প্রযুক্তি
এআই যুগে সৃজনশীলতার শিক্ষা
জাহিরুল ইসলাম
জাহিরুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ০৭:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভারতীয় লেখিকা অরুন্ধতী রায় কিছুদিন আগে এক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘আমরাই সম্ভবত শেষ প্রজন্ম যারা চিন্তা, বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করার শিক্ষা পেয়েছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অযাচিত ব্যবহার বর্তমান প্রজন্মের সেই শক্তিকে নিঃশেষ করে ফেলছে।’ অস্বীকার করা যাবে না, এ প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে শিক্ষার্থীরা এখন পাঠ্যবইবিমুখ। তাদের বড় একটি অংশের চিন্তা এখন পরীক্ষাকেন্দ্রিক এবং এ জন্য তারা হয়ে পড়ছে এআইনির্ভর। শিক্ষাজীবনে যখন তাদের চর্চা করার কথা ছিল জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও চিন্তাশীলতার; তার পরিবর্তে তাদের মধ্যে গড়ে উঠছে এআইনির্ভরতা।
বস্তুত বর্তমান প্রজন্মকে এআই শিখতে হচ্ছে প্রয়োজনের তাগিদে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি বরং হয়ে উঠছে কর্মক্ষেত্রে অস্তিত্ব রক্ষার মানদণ্ড। সহকর্মীর সঙ্গে দক্ষতার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্যও বাড়াতে হচ্ছে এআইর ওপর নির্ভরতা। এমন পরিস্থিতিতে এআইনির্ভরতা ব্যক্তির চিন্তাশক্তি কিংবা সৃজনশীলতায় কোনো প্রভাব ফেলছে কিনা, সে বিষয় বিবেচনার অবকাশ কোথায়! বরং উল্লেখযোগ্য অংশই চাচ্ছে এআই-সংক্রান্ত দক্ষতা অর্জন করে কর্মক্ষেত্রে অস্তিত্ব রক্ষার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে। এমন বাস্তবতায় এআইকে কাজে লাগানো এমনকি তার ওপর নির্ভরতাকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই।
এ ক্ষেত্রে সচেতনভাবে একটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন। এআইকে আমরা ব্যবহার করতে পারি সহযোগী কিংবা নির্দেশক– উভয়ভাবেই। একে নির্দেশক বা পরিচালক হিসেবে ব্যবহার করলে এর দ্বারা চিন্তাশীলতা, সৃজনশীলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা হ্রাস এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে একে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করলে প্রম্পট পরিবর্তনের মাধ্যমে চিন্তা করার উপাদান ইনপুট দিয়ে তার কাছ থেকেও উত্তম আউটপুট নেওয়া এবং তা পর্যালোচনা করার সুযোগ থাকে। পাল্টা কোনো যুক্তি থাকলে এআইকে পুনরায় প্রশ্ন করে আউটপুট পরিবর্তন করা যায়। বলে রাখা ভালো, এটাই এআই ব্যবহারের সঠিক প্রক্রিয়া। এ ধারায় এআই ব্যবহার করলে চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা নিঃশেষ হওয়ার কথা নয়।
বাস্তবতা হলো, ব্যবহারকারীদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশই এ ধারায় এআই ব্যবহারে অভ্যস্ত নন। এখনও অনেকে একে ব্যবহার করেন সার্চ ইঞ্জিনের বিকল্প হিসেবে। সার্চ ইঞ্জিনে কোনো প্রশ্ন করলে অসংখ্য উত্তর মেলে। অন্যদিকে এআইকে প্রশ্ন করলে সুনির্দিষ্ট এবং গোছানো উত্তর পাওয়া যায় বিধায় সংশ্লিষ্টরা প্রাধান্য দিচ্ছেন এআইকে। এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট– এআই কারও চিন্তাশীলতা কিংবা সৃজনশীলতায় প্রভাব ফেলবে কিনা, তা নির্ভর করে ব্যবহারের প্রকৃতি ও ব্যবহারকারীর দক্ষতার ওপর। বরং এটাও বলা যায়, কোনো ব্যবহারকারীর যদি প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকে; এআইর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে