ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ঝুঁকি

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ঝুঁকি
×

যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে হওয়ার কারণে বাংলাদেশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে

সাহাদাৎ রানা

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫:৪৪

যুদ্ধ নিয়ে গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল বলেছিলেন, শান্তিতে বসবাস করার জন্যেই আমরা যুদ্ধে লিপ্ত হই। তার এ কথার গভীরতা হয়তো অনেক। যদিও যুদ্ধ সবসময় শান্তি নিয়ে আসতে পারে না। কখনো কখনো হয়তো পারে! তবে সব যুদ্ধে নয়। যে যুদ্ধে সাধারণ মানুষের ব্যাপক প্রাণহানি হয়, বোমা বা গুলির আঘাতে নিভে যায় হাজার হাজার নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ! মারা যায় বৃদ্ধ থেকে শুরু করে নারীরা; সে যুদ্ধ কখনো কোনো শান্তি নিয়ে আসতে পারে না। 
বর্তমান বিশ্বে চলছে যুদ্ধের দামামা। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল মিলে ইরান আক্রমণ করেছে। যেখানে প্রাণ হারাচ্ছে শিশু থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। অবশ্য নিজেদের ক্ষমতার সবটুকু দিয়ে প্রতিহত করার পাশাপাশি পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরানও। লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ নেই; যদিও যুদ্ধবিরতির চলছে; আলোচনাও থেমে নেই। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধও কয়েক বছর ধরে চলমান। 

বিশ্বে এমন যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কম-বেশি সবাই ক্ষতিগ্রস্থ। বিশেষ করে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। এসব রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। যে লড়াইয়ে সামিল বাংলাদেশও। সরাসরি কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত না হলেও অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। অবশ্য এই যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই। পরোক্ষভাবে পুরো বিশ্বে।

যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে হওয়ার কারণে বাংলাদেশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এখানে মূল ক্ষতির জায়গাটা মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজারের বিষয়টি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে শ্রমবাজারে নতুন করে ধাক্কা লেগেছে। সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলোতে কর্মসংস্থান কমছে বাংলাদেশিদের। অথচ, বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেই। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে ৬৬ হাজারের বেশি কর্মী বিদেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু চলতি বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ায় চলতি বছরের মার্চে ৪৪ হাজারের মতো কর্মী বিদেশে যেতে পেরেছেন। দেখা যাচ্ছে- এক বছরের ব্যবধানে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার ৩৩ শতাংশ কমেছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর আরও একটি তথ্য এখানে উল্লেখ করার মতো। তাদের তথ্য অনুযায়ী- ২০২৫ সালে ১১ লাখের মতো অভিবাসী বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। এর মধ্যে ৯ লাখ গিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যে। যা প্রায় ৮২ দশমিক ৪ শতাংশ। রেমিট্যান্স আসার দিক দিয়েও খুব একটা পিছিয়ে নেই। ২০২৫ সালে প্রায় ৪৬ শতাংশ রেমিট্যান্স এসেছে এসব অঞ্চল থেকে।

বর্তমানে কম শ্রমিক যাওয়ার তথ্য আমাদের জন্য অবশ্যই ভয়ের কারণ। যুদ্ধ যদি অব্যাহত থাকে তবে সেই ভয় বা উদ্বেগ আরও বাড়বে নিশ্চিতভাবে। এখানে আশঙ্কার জায়গাও রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে যেসব কর্মী মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত আছেন তারাও খুব একটা স্বস্তির মধ্যে নেই। একদিকে নিরাপত্তার অভাব, অন্যদিকে কাজ ও আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা। এসব কারণে দেশের রিজার্ভের উপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে আমাদের দেশের যেসব কর্মী মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত তারাও রয়েছেন আতঙ্কে। তাদের কাজের ক্ষেত্র বা চাকরি যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য ঝুঁকির মুখে পড়েছে। শুধু তাই নয়, নতুন কর্মী যাওয়ার ক্ষেত্রও বাধার মুখে। যুদ্ধের কারণে এসব দেশে নতুন কাজের সুযোগও কমেছে। 

ইতোমধ্যে ছুটি কাটাতে দেশে এসে অনেক প্রবাসী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। অনেক পরিবার তাদের প্রিয়জনকে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে কর্মরত জায়গায় যেতে দিতে চাছেন না, দিচ্ছেন বাঁধা। এর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরানের হামলায় বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এমন তথ্য সবার মনে আরও বেশি ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যের এমন যুদ্ধ পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে তাহলে আমাদের শ্রমবাজারে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে নিশ্চিতভাবে। যুদ্ধ দ্রুত থেমে যাবে বা যুদ্ধবিরতি হবে এমন ইতিবাচক সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না খুব একটা। মাঝে মাঝে যুদ্ধ বিরতির আওয়াজ শোনা গেলেও তা মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়। যুদ্ধবিরতি আর হয় না। তাই সহসাই যুদ্ধ থেমে যাবে এমনটা ভাবা সত্যিই কঠিন। 

মধ্যপ্রাচ্যের এমন সঙ্কট অবশ্য নতুন নয়। আগেও এমন পরিস্থিতি দেখেছে বিশ্ব। বাংলাদেশও এমন অভিজ্ঞতার মধ্যদিয়ে গিয়েছে অনেকবার। এবার সঙ্কটের গভীরতা একটু বেশি। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে বরং সবার অভিজ্ঞতা হিসেবে নেয়া উচিত। বিশেষ করে আমাদের। এমন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিলে আগামীদিনে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ হবে। আগামীদিনের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ দক্ষ কর্মী তৈরির চ্যালেঞ্জ। আমাদের দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে মনোনিবেশ করতে হবে। বিদেশে দক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি করার জন্য কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আমাদের কর্মমূখী শিক্ষার দিকেও বেশি করে ঝুকতে হবে। কারিগরি ও বিশেষায়িত যোগ্যতা সম্পন্ন জনগোষ্ঠি বেড়িয়ে আসলে বিশ্ববাজারে শ্রমের মূল্য পাওয়া যাবে বেশি।

বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বে এটা প্রমাণিত হয়েছে, কর্মমুখী ও ব্যবহারিক শিক্ষার শক্তিই হচ্ছে উন্নয়ন ও জাতি গঠনের আসল প্রেরণা। যা জাতীয় জীবনে অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি বিশ্বে বিকল্প ও টেকসই শ্রমবাজার খুঁজতে হবে। এক্ষেত্রে ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে মতো রাষ্ট্রে শ্রমবাজারে দৃষ্টি দিতে হবে। কেননা, এখানে শ্রমের মূল্য অনেক বেশি। তাই এসব দেশে যদি বেশি করে দক্ষ শ্রমিক পাঠানো সম্ভব হয় তাহলে রেমিট্যান্সের হারও বাড়বে। তবে সবার আগে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের কর্মীদের অবশ্যই কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি সেই দেশের ভাষাও শিখতে হবে। যে কাজের জন্য যাবেন সেই বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ নিয়ে যেতে হবে। তবেই উন্নত দেশে গিয়ে সঠিক কাজটি করে পরিবার ও রাষ্ট্রকে তার শ্রমের মূল্যটা দিতে পারবেন। 

সাহাদাৎ রানা: সাংবাদিক
 

আরও পড়ুন

×