তৃতীয় মেরু
পশ্চিমবঙ্গের ভোট-গণিতে বাংলাদেশের যোগ-বিয়োগ
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৪ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ভোট গ্রহণ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে; ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার পর ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফা অপেক্ষমাণ। এবার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে রাজ্যে টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস এবং কেন্দ্রে টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপির মধ্যে। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য কোনো দলকে অন্তত ১৪৮টি আসন পেতে হবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, তৃণমূলের নিশ্চিত আসন রয়েছে ৮৪টি, আর বিজেপির ৭০টি। বাকি ১৪০টি আসনের জন্য রাজনৈতিক চাপান-উতর, এমনকি সহিংসতার পাশাপাশি এবার যুক্ত হয়েছে নজিরবিহীন নির্বাচনী অঙ্ক। গত দুই দশকে যা হয়নি, এবার অঙ্কের খেলা শুরু হয়েছে একেবারে ভোটার তালিকা থেকে।
যেমন ভোটার তালিকার ‘এসআইআর’ বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের আগে পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটার ছিল কমবেশি ৭ কোটি ৬৬ লাখ। পরে তিন দফা যাচাই-বাছাই শেষে ২৩ এপ্রিল প্রথম দফা ভোট গ্রহণের আগ পর্যন্ত মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ কোটি ৮২ লাখ ৫১ হাজারে। সব মিলিয়ে এসআইআরের পর প্রথম দফা ভোটের আগ পর্যন্ত রাজ্যের মোট ভোটার কমেছে ৮৩ লাখ ৮৬ হাজার ৫২১ (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮ এপ্রিল ২০২৬)।
কমে যাওয়া খসড়া তালিকার কমবেশি ৫৮ লাখ ভোটার নিয়ে তেমন একটা দ্বিমত নেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। কারণ এই ভোটারদের প্রায় সবাই হয় আগের ভোটার তালিকা প্রণয়নের পর মারা গেছেন কিংবা আগের ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যায়নি। আগের ঠিকানায় ‘নিরুদ্দেশ’ ভোটাররা যেমন অন্য রাজ্য বা ঠিকানায় গিয়ে ভোটার হতে পারেন, তেমন ‘ভুয়া’ ভোটারও হতে পারেন।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটারদের মধ্যে ধর্ম ও ভাষাভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, এর কমবেশি ৬০ শতাংশ বাঙালি হিন্দু, ২৯ শতাংশ বাঙালি মুসলমান এবং ১১ শতাংশ আদিবাসী বা জনজাতি ও অবাঙালি। মৃত ও নিরুদ্দেশ ভোটারদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ ছিল বাঙালি হিন্দু, ৩৪ শতাংশ বাঙালি মুসলমান এবং ৩ শতাংশ জনজাতি ও অবাঙালি।
বাদ পড়া মোট ৮৪ লাখ ভোটারের মধ্যে মৃত ও ‘নিরুদ্দেশ’ ৫৮ লাখ নিয়ে তেমন প্রশ্ন না থাকলেও প্রবল চাপান-উতর তৈরি হয়েছে বাকি ২৬ লাখ ভোটার নিয়ে, যারা সশরীরে ও স্ব-ঠিকানায় উপস্থিত। এর আগে একাধিকবার কেন্দ্রীয়, রাজ্য ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটও দিয়েছেন। আলজাজিরাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম দেখিয়েছে, এদের অনেকে গত ৫০ বছর ধরে ভোটার। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এবং এ বিষয়ে গঠিত ট্রাইব্যুনাল ‘লজিক্যাল ডিসক্রাপেন্সিজ’ বা যৌক্তিক অসামঞ্জস্য দেখিয়ে তাদের ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কথিত ‘যৌক্তিক অসামঞ্জস্য’ কতটা অযৌক্তিক– কিছু কিছু ঘটনা সেটা প্রমাণ করেছে। যেমন বাঙালি হিন্দু পদবি বাংলায় ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ এবং ইংরেজিতে ‘ব্যানার্জি’। অনেকের ভোটার তালিকায় নামের ক্ষেত্রে আগে-পরে দুটোই ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন নিয়োজিত অবাঙালি কর্মকর্তা কিংবা ট্রাইব্যুনাল সেটাকেও ‘অসামঞ্জস্য’ হিসেবে দাগিয়ে দিয়েছে। যেমন বাঙালি মুসলমানের ক্ষেত্রে একই ব্যক্তির নাম অন্য কেউ লিখতে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বানানে আহমেদ, আহমাদ, আহম্মেদ লিখতে পারেন; সেটাও ‘যৌক্তিক অসামঞ্জস্য’।