শানিত করার সুযোগ কিন্তু রয়েছে। এই সুযোগ নেওয়ার প্রবণতাও তেমন দেখা যায় না। প্রসঙ্গত এও মনে রাখা দরকার, এআইর মানবীয় আবেগ ও কল্পনা শক্তি নেই। প্রযুক্তি কখনও মানুষের এ দুই শক্তিকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে বলেও মনে হয় না। এ জন্য সমকালীন প্রয়োজনে আমাদের উচিত হবে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে এআই দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি তাদের আবেগ-অনুভূতি এবং কল্পনা শক্তি, সৃজনশীলতা যাতে যথাযথ ধারায় বিকশিত হয়, সেই প্রচেষ্টা করা।
মনে রাখা জরুরি, মানুষের আবেগ-অনুভূতি, চিন্তাশীলতা, কল্পনাশক্তি, বুদ্ধিবৃত্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশ কোনো একক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয় না। বরং এগুলো একজন ব্যক্তির মধ্যে গড়ে ওঠে বহুমাত্রিক কিছু কার্যক্রমের সম্মিলিত প্রভাবে। যেমন বই পাঠ ব্যক্তির জ্ঞানভান্ডার প্রসারে সহায়তা করে। আবার কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম তাঁকে শেখায় অন্যের অনুভূতিকে উপলব্ধি করতে। একইভাবে লেখালেখির নিয়মিত চর্চা ও সমসাময়িক ঘটনাবলি বিশ্লেষণের অভ্যাস মানুষের চিন্তাশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে সুসংগঠিত করে। এ ছাড়া শিল্প-সাহিত্যচর্চা ব্যক্তির কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করে এবং বিকাশ ঘটায় সৃজনশীলতার। তাই বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এ যুগে বর্তমান প্রজন্মের সৃজনশীলতা ধরে রাখতে এআই-সংক্রান্ত দক্ষতা অর্জনের সমান্তরালে এসব কার্যক্রমের সমন্বিত চর্চা এখন সময়ের দাবি।
লক্ষণীয়, আমাদের বর্তমান প্রজন্মের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কাজের প্রয়োজন কিংবা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার বিবেচনায় এআই সম্পর্কিত দক্ষতা অর্জনে যতটা আগ্রহী; আবেগ-অনুভূতি, চিন্তাশীলতা, কল্পনাশক্তি, বুদ্ধিবৃত্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশে তারা ততটাই বেখবর। আর বিপত্তিটা এখানেই। এ কারণেই সংশ্লিষ্টদের মধ্যে গড়ে উঠছে না চিন্তা, বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করার সক্ষমতা। এ জন্য আমাদের উচিত যেসব কার্যক্রমের সম্মিলত প্রভাবে ব্যক্তির মধ্যে এ ধরনের সক্ষমতা গড়ে ওঠে, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া। বর্তমান প্রজন্ম যাতে এসবের চর্চায় অভ্যস্ত হয়, সে জন্য জোগাতে হবে উৎসাহ। মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক মানুষই স্বতন্ত্র চিন্তা, কল্পনা ও সৃজনশীলতার অধিকারী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের এই স্বাতন্ত্র্যকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। এখন এআইর অযাচিত ব্যবহার ও অযৌক্তিক নির্ভরতা যদি মানুষের এ বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও সক্ষমতাকে নিঃশেষ করে ফেলে, প্রযুক্তির আলোয় আলোকিত দুনিয়ায় এর চেয়ে বড় হুমকি মানুষের জন্য আর কী আছে!
বর্তমানে এআই প্রযুক্তির বিকাশমান পর্যায়। ক্রমান্বয়ে এটি লাভ করছে উৎকর্ষ। এ জন্য এ হুমকির ব্যাপারে সচেতন হওয়ার এখনই সর্বোত্তম সময়। প্রাথমিক পর্যায় থেকেই আমরা যদি যথাযথভাবে বুঝে এর ব্যবহার রপ্ত করতে পারি, তাহলে উদ্ভূত শঙ্কাগুলো দূর করা যাবে সহজেই।
জাহিরুল ইসলাম: ব্যাংক কর্মকর্তা
- বিষয় :
- মতামত
