সমকালীন প্রসঙ্গ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: প্রযুক্তি ও মানবিকতার দ্বৈরথ
এআই দিয়ে তৈরি
আখতার সোবহান মাসরুর
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:১৪
একুশ শতকে আমরা এক অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) উত্থান কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, তা একই সাথে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে দিচ্ছে। স্বয়ংক্রিয়করণ বা অটোমেশন আমাদের সামনে অসীম সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে, তেমনি তৈরি করছে এক নতুন ধরনের ডিজিটাল দাসত্ব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রোবটিক্স, বায়োটেকনোলজি ও ন্যানো-প্রযুক্তির অকল্পনীয় উন্নতি আমাদের এক ডিজিটাল স্বর্গের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, অন্যদিকে অতিদ্রুত গতির এই পরিবর্তন আমাদের মানবিক সত্ত্বাকে হুমকির মুখেও ফেলছে। এই পরিবর্তন কেবল কারিগরি নয়, আমাদের মানবিক অস্তিত্বগতও বটে।
এআই প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব বর্ণনায় গার্ড লিওনার্ড একটি চমৎকার শব্দ ব্যবহার করেছেন ‘হেলভেন’ (হেল+হেভেন)। এআই প্রযুক্তি একই সাথে স্বর্গ ও নরক দুই-ই নিয়ে আসতে পারে। এটি নির্ভর করছে আমরা কিভাবে প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছি তার ওপর। স্বর্গ যেমন, রোগমুক্তি (জিন এডিটিং), অবারিত সৌরশক্তি ব্যবহার ও পুনরাবৃত্ত ধরনের শ্রম থেকে মানুষের মুক্তি ইত্যাদি। নরক: নজরদারী সমাজ, গণ-বেকারত্ব এবং মানুষের নিজস্ব বিচারবুদ্ধি ও কর্তসত্ত্বা হারানো। যখন অ্যালগরিদম আমাদের হয়ে সব সিদ্ধান্ত নেবে, তখন আমরা কার্যত ডিজিটাল দাসে পরিণত হব।
এআই অর্থনীতিকে বদলে দিচ্ছে। মার্কস মনে করতেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের ফলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বদলে যেতে বাধ্য। তিনি তার পুঁজির আঙ্গিক গঠন তত্ত্বে বলেন, মুনাফা ও প্রতিযোগিতার এক পর্যায়ে মানুষের শ্রমকে প্রতিস্থাপন করবে মেশিন। তার সময়ে এআই ছিল না। রোবট বা এআই যখন সব কাজ দখল করে নেবে, তখন মানুষের আয় থাকবে না। আয় না থাকলে বাজারে পণ্যের ক্রেতাও থাকবে না, ফলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়বে। বর্তমানে এআই ও অটোমেশন সেই তত্ত্বেরই চূড়ান্ত রূপ। যেহেতু কেবল মানুষের শ্রমই মুনাফা তৈরি করতে পারে, তাই অটোমেশনের ফলে উৎপাদনে শ্রমের অংশ কমায় মুনাফার হার কমতে থাকবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চরম বিকাশের ফলে প্রথাগত মুনাফাভিত্তিক পুঁজিবাদ আর কাজ করবে না। এআই আমাদের ভিন্ন পথে পোস্ট-ক্যাপিটালিজমে উত্তরণের পথে নিয়েও যেতে পারে।
ডার্ক হেলবিং মনে করেন যে, মুনাফা যখন কমে যাবে, তখন কর্পোরেট শক্তিগুলো মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতা ধরে রাখতে চাইবে। অর্থাৎ, সমাজ একটি অ্যালগরিদমিক একনায়কত্বের দিকে ধাবিত হতে পারে। পাচ ছয়টি বড় বড় টেক জায়ান্ট গুগল, মেটা, আমাজন, আ্যাপেল আজ পৃথিবীর সমস্ত ডেটা ও প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রক। লিওনার্ড একে বলেছেন ডিজিটাল সামন্তবাদ। মানুষ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আমরা কেবল সাবস্ক্রাইব করছি। আমাদের প্রতিটি ক্লিক, লাইক ও সার্চ হলো তাদের ডিজিটাল মুনাফার কাচামাল। টেক কোম্পানিগুলো অ্যালগরিদমের মাধ্যমে আমাদের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ন্ত্রণ করছে।