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ভোটের ‘অধিকারহীন’ ২৬ লাখের মধ্যে বাঙালি মুসলিম ভোটারের সংখ্যা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে। এটা ঠিক, মৃত ও ‘নিরুদ্দেশ’ ভোটারদের মতো অধিকারহীন ভোটারদের মধ্যে ধর্ম বা ভাষাভিত্তিক হার এখনও স্পষ্ট নয়। কিন্তু বিভিন্ন নথিপত্র নিয়ে যারা ভোট গ্রহণের সপ্তাহেও বিভিন্ন দপ্তরে দৌড়াদৌড়ি করছেন, তাদের মধ্যে বাঙালি মুসলমান ভোটারের সংখ্যা খালি চোখেই বেশি ধরা পড়ে। বিবিসি, আলজাজিরা, এমনকি দিল্লিভিত্তিক কিছু সংবাদমাধ্যমও বিভিন্ন দপ্তরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা যেসব নারী-পুরুষের ছবি ও ভাষ্য তুলে ধরছে, সেখানে বিপুল অধিকাংশই বাঙালি মুসলমান। এ ছাড়াও দেখা যাচ্ছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোতেই বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষক হিসেবে ভারতের ভেতরে ও বাইরে স্বীকৃত ও পরিচিত একজন আমাকে জানিয়েছেন, ভোটের ‘অধিকারহীন’ ভোটারদের মধ্যে বাঙালি হিন্দুর হার যোগ-বিয়োগ ২৫ শতাংশ হতে পারে; মৃত ও নিরুদ্দেশ ভোটারের ৬৩ শতাংশ থেকে অনেক কম। অপরদিকে, ভোটের ‘অধিকারহীন’ ভোটারদের মধ্যে বাঙালি মুসলমানের হার অন্তত ৬৫ শতাংশ; মৃত ও নিরুদ্দেশ ভোটারের ৩৪ শতাংশ থেকে অনেক বেশি। জনজাতি ও অবাঙালিদের মধ্যে ভোটের অধিকারহীনতার হার ৫ শতাংশের বেশি নয়। বলা বাহুল্য, এটা প্রামাণিক সংখ্যা নয়; পর্যবেক্ষণভিত্তিক গড় ও আনুমানিক মাত্র।
ভোটের অধিকারহীন ২৬ লাখ ভোটারের অধিকার ও অনিশ্চয়তার প্রশ্নটি ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে– ভোটার সংখ্যায় এই বিপুল ক্ষয় রাজনৈতিকভাবে কার জন্য ক্ষারক হয়ে দাঁড়াবে। লক্ষণীয়, ভোটারসংখ্যা কমে যাওয়ায় বিজেপি প্রকাশ্যে সন্তোষ ব্যক্ত করে বলছে, এতদিন এসব ভুয়া ভোটার দিয়েই তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচনী বাজিমাত করে এসেছে। অপরদিকে, তৃণমূলের দাবি– নির্বাচনী খেলায় না পেরে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে তৃণমূলের ‘ভোট ব্যাংক’ নষ্ট করে দিচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ২৬ লাখ ভোটার ভোট দিতে না পারার প্রভাব নির্বাচনে কতটা পড়বে? এই সংখ্যা মোট ভোটারের ১০-১২ শতাংশ হওয়ায় প্রভাব নিশ্চয় পড়বে। এর পক্ষের বিশ্লেষকরা বলছেন ‘নির্ভুল’ ভোটার তালিকার মাধ্যমে নির্বাচন হওয়ায় রাজ্যের প্রকৃত ভোট-চিত্র স্পষ্ট হবে। এটাকে ‘বেঞ্চমার্ক’ ধরে পরবর্তী রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও কৌশল সহজ হবে। সমালোচকরা বলছেন, এর মাধ্যমে নির্বাচনে বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।
অবশ্য, প্রথম দফা নির্বাচনে ভোট প্রদানের নজিরবিহীন হারে ভোটার তালিকায় ‘কারসাজি’ ভেসে যেতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করছেন। ভারতীয় নির্বাচন কমিশনকে উদ্ধৃত করে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, প্রথম দফায় গড়ে ৯২ দশমিক ৮৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। মুসলমান অধ্যুষিত আসনগুলোতে ভোটদানের হার আরও বেশি। যেমন কোচবিহার জেলার শীতলকুচিতে ৯৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ, মালদহ জেলার মোথাবাড়িতে ৯৫ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলায় ৯৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ, জঙ্গিপুরে ৯৫ দশমিক ৭২ শতাংশ, উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়ায় ৯৬ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, হেমতাবাদে ৯৬ দশমিক ৪০ শতাংশ (বিবিসি বাংলা, ২৪ এপ্রিল ২০২৬)।
আখেরে এই প্রশ্নও সংগত, পশ্চিমবঙ্গের ২৬ লাখ নাগরিকের ভোটের অধিকারহীনতা বাংলাদেশের জন্য কতটা তাৎপর্যপূর্ণ? মনে রাখতে হবে, কেন্দ্রীয় ও রাজ্য বিজেপি নেতারা এদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ আখ্যা দিচ্ছে। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশকে ইঙ্গিত করেই। প্রশ্ন হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় এলে এদের ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে সীমান্তের এপারে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা কতখানি? বিশেষত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া বাঙালি মুসলমানদের ক্ষেত্রে?
আশঙ্কা থাকুক বা না থাকুক; বাংলাদেশের উচিত হবে না পশ্চিমবঙ্গের ভোট-গণিত নিয়ে নির্লিপ্ত থাকা। কলকাতায় তৃণমূল ক্ষমতায় থেকে গেলে কিংবা বিজেপি ক্ষমতায় এলে ঢাকার কী করণীয়, এখনই ভাবতে হবে। সেখানকার অঙ্কে এখানকার যোগ-বিয়োগ আগেই করে রাখা ভালো।
শেখ রোকন: লেখক ও নদী-গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- শেখ রোকন
