ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ক্রীড়া-রাজনীতি

আমাদের গাঁওয়ের ছাওয়াল মুস্তাফিজ

আমাদের গাঁওয়ের ছাওয়াল মুস্তাফিজ
×

মুস্তাফিজুর রহমান

হিলাল ফয়েজী

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ১৪:২৩

শতকের চার ভাগের তিন ভাগ পেরিয়ে পথ ভাঙছি। এর মধ্যে কোমর ভাঙছি, হাত ভাঙছি, পা ভাঙছি, আঙুল ভাঙছি। জোড়া লাগিয়ে আবার উঠে দাঁড়াচ্ছি। ওরা ‘বত্রিশ’ নামের বঙ্গ-আত্মা ভাঙছে। মন ভাঙছে। মন জোড়া দিয়ে কাল কাটাচ্ছি। গার্হস্থ্য গতর পোহাচ্ছি। রং বদলায়– হেমন্ত গান গুনগুন করছি। জীবনের মানে খুঁজছি। মানব-দানবের নৃত্য দেখছি। পূর্ব বাংলা তথা অপূর্ব বাংলাদেশের এক ইতিহাস কাঁপানো-দাপানো ১৮ মাস তো কাটিয়েই দিলাম। আশ্রিত ঘরে মিশ্রিত জীবন। মবের ভয়ে মোবাইল ফোনই এলাহি ভরসা। কিঞ্চিৎ লিখতাম-টিখতাম। এদিক-ওদিক। টুকরো-টাকরা। আপন পরান বাঁচা। সেসব ছেড়ে ছুড়ে যখন ‘হতাশা’ বিষয়টির ওপরও হতাশ হয়ে পড়লাম, তখন একটি সংবাদে মন-পরান আচানক আশ্চর্য-চাঙ্গা করে দিল বাংলাদেশের সাতক্ষীরার এক গাঁওয়ের ছাওয়াল।

ছাওয়ালটি স্কুলে ক্লাস করতে যেত না। মাঠে-বাদাড়ে-পাথারে ঘুরে বেড়াত। হাতে ক্রিকেট বল। বল ছুড়ে ছুড়েই ডিগডিগে লম্বা হতে থাকল। গাঁয়ের ছাওয়াল কী করে ক্যামন যশ কেড়ে নিল। দারুণ বল করে। বাল্যকাল থেকে বাটার না খাওয়া ছেলেটি ক্রিকেটের কাটার বোলার হয়ে একেবারে ফুড়ুংফাড়ুং জাতীয় দলে সেঁধিয়ে গেল। নাম হয়ে গেল কাটার মাস্টার। গাঁওয়ের ছাওয়ালটি ক্রিকেট পুঁটি থেকে ফুড়ুত করে ক্রিকেট বোয়াল হয়ে গেল।

দিন যায় রাত যায়। মুস্তাফিজ নামটি ক্রিকেট দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। মাঝে তার বলে তেমন কামড় হচ্ছিল না। ছেলেটি তার নীরব সাধনা বাড়িয়ে দিল। একসময় তার ফর্ম ফিরে এলো। শুধু আমাদের উপমহাদেশ নয়– দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ… মুস্তাফিজ, সংক্ষেপে ফিজ নামটি মশহুর হয়ে উঠল। পাকিস্তানের সাম্প্রতিক পিএসএল এবং বাংলাদেশ বনাম নিউজিল্যান্ড ওয়ানডে ম্যাচের পর মুস্তাফিজের সাফল্যগাথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বিশ্বের প্রবীণ ক্রিকেটারদের অনেকেই বলছেন– কার্যত ফিজ ইজ দ্য বেস্ট।

মনটা ভরে গেল। মনটা ছুটে গেল সাতক্ষীরার ওই প্রান্তরে। যেখানে গাঁওয়ের ছেলে মুস্তাফিজ সারাদিন ঘুরে বেড়াত। তার ক্রিকেট বল ছুড়ে ছুড়ে হাত পাকাত কৈশোরিক চঞ্চলতায়। ক্রিকেট বিশ্বজোড়া খ্যাতিময় অভিজ্ঞ বোলার আজ আমাদের মুস্তাফিজ। অথচ কয়েক মাস আগে এ কী কাণ্ড ঘটে গেল মুস্তাফিজকে ঘিরে। আইপিএল এখন ক্রিকেটবিশ্বের প্রধান আসর। সেখানে শাহরুখ খানের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স আমাদের ফিজকে দলভুক্ত করল। আমরা বিশেষত বাংলাদেশের সবাই সম্মানিত বোধ করলাম।

তারপর হঠাৎ একদিন শুনলাম ভারতের ক্রিকেটশার্দুলরা মুস্তাফিজকে বাদ দিতে শাহরুখ খানকে বাধ্য করেছে। আমরা বাংলাদেশের সর্বমতের লোকেরাই একটা দারুণ মনোধাক্কা খেলাম। এমনটা হবে কেউ প্রস্তুতই ছিলাম না। এমনিতেই এ দেশে কারণে-অকারণে ভারতবিরোধিতার কলকাঠি সরেস। ফিজ ঘটনায় তা দাউ দাউ করে উঠল। ভাবতে থাকলাম এমন ক্যানো হলো।

তারপর ভাবতে থাকলাম কার্যকারণ। বাংলাদেশে এক কোটা-দংশনে টিটেনাস হয়ে সরকার পতন হয়ে গেল। এলেন একজন দুনিয়ার জ্বলজ্বল বাংলাদেশি তারকা। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী; কিন্তু ক্ষমতা হাতে নিয়েই শুরু করলেন অশান্তির কথা। আমাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আমরাই বঙ্গোপসাগরের কর্তা। উত্তর-পূর্ব ভারতের নির্ভর করতে হবে আমাদের ওপরই। এক ছাত্রনেতা বললেন, দখল করে নেব উত্তর-পূর্ব ভারত। আরও নানাকিছু নিয়ে নিয়ে দুদেশেরই মিডিয়া ঘৃণা-বিদ্বেষ-হুংকার-পাল্টা হুংকারে মত্ত হয়ে গেল।

এমনি পটভূমিতে হঠাৎ মুস্তাফি হলো শিল-পাটা-মরিচের কাহিনি। এর ভেতরও দেখলাম, ভারতের নামিদামি ক্রিকেটার ও নানা পর্যায়ের সজ্জনরা মুস্তাফিজের পক্ষে অবস্থান নিলেন। যাক, পৃথিবীর সবাই নরক হয়ে যায়নি।

মুস্তাফিজ, তোমার একটা জিনিস ভারী মুগ্ধ করে। অনেক বোলার দেখি উইকেট পেলেই বুনো উল্লাস করে। তুমি কত শত উইকেট পেলে। কী শান্ত, নিরীহভাবে তুমি উইকেট অর্জনকে বরণ কর। পৃথিবীর সব বোলারেরই তোমার কাছে শেখার আছে।
গাঁয়ের ছাওয়াল মুস্তাফিজ। শহুরে, মেট্রোপোল অধিবাসী পটভূমির ক্রিকেটারদের এভাবেই তুমি শিক্ষক। তোমার কল্যাণ কামনা করি। মঙ্গল হোক পৃথিবীর। তোমার রুচিতে কুচি কুচি হোক পৃথিবীর সব স্থূলতা।

হিলাল ফয়েজী: প্রকৌশলী ও কলাম লেখক
 

আরও পড়ুন

×