমে সৃষ্ট ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাঠামো ফিলিস্তিনিবাসীর জাতীয় মুক্তি নিশ্চিত করে না, বরং এটি দখলদারিত্বের অধীনে দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা নিশ্চিত করে। তাছাড়া এর উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে এমন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল,  যাকে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

এরই মাধ্যমে গঠিত পিএ বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এমন সব দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একটি দখলদার শক্তিকে বলবৎ করে। আর এর ফলে তারা কার্যকরভাবে ইসরায়েলের জন্য দখলদারিত্বের ব্যয় কমিয়ে এনেছে। একই সাথে, ইসরায়েল শুধু তার দখলদারিত্ব বজায়ই রাখেনি, বরং এটিকে ভৌগোলিকভাবে প্রসারিত করেছে। তাছাড়া সামরিকভাবে এমন পর্যায়ে জোরালো করেছে, যা প্রকাশ্য গণহত্যার শামিল।

কার প্রতিনিধিত্ব করছে
গত পাঁচ বছর ধরে ফিলিস্তিনি জীবনকে ভৌগোলিকভাবে খণ্ডিত ও ছিন্নভিন্ন করেছে ইসরায়েল। এ অভিযানের পরিণতি স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে নগ্নভাবে স্পষ্ট হয়েছে। এই নির্বাচন ৪২০টি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে দশ লক্ষেরও বেশি যোগ্য ভোটার রয়েছেন। কিন্তু গাজাকে মূলত বাদ দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে ইসরায়েলি নাগরিকত্বধারী এবং জেরুজালেম পরিচয়পত্রধারী ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলি শাসনের অধীনে থাকায় এতে অংশ নিতে পারছেন না। এর সাথে এই বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়নি যে, ফিলিস্তিনি জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি প্রবাসে এবং জোরপূর্বক নির্বাসনের শিকার।

ফলে ফিলিস্তিনিদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের এই শেষ অবশিষ্ট পথটি থেকে বঞ্চিত। এমনকি ইসরায়েলের দখলকৃত পশ্চিম তীরের ভেতরেও ভোটদানের ভৌগোলিক চিত্রটিই খণ্ডিত।

মরিয়াম বারঘুতি: রামাল্লা-নিবাসী ফিলিস্তিনি-মার্কিন লেখিকা; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×