ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

আড়ালে মোজতবা খামনি: ইরান কে চালাচ্ছে?

আড়ালে মোজতবা খামনি: ইরান কে চালাচ্ছে?
×

হাসান আল-মুস্তফা

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ১৭:৫২

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে হত্যা করা হয়। এর মধ্যদিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কেবল ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকেই শেষ করে দেয়নি, বরং তাঁর সাথে তেহরানের রাজনৈতিক ও সামরিক অভিজাতদের একটি অংশকেও নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে।  প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের অধীনে অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্ব পরিষদ বসিয়ে শাসনব্যবস্থার শীর্ষের এই শূন্যস্থানটি সাময়িকভাবে পূরণ করা হয়েছিল। এরপর ৮ মার্চ বিশেষজ্ঞ পরিষদ মোজতবা আলী খামেনিকে তাঁর পিতার উত্তরসূরি হিসেবে বিপ্লবের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করে।
নতুন নেতা জনসমক্ষে আসেননি। নেতৃত্বে তাঁর উপস্থিতি নিশ্চিত করার মতো একটিও ছবি, ভিডিও বা এমনকি অডিও রেকর্ডিংও দেখা যায়নি। এই নীরবতা জল্পনা-কল্পনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আর ইরানের ভেতরে ও বাইরে পরস্পরবিরোধী দাবি ছড়িয়ে পড়েছে যে, তিনি মারা গেছেন, গুরুতর অসুস্থ, অথবা আহত হয়েছেন।

আমি উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করেছি এবং ইরানের ভেতরে ও বাইরের বিভিন্ন সূত্রগুলোও মিলিয়ে দেখেছি। আমার মূল্যায়ন হল, মোজতবা খামেনি জীবিত আছেন। এই দাবি চূড়ান্ত না হলেও বিশ্বাসযোগ্য। তিনি আহত হয়েছিলেন, কিন্তু সেরে উঠছেন। আর তিনি এখনও তাঁর ঘনিষ্ঠতম অনুচরদের একটি ছোট বৃত্তের মাধ্যমে ও অসাধারণ নিরাপত্তা প্রাচীরের আড়ালে থেকে দেশ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাহলে সম্মুখে আসছেন না কেন? 
এর নেপথ্য তিনটি কারণ রয়েছে বলে মনে করি। প্রথমটি খুবই সহজ, তাকে বাঁচিয়ে রাখা। তেহরান মার্কিন বা ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের এমন কোনো সুযোগ দিতে চায় না, যার ফলে তার বাবার মৃত্যু হয়েছিল। কয়েক মাসের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতাকে হারানো হবে বিপর্যয়কর, এবং তৃতীয় একজনকে ঘিরে বিশেষজ্ঞ পরিষদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হল ছবি। যখন কোনো নতুন নেতা প্রকাশ্যে আসেন, বিশেষ করে যুদ্ধকালে, তখন তাকে দুর্বল দেখালে চলবে না। তাকে বিধ্বস্ত দেখালে চলবে না। এমন এক সংঘাতে বাহ্যিক রূপই একটি অস্ত্র, সেখানে একজন দুর্বল বা ক্ষতবিক্ষত সর্বোচ্চ নেতা শত্রুর জন্য আশীর্বাদস্বরূপ হবেন। তেহরান হিসাব করছে যে, একজন দৃশ্যত আহত সর্বোচ্চ নেতাকে দেখানোটা তার নিজের জনগণের চেয়ে শত্রুদেরই বেশি সুবিধা দেবে।
একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মোজতবা খামেনের পায়ে গুলি লেগেছিল, তার মুখে একটি ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে এবং এক পর্যায়ে তিনি হাঁটতে পারছিলেন না। যদি এটি সত্যি হয়, তবে এ নীরবতা নিজেই এই বার্তা দেয় যে, দেশের অভ্যন্তরে জনগণকে হতাশ করবেন না এবং আলোচনার টেবিলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে কোনো সুবিধা দেবেন না।
তৃতীয়টি পরিকল্পিত। কৌশলগত দিক অস্পষ্ট রাখাটা দীর্ঘদিন ধরেই ইরানি রাষ্ট্রকৌশলের একটি হাতিয়ার। শাসনব্যবস্থার ভেতরের চিত্র যত ঝাপসা হয়, তেহরানের কৌশল খাটানোর সুযোগ তত বাড়ে এবং বিদেশি বিশ্লেষকদের পক্ষে নতুন নেতৃত্বের ক্রম নির্ধারণ করা তত কঠিন হয়ে পড়ে। এই ধোঁয়াশা কোনো ত্রুটি নয়, বরং একটি বৈশিষ্ট্য। কারণ, এটি জল্পনা-কল্পনার জন্ম দেয়, যার বেশিরভাগই সঠিক অভ্যন্তরীণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে না।
পশ্চিমা বিশ্বের সুখ্যাত থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনগুলো থেকে একটি ভাষ্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, মোজতবা খামেনি মৃত বা অক্ষম, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং একটি নৃশংস উত্তরাধিকারের লড়াই চলছে। এই তত্ত্বগুলো বাস্তব ইরানের বর্ণনা দেয় না, বরং এগুলো সেই ইরানকেই তুলে ধরে যা এর প্রণেতারা প্রবীণ খামেনির হত্যার পর প্রত্যাশা করেছিলেন। 

নতুন নেতৃত্বকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হলে, তাকে তার নিজস্ব আঙ্গিকে দেখতে হবে, স্নেহ বা অবজ্ঞার দৃষ্টিতে নয়। এখানে আবেগের ঠাই নেই।
যুদ্ধের আগের চেয়ে আইআরজিসি এখন আরও শক্তিশালী। এটুকু সত্যি। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের কোনো একচেটিয়া আধিপত্য নেই। ক্ষমতা এমন একগুচ্ছ আন্তঃসংযুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বণ্টিত, যেগুলোর সবই সর্বোচ্চ নেতার দপ্তরের অধীনে। তারা সর্বোচ্চ আইনবিদের কাছে জবাবদিহি করে। তাদের মধ্যে ক্ষমতার যে কোনো বিরোধ মোজতবা খামেনেইয়ের নির্দেশনার মাধ্যমে মধ্যস্থতা করা হয়, যিনি সংবিধান অনুযায়ী একাধারে সর্বাধিনায়ক এবং দেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান।
পেজেশকিয়ান কক্ষে উপস্থিত থাকলেও, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্থান এখন আর প্রেসিডেন্সি নয়। এর কর্তৃত্ব এখন অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের হাতে। যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদই হল মূল সংস্থা, যেখানে আইআরজিসি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। সিদ্ধান্তগুলো ওপরের দিক থেকেই আসে এবং সর্বোচ্চ নেতা সেগুলোতে অনুমোদন দেন কিংবা ভেটো বা সংশোধন করেন।

হাসান আল-মুস্তফা: সৌদি লেখক ও গবেষক; আরব নিউজ থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম 
 

আরও পড়ুন

×