পারমাণবিক বিদ্যুৎ
উৎপাদনের পথে রূপপুর, ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ
আরিফুল সাজ্জাত
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮:০৭ | আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ | ১৮:০৮
দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে এর জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোড বা সংযোজন করা হয়েছে মঙ্গলবার। এর ফলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। সাধারণত ফুয়েল লোড করার মাসখানেকের মধ্যেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। প্রথমে স্বল্প আকারে, এরপর ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়তে থাকে। বলা চলে, এ বছরের মধ্যেই ইউনিট-১ থেকে পূর্ণমাত্রার এক হাজারের কিছু বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চলে যাবে জাতীয় গ্রিডে। সরকার আশা করছে আগস্টের মধ্যেই অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদন সম্ভব।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ কীভাবে উৎপাদন হয়
বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী পদার্থের নাম ইউরেনিয়াম, যা দিয়ে কোনো জনপথকে ধ্বংসের জন্য অ্যাটম বোম যেমন বানানো যায়, তেমনি করা যায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল যন্ত্র রিঅ্যাক্টর বা চুল্লিতে এই ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে প্রথমে প্রচুর তাপ, পরে তা ব্যবহার করে পানিকে বাষ্প এবং বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে উৎপাদন করা যায় বিদ্যুৎ। বিজ্ঞানীরা ইউরেনিয়ামকে ‘স্বর্ণের চেয়েও দামি’ বলে থাকেন। কারণ সামান্য ইউরেনিয়াম থেকে যে পরিমাণ শক্তি পাওয়া যায়, তেল বা কয়লা থেকে তা পেতে হাজার হাজার টন জ্বালানি পোড়াতে হয়। ফলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ অনেকটাই সাশ্রয়ী।
এর প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল এবং উচ্চমাত্রার প্রযুক্তিসংশ্লিষ্ট। একটি রিঅ্যাক্টর অবকাঠামো তৈরি, এর নিরাপত্তা বিধান এবং জাতীয় গ্রিডে নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহ বেশ চ্যালেঞ্জিং। প্রতিটি ধাপেই পার হতে হয় অনেক মাইলফলক। মানতে হয় বেশ কিছু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গাইডলাইন।
রূপপুর, ২০১৩-বর্তমান
২০১৩ সালে ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাশিয়া সফর এবং পরে ২০১৫ সালে সাধারণ চুক্তি। সেই ষাটের দশক থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্বপ্ন বলতে গেলে বাস্তবে ধরা দেয় তখন থেকেই। পারমাণবিক বিদ্যুৎ স্থাপনা তৈরিতে সরকারের সর্বোচ্চ শীর্ষ পর্যায়ের অঙ্গীকার অবশ্যম্ভাবী। পৃথিবীতে অনেক দেশেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ রকম বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়ার নজির আছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রূপপুরকে সে রকমটি না করে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অঙ্গীকারকেই তুলে ধরেছেন। সে কারণেই ইউনিট-১-এর রিঅ্যাক্টরে এর জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোড বা সংযোজনের পথেই হাঁটছে। এর ফলে এখন শুরু হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া। প্রথম ধাপ শেষ করতে সাধারণত সময় লাগে এক মাসের মতো। এরপর ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। এ পর্যায়ে চলবে কয়েক ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করবে কারা?
রাশিয়ার সঙ্গে ২০১৫ সালের সাধারণ চুক্তি অনুযায়ী, চালুর কয়েক বছরের মধ্যেই রূপপুর পরিচালনা করবেন বাংলাদেশি পরমাণু প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা। এ জন্য শুরু থেকেই জনবলের প্রশিক্ষণ দিয়েছে রাশিয়া। তবে প্রশ্ন এখানেই, সেই প্রশিক্ষণ ও জনবলের নিয়োগ কতটা ঠিকভাবে হয়েছে? সর্বশেষ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য বাংলাদেশি অপারেটররা তেমন ভালো করতে পারেনি। যদিও কেউ কেউ অপারেটর লাইসেন্স পেয়েছে। সম্ভাব্য কম সময় তিন বছর ধরা হলেও যে সংখ্যক বাংলাদেশি অপারেটর প্রয়োজন, তা পাওয়া যাবে কিনা প্রশ্নসাপেক্ষ। আর রূপপুর পরিচালনাকারী কোম্পানি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি অব বাংলাদেশ-এনপিসিবিএলের অবকাঠামো, সার্ভিস রুল ও অন্যান্য বিষয়ের প্রস্তুতি খুবই দুর্বল। বিশেষ করে এ কোম্পানির ওপরের দিকের জনবল নিয়োগ নিয়ে সরকারও বেশ উদাসীনই বলা চলে। দেশীয় অভিজ্ঞ কিংবা নিউক্লিয়ার ফিল্ডে অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ অনাবাসী বাংলাদেশিদের একসঙ্গে করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারা হতে পারেন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এগিয়ে নেওয়ার ভ্যানগার্ড। এ ক্ষেত্রে রূপপুর প্রকল্প থেকে অবসরে যাওয়া বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের আবারও নিয়োগ দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপত্তা ও পরিবেশ
