ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস

কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্য যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্য যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ
×

মো. মতিউর রহমান

মো. মতিউর রহমান

প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০০:২৭ | আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:০২

আজ ২৮ এপ্রিল, বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি দিবস’।  এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো– আসুন, একটি সুস্থ মনোসামাজিক  কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করি’। কর্মস্থলের কাজের ধরন, ব্যবস্থাপনা এবং সাংগঠনিক সংস্কৃতি একজন কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। যখন কাজের অতিরিক্ত চাপ বা চরম একঘেয়েমি অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন অনেক কর্মী তামাক, মাদকদ্রব্যের মতো ক্ষতিকর আসক্তিমূলক আচরণে অভ্যস্ত হয়। আসক্তি সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা শারীরিক ব্যাধি ও নিদ্রাহীনতার পাশাপাশি কর্মস্থলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এটি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নষ্ট করে ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাত্রার দিকে ঠেলে দেয়।

একজন কর্মী কেন আসক্তির দিকে ঝুঁকে পড়েন, তার পেছনে কর্মক্ষেত্রের ‘মনোসামাজিক বা সাইকোসোশ্যাল’ ফ্যাক্টরগুলো শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। প্রধানত, কাজের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে অনেক কর্মী ধূমপান বা মদ্যপানকে একটি ‘কোপিং মেকানিজম’ বা কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন। এতে তাদের সাময়িকভাবে উদ্বেগ কমালেও শরীরের অভ্যন্তরীণ সক্রিয়তা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে কাজের ক্ষেত্রে চরম একঘেয়েমি বা বৈচিত্র্যের অভাব থাকলেও কর্মীরা নেশার আশ্রয় নিতে পারেন, কারণ মেধা ব্যবহারের সুযোগ না থাকলে সেই মানসিক অবসাদ কাটাতে তারা কৃত্রিম স্বস্তি খোঁজেন। এ ছাড়াও যারা পরিবার থেকে দূরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় কাজ করেন কিংবা দীর্ঘ সময় রাতে ডিউটি করেন, যেমন ট্রাক চালক বা খনি শ্রমিক, তাদের মধ্যে একাকিত্ব এবং অনিদ্রা থেকে মাদকের ব্যবহারের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। সব শেষে, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার ধরন এখানে বড় প্রভাব ফেলে; খুব বেশি কঠোর বা কর্তৃত্ববাদী পরিবেশ অথবা একেবারে লক্ষ্যহীন ও লাগামহীন ব্যবস্থাপনা– উভয়ই কর্মীদের মানসিক চাপের তীব্রতা বাড়িয়ে তাদের আসক্তির পথে ঠেলে দিতে পারে।

আসক্তির ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য দেখা যায়। সাধারণত পুরুষরা অ্যালকোহল বা তামাকের মতো প্রকাশ্যে গ্রহণযোগ্য নেশায় বেশি অভ্যস্ত হোন। অন্যদিকে নারীদের মধ্যে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন করা ওষুধের (যেমন ঘুমের ওষুধ বা উদ্বেগ কমানোর ওষুধ) অপব্যবহার বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া পরিবারের কেউ মাদকাসক্ত হলে তার সেবার ভার সাধারণত নারীদের ওপরই পড়ে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অতিরিক্ত বোঝা তৈরি করে।

কর্মক্ষেত্রে মাদকের সমস্যার মাত্রা বোঝাতে আমরা ট্রাফিক সিগন্যালের তিন রঙের একটি বিশেষ মডেল ব্যবহার করা হয়। সিগন্যালের লাল রঙের ছোট অংশটি সেই মুষ্টিমেয় কর্মীদের নির্দেশ করে, যারা মাদকাসক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল এবং যাদের সমস্যা অত্যন্ত গুরুতর। এর তুলনায় হলুদ অংশটি কিছুটা বড়, যা সেই সব কর্মীর প্রতিনিধিত্ব করে, যারা আসক্তিমূলক আচরণে অভ্যস্ত হতে শুরু করেছেন কিংবা যাদের মধ্যে প্রাথমিক কিছু সমস্যা দেখা দিতে শুরু করেছে। তবে সবচেয়ে বড় অংশটি হলো সবুজ রং, যা নির্দেশ করে সেই বিশাল সংখ্যক সুস্থ কর্মীকে, যাদের মধ্যে মাদকের কোনো সমস্যা নেই এবং যারা স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন। আধুনিক কর্মপরিবেশের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত কেবল লাল চিহ্নিত কর্মীদের চিকিৎসা করা নয়, বরং সবুজ অংশের সুস্থতা বজায় রাখা এবং হলুদ অংশে থাকা কর্মীদের সঠিক সহায়তার মাধ্যমে লাল পর্যায়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করা।

