সমাজ
কিশোর গ্যাং এবং হাতেগড়া বিপর্যয়
শশাঙ্ক সাদী
শশাঙ্ক সাদী
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১০ | আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামের বাকলিয়ার অর্ধনির্মিত ভবনের অষ্টম তলাটি যে কোনো কিশোর বা তরুণের জন্য দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকার উপযুক্ত জায়গা হওয়ার কথা। কিন্তু কিশোর সাজিদের জন্য তা হয়ে উঠল মধ্যযুগীয় বর্বরতায় হত্যাযজ্ঞের স্থান। এক দল কিশোর তাদেরই এক সঙ্গীকে আট তলা পর্যন্ত সিঁড়ি বেয়ে তাড়া করে শুধু মারধর করে ক্ষান্ত হয়নি; পরে লিফটের শ্যাফটে ফেলে দিল কোনো রকম অনুশোচনাবোধ ছাড়া! এই ঘটনাকে কেবল ‘কিশোর অপরাধ’ ভাবার অবকাশ নেই। আজ আমরা এক সামাজিক বিপর্যয়ের সাক্ষী হচ্ছি, যেখানে আমাদের সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তিই ভেঙে পড়েছে।
ঢাকায় মোহাম্মদপুরের সংকীর্ণ, দমবন্ধ গলি বা উত্তরা-মিরপুরের বিস্তীর্ণ ব্লকগুলোতে এক সর্বব্যাপী আতঙ্কে পরিবেশ জমাট বেঁধে আছে। ‘কিশোর গ্যাং’ ব্যাপারটি আজ আর নগরায়ণের এক আকস্মিক উপজাত হয়ে নেই। এটি এক পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। কিশোররা কি অপরাধী হচ্ছে, না অপরাধ করার জন্য কিশোরদের লালায়িত করা হচ্ছে– এই প্রশ্ন আমাদের একটি ‘অস্বস্তিকর সত্যের’ মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিগত বছরগুলোতে ঘটে যাওয়া কিশোর অপরাধের নানা ঘটনা থেকে আমরা দেখতে পাই, শহরাঞ্চলে কিশোরদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে।
এই রাজনৈতিক শোষণ ক্রমবর্ধমান প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার কারণেই সম্ভব হচ্ছে। আমরা দেখছি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কিশোর গ্যাং বিষয়ে কৌশলগত অজ্ঞতা বজায় রাখে। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো লাশ না পড়ে ততক্ষণ এই গ্যাংগুলোকে একটি সামান্য উপদ্রব হিসেবেই গণ্য করে। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকেও অনেক সময় নতি স্বীকার করতে হয় তথাকথিত রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’দের ঔদ্ধত্য ও ক্ষমতার কাছে। এটি শুধু কর্তব্যে অবহেলা নয়; রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির ব্যর্থতা। একজন কিশোর যখন বুঝে যায় যে, তার পৃষ্ঠপোষকের একটি ফোনকল থানাকে চুপ করিয়ে দিতে পারে, তখন তার কাছে আইনের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তখন গ্যাং পরিচয়ই কিশোরটির কাছে প্রকৃত কর্তৃপক্ষ হয়ে ওঠে।
এই আগুনে প্রতিনিয়ত ইন্ধন জোগাচ্ছে নানা পদের ডিজিটাল চিত্রনাট্য। আজকের কিশোর-কিশোরীরা প্রতিদিন বড় হচ্ছে হিংস্রতায় পরিপূর্ণ উপমহাদেশীয় ব্লকবাস্টার সিনেমা এবং অতি-সম্পাদিত রিল দেখে। এগুলোতে ‘গ্যাংস্টার’কেই চূড়ান্ত নায়ক হিসেবে তুলে ধরা হয়। এভাবে কিশোর মনের এক অংশে গেঁথে যাচ্ছে– ক্ষমতা শ্রেণিকক্ষে পাওয়া যায় না; এটি পাওয়া যায় একটি ছুরির ডগায় আর ক্ষমতাসীন শক্তির আবহ সংগীতের সঙ্গে।
কিশোরদের পেছনের রাজনৈতিক অপশক্তির প্রতাপে বয়োজ্যেষ্ঠরা আপাত নিরাপদ তালাবদ্ধ দরজার আড়ালে আশ্রয় নিয়েছেন। ‘সামাজিক প্রতিরোধক’-এর এই মৃত্যু কিশোরদের নৈতিকভাবে দিকনির্দেশনাহীন করে দিয়েছে। তাদের সামনে উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে কেবল ‘গ্যাং’ নামক এক নির্মম শারীরিক আতঙ্ক ও আধিপত্যের রঙিন স্বপ্ন।
