সামাজিক মাধ্যম
ক্লিক ও রেইজ বেইট যেভাবে মব উস্কে দিচ্ছে
রাইসা জান্নাত
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ১৫:৪৫
সাম্প্রতিক সময়ে, রেইজ বেইট শব্দটি বেশ পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষ করে ফ্যাসিবাদ, রাজনৈতিক অর্থনীতি, মব সংস্কৃতি-এসব ক্ষেত্রে রেইজ বেইটের ব্যবহার এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। 'রেইজ বেইট' বলতে এমন এক ধরনের কনটেন্টকে বোঝানো হয়, যেগুলো সচেতনভাবে মানুষকে রাগিয়ে তোলে। অক্সফোর্ড ডিকশনারি রেইজ বেইটকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তাদের বর্ষসেরা শব্দ হিসেবে ঘোষণা করে। এখানে রেইজ বেইটের সঙ্গে ক্লিক বেইটকে অনেকেই গুলিয়ে ফেলতে পারে। রেইজ বেইটকে ক্লিক বেইটের 'ইন্টারনেট কাজিন' বলা হলেও, দুটো আলাদা বিষয়।
রেইজ বেইটের কাজ হলো ইচ্ছাকৃতভাবে রাগ, ক্ষোভ উস্কে দেয়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন কনটেন্ট শেয়ার এমনকি কমেন্ট করার মাধ্যমেও এই ক্ষোভ ছাড়ানো হয়। এটাকে বলা হয় ‘রেইজ ফার্মিং’। অন্যদিকে, ক্লিক বেইট শব্দটির সঙ্গে কৌতূহল বিষয়টির যোগ রয়েছে। এখানে শিরোনাম, থাম্বনেইল দেখে অডিয়েন্স কৌতূহলী হয়ে জানার জন্য কোন একটি সংবাদে ক্লিক করে থাকেন। সংবাদমাধ্যমগুলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে ভিউ বাড়ানোর জন্য আকর্ষণীয় হেডলাইন, থাম্বনেইল ব্যবহার করে কনটেন্ট প্রস্তুত করা হয়, যার সঙ্গে মূল খবরের তেমন মিল থাকে না। এটাই ‘ক্লিক বেইট’ জার্নালিজম। ক্লিক বেইট অনেকটা সংবেদনশীল, সে তুলনায় রেইজ বেইট প্রবলভাবে আগ্রাসী।
বাংলাদেশে রেইজ বেইটের গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদাহরণ হলো মাজার ভাঙ্গা, বাউলদের ওপরে আক্রমণ, পিটিয়ে হত্যার ঘটনাগুলো। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর অফিসে হামলার ঘটনাও প্রাসঙ্গিক। ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্ববর্তী সরকার গঠন করা হয়।
এই সময় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে ‘মব সংস্কৃতি’। বিশেষ করে মাজার ভাঙ্গা ও বাউলদের ওপর আক্রমণ ছিলো চোখে পড়ার মত। গেল অক্টোবরে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’-এর পরিসংখ্যান অনুসারে, গত ১৪ মাসে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ১৫৩ জন। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ১৭ মাসে সারা দেশে ৯৭টি মাজারে হামলা হয়েছে। হামলার ধরনে পার্থক্য থাকলেও প্রায় সব ক্ষেত্রে ‘তৌহিদী জনতা’ তার বিশেষ বয়ান ও বেশভূষাসহ নেতৃত্বে ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এমনকি, ভিডিও বিশ্লেষণ করে বলা হয়, অন্তত ২৩টি ঘটনায় ‘নারায়ে তাকবির’ স্লোগান দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। গত মাসে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরেও পুরানো একটি ভিডিও সামনে এনে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর নামের এক পীরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি জনসাধারণের স্বস্তঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে জুলাই আন্দোলন হয়। সবাই যার যার মতাদর্শ, দ্বন্দ্ব-বিভেদ ভুলে এককাতারে দাঁড়িয়েছিলো। যেকারণে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে একধরনের আশার সঞ্চার হয়, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন তারা। যদিও সেই স্বপ্ন ভাঙতে খুব বেশি সময় লাগেনি। অন্তবর্তী সরকার আসার পর দলগুলো যার যার স্বরূপে ফিরতে শুরু করে। মনস্তত্ব বলে, মানুষ যখন রেগে থাকে, তখন তার যৌক্তিক বিচারবুদ্ধি বা সমালোচনামূলক চিন্তার ক্ষমতা কমে যায়। ষড়যন্ত্রকারী বা বিশেষ সুবিধাভোগী কোন গোষ্ঠী তখন এই সুযোগটিই নেয়। তারা এমন সব গল্প বা তথ্য প্রচার করে যা মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক বা রাজনৈতিক অনুভূতিতে আঘাত হানে। রেইজ বেইটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্যের খণ্ডিতাংশ ব্যবহার করা। প্রসঙ্গের বাইরে অর্থাৎ ডি-কনটেক্সটুয়ালাইজেশন আকারে উপস্থাপন করা হয়। নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মাঝে ক্ষোভ উৎপাদন করে ‘আস ভার্সেস দেম’ বানানো হয়। এতে, অপরপক্ষের ওপর মব করা একপ্রকার বৈধতা পেয়ে যায়।
শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর বিদেশে বসবাসরত দুই বাংলাদেশি, যারা ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে পরিচিত, তাদের উস্কানিমূলক পোস্টে সাড়া দিয়ে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো অফিসে হামলা চালানো হয়। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির ওপরও। মূলত, এই দুই ব্যক্তি রেইজ ফার্মার বা ক্ষোভ উৎপাদকের ভূমিকায় হাজির হন। এখানে রেইজ ফার্মাররা তাদের অনুসারীদের বিশ্বাস করান যে, অন্য পক্ষ কেবলই সাধারণ প্রতিপক্ষ নয়, বরং তারা এমন এক শত্রু যাদের পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে হবে। রেইজ ফার্মিং সবচেয়ে কার্যকর হয় তখন, যখন টার্গেটেড একটা শ্রেণীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করা হয়। রাগ তৈরি হওয়ার মত হেডলাইন, মিম এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য তাদের আরও বেশি উত্তেজনাপূর্ণ তথ্য খুঁজতে উৎসাহিত করে; যা তাদের রাগ দীর্ঘস্থায়ী করে।
এক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি এবং ইনফ্লুয়েন্সাররা। নয়া পুজিবাদী অর্থনীতির এই সময়ে মানুষের মনোযোগও একটি পণ্য। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এমনভাবে অ্যালগরিদম তৈরি করে যা ব্যবহারকারীকে স্ক্রিনে আটকে রাখতে চায়। গবেষকরা বলছেন, মানুষ ইতিবাচক তথ্যের চেয়ে নেতিবাচক বা রাগ তৈরি করে এমন তথ্য, কনটেন্টে বেশি সাড়া দেয়। আর শাসক গোষ্ঠী বা সুবিধাভোগী কোন শ্রেণী প্রকৃত সমস্যা থেকে মনোযোগ সরাতে রেইজ বেইট ব্যবহার করে ক্ষোভকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বা অন্য কোন ঘটনার দিকে চালিত করে, যেটা ‘কালচারাল ওয়ার’ হিসেবেও পরিচিত। ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের অন্যতম ভিত্তিই হলো একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা এবং সাধারণ মানুষকে তাদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলা।
রাজনীতিতে রেইজ বেইটের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। গবেষকরা বলছেন, ‘অ্যাংগার বা ‘রাগ’বর্তমানে অত্যন্ত শক্তিশালী টুল। আর এটি ডানপন্থী ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রসারে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর একটি বড় উদাহরণ বলা যায়, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনা। ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার সমর্থকরা অনবরত দাবি করতে থাকেন যে নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। এবং ক্রমাগত তৎকালীন টুইটারে উস্কানিমূলক পোস্ট এবং মিম শেয়ার করা হয়। এটি ছিল পরিকল্পিতভাবে অনুসারীদের মনে ক্ষোভ বা রাগ জমানোর একটি প্রক্রিয়া। ভার্চুয়াল রাগ মুহূর্তের মধ্যে শারীরিক সহিংসতায় রূপ নেয়। উগ্র সমর্থকরা ক্যাপিটল হিলে হামলা চালায়, ভাঙচুর করে এবং প্রাণহানিও ঘটে। তেমনি, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র আছে এবং দেশটি বিশ্বের জন্য হুমকি, ট্রাম্পের এধরনের উস্কানিমূলক পোস্ট, বক্তব্য ইরানে হামলা চালানোকে একপ্রকার বৈধতা দেয়।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী চরিত্র আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার আক্রমণাত্মক ভাষা, অন্যকে উপহাস করা এবং নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করা তাকে সমর্থকদের কাছে একজন ‘শক্তিশালী’ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ট্রাম্পের রাজনীতিতে অভিবাসী, মেক্সিকান বা মুসলিমদের প্রায়ই নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়। ট্রাম্পের ফ্যাসিবাদী বয়ান সোশ্যাল মিডিয়ার নিও লিবারেল বিজনেস মডেলের সাথে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। প্ল্যাটফর্মগুলো ট্রাম্পের উস্কানিমূলক বক্তব্য বন্ধ করতে চায় না কারণ সেগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আসে। প্রতিবেশি ভারতেও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বিজেপি নেতাদের প্রচারণায় মুসলমান সম্প্রদায় ও বাংলাদেশি অনুপ্রেবশকারীদের নিয়ে উস্কানিমূলক নানা বক্তব্য দিতে দেখা যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প বা নরেন্দ্র মোদির মতো নেতারা রেইজ বেইটকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এধরনের ক্ষোভ-জাগানিয়া প্রচারণার সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি হলো একটি কার্যকর গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি অর্থাৎ পারস্পরিক সংলাপ বা আলোচনার পথ পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ভার্চুয়াল জগত দ্বারা অনেক বেশি প্রভাবিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় যে বিতর্কগুলো চলে, সেগুলো একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মৌলিক ভূমিকা রাখছে।
রাইসা জান্নাত: সাংবাদিক
- বিষয় :
- সামাজিক মাধ্যম
- মব সহিংসতা