মানুষ নাকি প্রযুক্তির প্রভুত্ব এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে হাজির হয়েছে। প্রযুক্তি আমাদের প্রভু হয়ে উঠছে। অ্যালগরিদমিক নিয়ন্ত্রণ ঠিক করে দিচ্ছে আমরা কী খাব, কাকে ভোট দেব, কার সাথে বন্ধুত্ব করবো। নির্ভরশীলতার নতুন ফাদ তৈরী হচ্ছে। আমরা প্রযুক্তির ওপর এত বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি যে, প্রযুক্তি ছাড়া আমরা নিজেদের অসহায় বোধ করি। লিওনার্ড সতর্ক করেছেন যে, মানুষ যখন নিজেকে দক্ষ করার জন্য শরীরের ভেতর চিপ বা ব্রেইন-ইন্টারফেস লাগাতে শুরু করবে, তখন সে তার স্বাধীন সত্তা চিরতরে হারিয়ে ফেলবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জনিত নতুন ধরনের অর্থনৈতিক সঙ্কট সামাল দিতে ভবিষ্যতে সার্বজনীন ন্যূনতম আয় আয় বা ইউনিভার্সাল বেসিক ইনকামের বিষয়টি সামনে আসছে। প্রযুক্তি যখন মানুষের কাজ কেড়ে নেবে, তখন মানুষ আয়ের পথ থাকবে না। এখানে অনেক অর্থনীতিবিদ সার্বজনীন নূন্যতম আয়ের কথা বলেছেন। রোবট ট্যাস্ক ভাবা হচ্ছে। রোবট কর থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে নাগরিকদের জন্য ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তা দিবে রাষ্ট্র, যাতে করে অটোমেশনের যুগেও মানুষ বেচে থাকতে পারে। প্রশ্ন হাজির হচ্ছে, - এই পরিবর্তন বিবর্তন নাকি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে হবে? যদি বড় কোম্পানিগুলো সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখে, তবে গণবিপ্লব অনিবার্য হবে। কিন্তু রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে নতুন সামাজিক চুক্তির মধ্য দিয়েও এটা হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
প্রযুক্তি কেবল অর্থনীতি নয়, মানবিক সম্পর্ক ও অনুভূতির ধরনও বদলে দিচ্ছে। সম্পর্কের মানবিক গভীরতা হারিয়ে যাচ্ছে। দার্শনিক মার্টিন হেইডেগারের মনে করেন, প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগ বৃদ্ধি করলেও মানবিক নৈকট্য কমিয়ে দিচ্ছে। এই অভূতপূর্ব সংযোগের (কানেকটিভিটি) যুগে দাড়িয়ে আমাদের মনে প্রায়ই একটি গভীর শূন্যতা কাজ করে—আমরা কি সত্যিই একে অপরের ‘কাছে’ আছি? তথ্যের আধিক্য, কিন্তু অনুভূতির অভাব তৈরী হয়েছে। কারণ, এই যোগাযোগগুলি আমাদের গভীরতম সত্তাকে স্পর্শ করতে পারে না। হেইডেগারের মতে, নৈকট্য কোনো ভৌগোলিক পরিমাপ নয়। নৈকট্য হলো কোনো কিছুর অস্তিত্বকে তার নিজস্ব মহিমায় অনুভব করা। আমরা মেটাভার্সের ভার্চুয়াল জগতের অধিবাসী হয়ে উঠছি। কায়েম হয়েছে ডিজিটাল পুঁজিবাদ, তৈরী হচ্ছে ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতা।
মানুষকে তার নিজের মধ্যে নিজে ফিরে আসার জন্য ডিজিটাল তন্দ্রা থেকে জেগে ওঠা জরুরী। আমরা প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নই, কিন্তু প্রযুক্তিকে মানুষের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অধীন হতে হবে। এআই যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা সব সময় মানুষের যাচাই ও অনুমোদনের অধীন রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে প্রযুক্তি যেন আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রক না হয়ে ওঠে। একই সাথে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কর্পোরেটদের মুনাফার হাতিয়ার ও পুঁজির কবল থেকেও মুক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশের মতো শ্রমঘন অর্থনীতির জন্য অটোমেশন একটি দ্বিমুখী তলোয়ার। আমাদের তৈরি পোশাক শিল্প ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স—উভয়ই সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। উন্নত বিশ্বে যদি রোবটিক সেলাই ও স্বয়ংক্রিয় নির্মাণ কাজ শুরু হয়, তবে বাংলাদেশের লাখ লাখ শ্রমিক কর্মহীন হওয়ার ঝুকিতে পড়বে, অর্থনৈতিক সংকট তৈরী হবে। এআই প্রযুক্তির সচেতন ব্যবহারে আমরাও যেন পিছিয়ে না থাকি।
ড. আখতার সোবহান মাসরুর: লেখক ও গবেষক
- বিষয় :
- এআই
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