অন্যদিকে ‘সামাজিক নিরাপত্তা জাল’ প্রদানে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা থেকে তৈরি হচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’ প্রতিরোধে সবচেয়ে মর্মান্তিক নীরবতা। ঘটনা-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আমাদের পুলিশ বাহিনী আছে। কিন্তু অভাব রয়েছে গ্যাং তৈরি হওয়া প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় পেশাদার সমাজকর্মী নেটওয়ার্কের। ‘গ্যাং’ খুঁজে পাওয়ার আগেই ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ শিশুকে চিহ্নিত করার জন্য কমিউনিটি স্তরের কোনো কর্মী বাহিনী নেই। এসব দেখে মনে হয়, আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটি শুধু অপরাধপ্রবণ কিশোরদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দেওয়ার জন্যই তৈরি; অপরাধ নিরাময় বা অপরাধ প্রতিরোধে আগাম হস্তক্ষেপ করার জন্য নয়।
বর্তমানের ভেঙে পড়া সামাজিক কাঠামোর জন্য এখন প্রয়োজন আরেকটি কাঠামো এবং পুরোনো কাঠামোকে জাগিয়ে তুলতে একটি সমন্বিত ও কার্যকর উদ্ধার অভিযান। রাষ্ট্রকে তার মনোযোগ ‘সামনে দৃশ্যমান ঘুঁটি’ মানে অপরাধপ্রবণ কিশোরদের পাশাপাশি ‘বড়ো ভাই’ মানে মূল পৃষ্ঠপোষকদের দিকেও সরাতে হবে। তার নিজস্ব সংস্থাগুলোকে জবাবদিহিমূলক করতে হবে এবং রাজনৈতিক অপসুরক্ষার বলয় ভেঙে ফেলতে হবে, যেন গ্যাংগুলো নিজেদের কখনোই অজেয় বোধ না করে। আমাদের সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে একটি জাতীয় সমাজকর্মী ক্যাডার তৈরি করতে, যারা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর কেন্দ্রস্থলে থেকে শিশু-কিশোরদের গ্যাং-এর নাগাল থেকে বের করে আনবে। তবে রাষ্ট্র একা এটি করতে পারবে না। এখানে অভিভাবকদেরও দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা আছে। তাদের অনুধাবন করতে হবে, সন্তানদের ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতা একটি টাইম বোমার মতো। যদি অভিভাবকরা সন্তানের স্ক্রিনের ভাষা না জানেন তবে বুঝতে হবে, তারা একই ছাদের নিচে বসবাসকারী নিজের শিশুকে চেনেন না। শোবার ঘরে সন্তানের কাছে একটি স্মার্টফোন একটি অন্ধকার গলির চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হতে পারে; যদি পথ দেখানোর জন্য সন্তান ও অভিভাবকদের মধ্যে প্রয়োজনীয় আলাপচারিতা বন্ধ থাকে।
কিছু কায়েমি স্বার্থপরের হাতে গড়া সামাজিক সংকটের কারণে আজ আমরা পুরো একটি প্রজন্মকে হারাচ্ছি। ‘কিশোর গ্যাং’-এর মতো মূল্য আমাদের এমন একটি সমাজের জন্য দিতে হচ্ছে, যে সমাজ শিশু-কিশোরদের সামাজিক নিরাপত্তার চেয়ে রাজনৈতিক সুবিধাবাদকে প্রাধান্য দেয়।
পরিশেষে বলা দরকার, আমাদের শিশু-কিশোর ও যুবসমাজের টিকে থাকা সমাজের দুটি স্তম্ভের ওপর নির্ভর করে। প্রথমটি হলো এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যা রাজনৈতিক শক্তির চেয়ে জবাবদিহিকে বেশি মূল্য দেয়। দ্বিতীয়টি হলো এমন অভিভাবক, যারা নীরবতার পরিবর্তে সন্তানের সঙ্গে কথার সংযোগকে মূল্যবান মনে করেন ও বেছে নেন। আজ যদি আমরা এই শূন্যতা পূরণ না করি, তবে সাজিদের এই মর্মান্তিক ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়ে থাকবে না। এটিই হয়ে যাবে আমাদের উত্তরাধিকার।
শশাঙ্ক সাদী: লেখক ও উন্নয়ন বিশ্লেষক
- বিষয় :
- সমাজ
- কিশোর গ্যাং