কর্মস্থলে আসক্তিমূলক আচরণ ব্যবস্থাপনার  পিরামিড মডেল অনুযায়ী, সবচেয়ে নিচের সবুজ স্তরে থাকা সুস্থ কর্মীদের নিয়মিত তথ্য ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সচেতন রাখাই মূল কাজ। মাঝের হলুদ স্তরে থাকা প্রাথমিক সমস্যাগ্রস্ত কর্মীদের জন্য স্ব-মূল্যায়ন ও কাউন্সিলিং প্রয়োজন, যাতে সমস্যাটি আর না বাড়ে। আর ওপরের ছোট লাল স্তরে থাকা আসক্ত কর্মীদের জন্য প্রয়োজন সরাসরি চিকিৎসা। নিবিড় সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মীদের গুরুতর আসক্তির পর্যায় থেকে রক্ষা করাই এই কৌশলের মূল লক্ষ্য। প্রতিটি কর্মস্থলে আসক্তিমূলক আচরণের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা কঠোর নীতিমালা থাকা প্রয়োজন, তবে সেই নীতিগুলো কেবল শাস্তিমূলক না হয়ে বরং সংশোধনমূলক ও মানবিক হওয়া জরুরি। পাশাপাশি সহকর্মীদের মধ্যে একে অপরকে সাহায্য করার মানসিকতা ও নিয়মিত আলোচনার সুযোগ তৈরি করে একটি শক্তিশালী সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ও সাইকোলজিস্ট রবার্ট কারাসেকের মডেল অনুযায়ী, যাদের কাজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও পর্যাপ্ত সামাজিক সমর্থন থাকে, তাদের মানসিক চাপের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। 

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্মক্ষেত্রে মাদকাসক্তি নিরসনে বৈশ্বিক নীতিমালা ও ‘কোড অব প্র্যাকটিস’ প্রণয়ন করেছে, যা মূলত মাদকের চাহিদা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেয়। আইএলও মাদকাসক্তিকে অপরাধ নয়, বরং একটি ‘আচরণগত রোগ’ হিসেবে বিবেচনা করে। তাই কোনো কর্মীকে সরাসরি বরখাস্ত না করে, গোপনীয়তা বজায় রেখে পুনর্বাসনের মাধ্যমে একটি সুস্থ ও টেকসই কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর সংস্থাটি জোর দেয়।

একটি সুস্থ মনোসামাজিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা কেবল কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়িত্ব। যখন কোনো কর্মস্থল তার কর্মীদের জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক এবং মানসিক প্রশান্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করে, তখন আসক্তির মতো সমস্যাগুলো স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে। ২০২৬ সালের বিশ্ব পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি  দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক– এমন এক কর্মপরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে কাজের চাপে কেউ নেশাকে বেছে নেবে না; বরং একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে কাজ করার মাধ্যমেই জীবনের সার্থকতা খুঁজে পাবে। সঠিক ব্যবস্থাপনা, সামাজিক সমর্থন এবং সচেতনতাই পারে আমাদের একটি আসক্তিমুক্ত সুস্থ কর্মজগৎ উপহার দিতে।

মো. মতিউর রহমান: কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরে যুগ্ম মহাপরিদর্শক; বর্তমানে ‘পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেফটি’ বিষয়ে তুরিন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত

 

আরও পড়ুন

×