প্রতিবেশী
বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ জয়ে বাংলাদেশের জন্য বার্তা
হাসান মামুন
হাসান মামুন
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ | ১১:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভারতের পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন হলেও কেন্দ্রে থাকা বিজেপি সরকার পশ্চিমবঙ্গকে সর্বাধিক গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল। সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকারের শাসন অবসানে তারা ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ভোটার তালিকা সংশোধনে তৃণমূলের ‘বাঁধা ভোটার’ বলে বিবেচিত মুসলিমদের টার্গেট করে বাদ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এদিকে শতাধিক আসনে কারচুপির অভিযোগ এনেছেন মমতা। তবে সত্য হলো, বিপুলভাবে জয়ী হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো সরকার গড়তে যাচ্ছে বিজেপি। আসনের ব্যবধান বিরাট। ভোটের ব্যবধানও সামান্য নয়। মমতা নিজে হেরে গেছেন সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে।
আসামেও বিজেপি অবস্থান ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে সংশয় ছিল বলে এর আনন্দটা অবশ্য বিজেপি সমর্থকরা বেশি অনুভব করছেন। নির্বাচন সহিংসতামুক্তই হয়েছে। বড় পালাবদলের পর বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক গোলযোগের শঙ্কা অবশ্য উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে প্রতিশোধমূলক হামলার ঘটনাগুলো বিজেপির ‘ঐতিহাসিক বিজয়’কে কলঙ্কিত করবে– এটা দলটির নেতারা নিশ্চয় বোঝেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা এ দিনটির অপেক্ষায় ছিলেন। বিজেপির ভোট ও আসন যেভাবে লাফিয়ে বাড়ছিল, তাতে বাংলাদেশ থেকেও আমরা ধরে নিয়েছিলাম, দ্রুতই দলটি পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বসবে।
ভারতের বিশেষত রাজ্য পর্যায়ে টানা ক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়টি লক্ষণীয়। পশ্চিমবঙ্গ এর ভালো উদাহরণ। কংগ্রেস, বামফ্রন্টের পর তৃণমূল দীর্ঘ কাল রাজ্যটি পরিচালনা করেছে। তাতে পশ্চিমবঙ্গের কতখানি উন্নতি হয়েছে, সেটা নিয়ে আলোচনাও কম নয়। ঐতিহাসিক যোগসূত্র ছাড়াও বাঙালি অধ্যুষিত বলে পশ্চিমবঙ্গ বিষয়ে আমাদেরও আগ্রহ বেশি। বিবিধ প্রয়োজনে এ রাজ্যে যাতায়াত বেশি। রয়েছে নিবিড় সীমান্ত বাণিজ্যও। এসব কারণে পশ্চিমবঙ্গে বড় কিছু ঘটলে আমরাও আলোড়িত হই। এর তাৎপর্য বিশ্লেষণ করি।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার এলে ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকবে বলে পরিস্থিতিটা বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে– এমন আলাপ সামনে এসেছে; নানা শঙ্কার মধ্যেও। মমতা সরকারের প্রবল আপত্তিতে তিস্তা চুক্তি হয়নি। বিষয়টি ঝুলে থাকায় বাংলাদেশের বিরাট অঞ্চলজুড়ে কৃষিসহ জনজীবনে সংকট বাড়ার কথা সবারই জানা। মমতা অবশ্য ভোটের স্বার্থেই ওই ‘নির্মম’ অবস্থান নিয়েছিলেন। তিস্তা পশ্চিমবঙ্গের যেসব অঞ্চল দিয়ে বয়ে গেছে, সেখানে এবার আবার ভালো করেছে বিজেপি। ভোটের বিবেচনা তাদেরও থাকতে পারে। তা সত্ত্বেও আশা, কেন্দ্রীয় সরকার এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু করতে চাইলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার অন্তত আপত্তি করবে না।
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হওয়ার প্রায় তিন মাস আগে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ দেখাচ্ছে মোদি সরকার। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা না থাকলেও তারা এটা দেখাতেন। এ মনোভাব তারা অন্তর্বর্তী শাসনামলেই ব্যক্ত করেছিলেন। মোদি সরকারের পক্ষে এখন সহজ হবে পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে এগিয়ে আসা। বাংলাদেশের দিক থেকেও এ বিষয়ে সদিচ্ছা দেখানো হয়েছে কিছুদিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরে। নির্বাচনের আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এখানে এসেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করলে। তিনি হাতে করে এনেছিলেন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লেখা নরেন্দ্র মোদির চিঠি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে ভারতবিরোধী প্রবণতা তুঙ্গে উঠেছিল; নির্বাচনের পর তা থিতিয়ে আসাটাও লক্ষণীয়। এখানে সৃষ্ট পরিবর্তন মেনে নিতে না পেরে ভারতে বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনগুলোও কম প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। আগরতলায় বিজেপির উগ্র সমর্থকরা বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনে হামলা পর্যন্ত চালায়। তখনকার বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারীও বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধের হুমকিসহ অনেক উস্কানিমূলক বক্তব্য রেখেছিলেন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ভিসাও দেওয়া হচ্ছিল না। তবে অর্থনীতির নিজস্ব নিয়মে দুই দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্তে শান্তি বজায় রাখাও গুরুদায়িত্ব। মূলত ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের কারণে এটি অন্যতম ‘সহিংস সীমান্ত’ বলে এখনও পরিচিত। আর পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সীমান্তই আমাদের সবচেয়ে বেশি। এর উভয় পাশে দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের নির্বাচিত হওয়ার প্রবণতাও লক্ষণীয়। সীমান্তে সহিংসতা কমে সুসম্পর্ক বাড়লে এমনটা দেখতে হতো না। তবে সীমান্তে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজটি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের। সীমান্ত কিংবা সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাড়ানোও কেন্দ্রীয় সরকারের কাজ। তিস্তা চুক্তি সম্পাদন কিংবা গঙ্গা চুক্তির নবায়নও কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়। এ জন্য আমাদের মোদি সরকারের সঙ্গে কথা বলেই কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
এটা অবশ্য ঠিক, বাংলাদেশের চারদিকের রাজ্যগুলোয় বিজেপির উপস্থিতি বাড়ছে। হিন্দুত্ববাদী দলটি কীভাবে এটা নিশ্চিত করছে, তা নিয়ে আলোচনা অনেক। জাতীয় কংগ্রেস ছাড়াও আঞ্চলিক দলগুলোর ব্যর্থতাকেও এ জন্য দায়ী করা হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্য কিছু করার নেই। তবে বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে দক্ষিণপন্থার উত্থান বিজেপির অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার বড় কারণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিও নাকি প্রভাব ফেলেছে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিপুল বিজয়ে। তবে বাংলাদেশে একটি মধ্যপন্থি সরকারই নির্বাচিত হয়ে এসেছে, যারা ভারতের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সুসম্পর্ক চায়।
শুভেন্দু অধিকারী বা অন্য কারও নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে গঠিত হতে যাওয়া বিজেপি সরকারকে এ বাস্তবতা মাথায় নিয়েই চলতে হবে। বাংলাদেশ থেকে ‘ব্যাপক অনুপ্রবেশ’ নিয়ে যে অভিযোগ তারা করে থাকেন, সেটা নির্বাচনে ফায়দা তোলার কৌশল হলে এক কথা। তবে এমন অভিযোগ তুলে ‘পুশইন’ নিয়ে অতি উৎসাহ অব্যাহত রাখলে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন করে সংকটে পড়তে পারে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি জয়যুক্ত হওয়ার পর এ বিষয়ে উৎসাহ কমিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকেও ইতিবাচক বার্তা দিতে হবে বাংলাদেশকে। হালে এটা নিয়ে অস্বস্তি বেড়েছে। পুশইন আরও বেড়ে গেলে সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষও সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। এটা উপেক্ষা করে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখা কঠিন হবে।
পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন হিন্দুত্ববাদী উত্থান ঠেকিয়ে নিজের মতো ছিল। ওখানে ‘হিন্দু ভোট’ একত্র করে বাজিমাত করা যাবে না বলে যে বিশ্বাস ছিল, সেটা ভেঙে গেল এবারের নির্বাচনে। ব্যক্তিনির্ভর তৃণমূলের ভবিষ্যৎ কী– সে প্রশ্ন উঠতে পারে। ভারত কোন পথে যাচ্ছে– সেটাও বড় প্রশ্ন। তবে তার উচিত হবে বাংলাদেশসহ সব প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হওয়া। এ ক্ষেত্রে কী কী ঘাটতি হয়েছিল, সেদিকে বেশি করে নজর দেওয়া জরুরি। পশ্চিমবঙ্গে তাঁর দল জয়ী হওয়ার পর বাংলাদেশের দিক থেকে সুসম্পর্কের দাবি আরও বাড়বে মোদি সরকারের ওপর। বাংলাদেশও নিশ্চয় ভারতের উদ্বেগের জায়গাগুলো ‘অ্যাড্রেস’ করবে।
নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ভারত শুরু থেকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পথে রয়েছে। এটা প্রশংসার। পছন্দ-অপছন্দ পাশে সরিয়ে আমরা নিশ্চয় পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিপুল বিজয়ে তাদের অভিনন্দন জানাব। বাংলাদেশও ঝুঁকি এড়িয়ে গণতন্ত্রের পথে নতুন করে যাত্রা করেছে। তার নাগরিকদের স্বার্থ নতুন সরকার দেখবে। ‘আগে বাংলাদেশের স্বার্থ’ দেখতে রাজনৈতিক দলগুলো একতাবদ্ধ হবে– এটাও প্রত্যাশা। ভারতেও গণতন্ত্র, মানবাধিকার সমুন্নত থাকুক– এ শর্ত পূরণ হলে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নও সহজতর হবে।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
- বিষয় :
- হাসান মামুন
- বাংলাদেশ-ভারত