একেকটি রিঅ্যাক্টর বা পারমাণবিক চুল্লি একটি বোমার মতোও কাজ করতে পারে। ইউরেনিয়ামের বিশেষ বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে জাতীয় ট্র্যাজেডি হতে পারে। যদিও আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে এখন বিশেষ কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া এ রকমটা ঘটতে দেখা যায় না। সে জন্য জাতীয়ভাবে বিশেষ অবকাঠামো, জ্ঞানের চর্চা আর পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হয়। যে কাজে বেশ পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।
যেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানকার অধিবাসীদের জন্য পারমাণবিক বিকিরণসহ অন্যান্য বিষয়ে অবাধ তথ্যপ্রবাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিনিয়ত তাদের প্লান্টের বিভিন্ন ধরনের আপডেট দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রতিবেশী দেশের এক ধরনের সায় প্রয়োজন। রূপপুর থেকে ৮০ কিলোমিটারের মধ্যে ভারতের সীমানা। দেশটি শুরু থেকেই এই প্রকল্পের অংশীদার এবং পরামর্শক হিসেবে তাদের অনেক বিশেষজ্ঞ এখানে কাজ করেছেন। ভবিষ্যতে এমন কোনো পরিস্থিতির যেন উদ্ভব না হয়, যাতে ভারত এ প্রকল্প নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারে। এ জন্য নির্মাণকারী রাশিয়া এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি এজেন্সি-আইএইএর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আইএইএর নীতিমালাগুলো অবশ্য পালনীয়।
সঠিক নেতৃত্ব পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের জন্য অপরিহার্য
একটি জাতি তখনই পরমাণু শক্তি ব্যবহারে এগিয়ে যায়, যখন তাদের পরমাণু প্রকল্পের পাশাপাশি এ খাতের জাতীয় কর্মসূচি থাকে। উদাহরণস্বরূপ, প্রকল্প হচ্ছে রূপপুর আর জাতীয় কর্মসূচি হচ্ছে পারমাণবিক শক্তি নিয়ে গবেষণা, সচেতনতা, সিভিল সোসাইটি এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলা। স্বাধীনতার পর থেকেই স্বাস্থ্য, কৃষি ও গবেষণা খাতে পরমাণু শক্তি ব্যবহার করে আসছে বাংলাদেশ। এ জন্য গঠন করা হয়েছে পরমাণু শক্তি কমিশন এবং আরও অনেক পরে পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। প্রথমটি গবেষণা সংস্থা আর দ্বিতীয়টি শক্তি নিয়ন্ত্রণে বা সঠিক ব্যবহার দেখভাল করার কর্তৃপক্ষ। অপেক্ষাকৃত নতুন সংস্থা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষে পর্যাপ্ত জনবল এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে রূপপুরের মতো প্রকল্প মনিটরিং এবং এ জন্য বিভিন্ন লাইসেন্স দিতে সংস্থাটিতে বিদেশি সংস্থাকে ভাড়া করতে হয়েছে।
রূপপুর প্রকল্প একটি বিশেষায়িত এবং জটিল বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডের আধার। এটি পরিচালনা করতে গঠন করতে হয়েছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি অব বাংলাদেশ। ভবিষ্যতেও পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনা করবে কোম্পানিটি। এসব কর্মযজ্ঞে প্রয়োজন বিশেষ জনবল কাঠামো। বিশ্বে মাত্র ৩৪টি দেশে রয়েছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট। এর মধ্যে ৩২টি দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। বাংলাদেশেও হাঁটছে এখন সেই পথে।
এখন সময় বিশেষ কাঠামো তৈরি করা
উন্নত দেশ আর প্রতিবেশী ভারত-পাকিস্তানের মতো দেশের পরই এই ক্লাবে ঢুকেছে বাংলাদেশ। সব দেশেরই রয়েছে এই কর্মযজ্ঞ করার বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। সব দেশেই এ ক্ষেত্রে আমলানির্ভরতাকে বাদ দিয়ে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন করেছে। ভারতে ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাটমিক এনার্জি সরাসরি রিপোর্ট করে প্রধানমন্ত্রীকে। এটির নেতৃত্ব দেন একজন পরমাণু বিজ্ঞানী। যিনি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা ভোগ করেন। বাংলাদেশে পরমাণু শক্তি কমিশন সরাসরি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে। এর প্রধান অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার। পরমাণু শক্তির যে কোনো প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, যারা স্থায়ীভাবে একই মন্ত্রণালয়ে থাকেন না। এমনকি অনেক প্রশিক্ষণেও অংশ নেন তারা। তারপর হয়তো বদলি হন অন্য কোনো স্থানে। ফলে বিশেষায়িত জ্ঞানের কোনো ব্যবহার তাদের থেকে পাওয়া যায় না। আবার পরমাণু বিজ্ঞানীদের মূল্যায়ন করেন সামাজিক বিজ্ঞানে পড়ুয়া কোনো কর্মকর্তা!
বাংলাদেশ এখন পরমাণু ক্লাবের ৩৩তম দেশ। প্রথম কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও নির্মাণ করেছে দেশটি। এর পরিচালনা কোম্পানির চেয়ারম্যান আবার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব। যিনি কিছুদিন পর আবার বদলি হয়ে যান। এখানে স্থায়ী ও অভিজ্ঞ চেয়ারম্যান জরুরি। না হলে কমিশন, মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে যেতে যেতে বিজ্ঞানীদের হয়তো সিদ্ধান্ত নেওয়ারও সময় থাকবে না।
আরিফুল সাজ্জাত: প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট, অ্যাটমিক রিপোর্টার্স বাংলাদেশ
[email protected]
