প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর
আগুনের আড়ালে ল্যাপটপের লোভ!
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৬:৫৮ | আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ | ১১:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে (ডিপিই) আগুন দেওয়া হয় ১ মে। স্টোরে সাত শতাধিক ল্যাপটপ ছিল। ল্যাপটপগুলো পিটিআইয়ে (প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট) পাঠানোর অপেক্ষায় ছিল। অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস যায়। ভোর ৬টায় হাজির হন মন্ত্রী এহসানুল হক মিলন, প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজসহ কর্তাব্যক্তিরা। শুক্রবারই কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে খবরটি প্রকাশ হয়।
মে দিবস উপলক্ষে সংবাদমাধ্যম বন্ধ থাকায় মোটামুটি বিস্তারিত জানা যায় রোববারের খবরে। সমকালের প্রতিবেদনের শিরোনামেই ঘটনা অনেকটা স্পষ্ট: পরিকল্পিত আগুনে ১৪০ ল্যাপটপ পুড়ে ছাই, হদিস নেই ৮৩টির। পুলিশের সংবাদ সম্মেলনের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি করা হয়, যেখান থেকে জানা যায়, বোরকা পরিহিত অবস্থায় আগুন দিয়েছে ডিপিইর পরিচ্ছন্নতাকর্মী আসমাউল। পাঁচ লাখ টাকা চুক্তিতে এটি করা হয়। ল্যাপটপ সরানোর দৃশ্য পুলিশ সিসিটিভিতে দেখেনি। ল্যাপটপ কেনাকাটায় দুর্নীতি, নাকি অডিটের তথ্য আড়াল করতে পরিকল্পিত আগুন– তা নিয়ে তদন্ত করছিল পুলিশ। আর শিক্ষামন্ত্রীও শুক্রবার তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বলেছিলেন।
গতকাল সোমবার বিকেল পর্যন্ত দুই তদন্তের কোনোটিরই বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে সোমবার যুগান্তরে প্রকাশিত খবরে আরেকটু জানা গেল। সেখানে বলা হয়, আগুনের ঘটনায় তিনজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়েছে। আদালতে জবানবন্দিতে মাস্টাররোলভুক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী আসমাউল ইসলাম জানিয়েছেন, ল্যাপটপ চুরির প্রমাণ মুছতেই এই অগ্নিসংযোগ করা হয়। অর্থাৎ সেখানে যে ৮৩টি ল্যাপটপ পাওয়া যায়নি, সেগুলো আগেই চুরি হয়ে যায়। পরে আসমাউল বিষয়টি ধরতে পারলে তাঁকে পাঁচ লাখ টাকার চুক্তি করে আগুন লাগানো হয়।
প্রশ্ন হলো, ল্যাপটপ চুরি এরপর তার প্রমাণ মুছতে কেন এত বড় আগুন লাগানো? আর বিষয় হলো, এত বড় ঘটনায় তাও আসমাউলের বাইরে মাত্র তিনজন জড়িত? যার মধ্যে সবার দায়িত্বই স্টোরের সঙ্গে যুক্ত? প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মতো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা এতটাই ঠুনকো যে, সহজেই সেখানে আগুন লাগানো যাবে? স্টোর রুমে যেখানে কোটি কোটি টাকার ল্যাপটপ আছে, সেখানকার সুরক্ষা ব্যবস্থা এতটা হালকা হবে কেন? তারপরও যদি ধরে নেওয়া হয়, স্টোরের সঙ্গে যুক্তদের যোগসাজশে আগুন লাগানো হয়েছে– নিরাপত্তার প্রশ্ন থেকেই যায়। আরও বিষয় হলো, ৮৩টি ল্যাপটপ কি তারাই সরিয়েছে এবং সেই দায় মুছতে পুরো সাড়ে ৭০০ ল্যাপটপ পুড়িয়ে ফেলার সাহস ও পরিকল্পনা কেবল স্টোরের দায়িত্বপ্রাপ্তরা করতে পারে? অবিশ্বাস্য!
প্রথম দিন অবশ্য ল্যাপটপের পাশাপাশি নথি পুড়ে যাওয়ার খবরও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। আমরা জানি না, সেগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণছিল কিংবা সেই নথিতে আসলে কী ছিল। সরকারি মূল্যবান নথি গুরুত্বপূর্ণ, যার দাম নির্ণয় করা কঠিন। সুতরাং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে আগুনের ঘটনাকে কেবল ল্যাপটপ চুরি বলার আগে পুলিশ ও মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জরুরি। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান থেকে বলা যায়, এত বড় আগুনের ঘটনা ল্যাপটপ চুরি কিংবা স্টোরের সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বশীলদের পরিকল্পনার মধ্যে সীমিত থাকতে পারে না।
প্রাসঙ্গিক আরেকটি বিষয় বলা দরকার, দুঃখজনকভাবে সরকারি সম্পদ দেখাশোনার দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা দেখি। ভাবখানা এমন, নষ্ট হলে আমার কী! সরকারের যাবে। ‘সরকারি মাল’ সুরক্ষায় এই অবহেলা অমার্জনীয় অপরাধ। সরকারের সম্পদ মানে জনগণের সম্পদ। একে নিজের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। দায়িত্বপ্রাপ্তরা যদি সরকারি জিনিসকে আমানত মনে করেন, তবে অপচয় হবে না এবং এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।
সুতরাং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে আগুনের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক থেকে শুরু করে বড় বড় কর্মকর্তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। সংগত কারণেই তাদের সন্দেহের মধ্যে রেখেই তদন্ত জরুরি। ল্যাপটপের আড়ালে এ ঘটনায় প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসুক।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- মাহফুজুর রহমান মানিক
