ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

থানায় বিএনপি নেতা এবং সর্ষের মধ্যে চাঁদাবাজির ভূত 

থানায় বিএনপি নেতা এবং সর্ষের মধ্যে চাঁদাবাজির ভূত 
×

শাসনগাছা বাস টার্মিনাল, কুমিল্লা

আদনান মনোয়ার হুসাইন 

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ১৫:১৯

কুমিল্লা সদরে গত রোববারের একটি ঘটনা। সেখানকার বিএনপি তো বটেই সারাদেশে সংগঠনটির কিছু নেতাকর্মীর জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে। সেদিন দুপুর ১২টার দিকে থানা পুলিশ ও ডিবি কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল কাইয়ুমকে আটক করে। বাস টার্মিনালে চাঁদাবাজির গোয়েন্দা রিপোর্টের ভিত্তিতে তাকে আটক করা হয় বলে জানা যায়। এদিকে তার অনুসারী পরিবহন শ্রমিকরা যান চলাচল বন্ধ করে দেন। দলের নেতাকর্মীরা থানায় সামনে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। ৮-৯ ঘণ্টা পর রাতে ওসি জানান, কিছু অভিযোগের বিষয়ে বিএনপি নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। রাত ১২টার পর অভিযোগের প্রমাণ না পেয়ে নেতাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। তখন দলের এক নেতা বলেন, তারা নিজেরাই অভিযোগের তদন্ত করবেন। টানা ১২ ঘণ্টার এ ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ দিনশেষে নিজেই কিছু জিজ্ঞাসার উদ্রেক করেছে। 

গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের শূন্য করে যাওয়া স্থানগুলো পূরণে দ্রুতই মাঠে নেমেছিলেন বিএনপির কিছু নেতাকর্মী। চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ নানাভাবে আয়রোজগারে মন দিয়েছিলেন তারা। সেটিকে ‘ক্যাশ’ করেছিল জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত পুরো সময় তারা এ নিয়ে বিএনপির বিপক্ষে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। যদিও তা নির্বাচনের মাঠে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। কেননা, এদেশে এগুলো খুবই স্বাভাবিক বিষয়। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের চাঁদাবাজি করা কিংবা চাঁদাবাজি করে অর্থবিত্ত কামিয়ে প্রভাবশালী হয়ে রাজনৈতিক নেতা বনে যাওয়া এ দেশের রাজনীতিতে উন্নতির প্রচলিত একটি ‘ধাপ’।
চব্বিশের ৫ আগস্টের পর তো কেউ কেউ প্রকাশ্যেই বলছিলেন ১৭ বছর বঞ্চিত ছিলাম,এবার আমরা খাব। খাল বিল নদী নালা টার্মিনাল মার্কেট ফুটপাত, মহল্লার ময়লার বিল, এই কমিটি সেই কমিটি- দ্রুতই ‘খাওয়া’ হচ্ছিল। তবে অভিযোগ ওঠার শুরু থেকেই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এসবের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। দেশজুড়ে একের পর এক নেতাকর্মীকে ‍দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। যদিও অপরাধের সঙ্গে এই ‘শাস্তি’ সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা বা বাস্তবে এর প্রভাব কতটা তা নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে। তবু বিএনপির উদ্যোগ আন্তরিক ছিল বলেই মনে হয়েছে এবং এভাবে গণহারে ব্যবস্থা নেওয়া দেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিককালে বিরল। 

বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সেসব পদক্ষেপ যে লোক দেখানো ছিল না ৩ মে কুমিল্লার ঘটনার শুরুতেও তেমন আলামত ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত মধ্যরাতের অন্ধকারে বিএনপিরই কোনো এক পক্ষ জয়ী হয়। সংবাদমাধ্যমগুলোকে পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই নেতাকে আটক ও ছেড়ে দেওয়া- দুটোই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সবুজ সংকেতে হয়েছে। 

কুমিল্লা নগরীর শাসনগাছা বাস টার্মিনালের পাশেই রেজাউল কাইয়ুমের বাড়ি। তিনি মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা। কথিত আছে, আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে তিনিই এ টার্মিনালের একচ্ছত্র নিয়ন্তা। তাকে আটকের পরের ঘটনাপ্রবাহে মনে হয়েছে টার্মিনালটি তাকে বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী করে তুলেছে। একজন মন্ত্রীর অনুসারী হিসেবেও পরিচিতি রয়েছে। তাকে আটকের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি বিব্রত বলে জানান এক নেতা।

এ টার্মিনাল থেকে দিনে চার লাখ টাকার বেশি চাঁদা ওঠে। ১ মে বিভিন্ন যানবাহনের শ্রমিকরা চাঁদাবাজির প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) আসনের এমপি জসিম উদ্দিন বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং চাঁদাবাজি বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। ওই সময়কার ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়।

রেজাউল কাইয়ুমকে আটকের পরের আইনশৃঙ্খলার অবনতিশীল পরিস্থিতিতেও পুলিশের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। তাদের কোনো বক্তব্য পাচ্ছিলেন না সাংবাদিকরা। তাদের এই এড়িয়ে যাওয়া ইচ্ছে করেই হোক বা চাপের মুখে হোক- কোনোটাই গ্রহণযোগ্য নয়। 

প্রশ্ন হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের একজন নেতাকে আটকের আগে কি অভিযোগ যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য ভুল হলে সেটি কিভাবে তৈরি করানো হলো, তিনি কি রাজনৈতিক বা অন্য কোনো প্রতিপক্ষের প্রতিহিংসার শিকার, গোয়েন্দা ও পুলিশ বাহিনীকে কি আগের মতোই প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহার করা হচ্ছে? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, টার্মিনালে তাহলে চাঁদাবাজি করে কে? বিভিন্ন পরিবহন সংগঠনের নেতারা চাঁদাবাজির কথা স্বীকার করছেন। রেজাউল কাইয়ুমও বলেছেন, তিনি পুলিশকে আশ্বাস দিয়েছেন চাঁদাবাজি বন্ধে সহায়তা করবেন। পুলিশ কি খুঁজে বের করে জনগণকে জানাবে আসল চাঁদাবাজ কে? তা না হলে প্রশ্ন ও রহস্য এবং অভিযোগের তীর একদিকেই তাক করা থাকবে। নিশ্চয়ই সেদিন সারাদেশের ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা দিন আর রাতের পার্থক্য কিভাবে হয় তা খেয়াল করেছেন। তারা এটিকে উদাহরণ হিসেবে নিলে দোষ দেওয়া যাবে না।
 

দুই.
নগরীতে যখন এমন ঘটনা ঘটে চলেছে তখন ৪০ কিলোমিটার দূরের নাঙ্গলকোটে এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় এমপি মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা নিজেরা খাই আসি, মাদকবিরোধী বক্তৃতা দেয়। আমার পাশেদি বসে নব্বই পারসেন্ট এডা-ওইডা খায়, আমি কেমনে মাদকবিরোধী বক্তৃতা দেই? আইসাই উনারা বক্তৃতা দেয় এলাকাকে মাদকমুক্ত করবে। আরে মিয়া, হয় খাইয়া আইছো, নইলে যাইয়া খাইবা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি অকপটে বলে দিচ্ছি, আগে নিজেকে শুধরান, পরে জাতিকে নিয়ে চিন্তা কইরেন।’ 

সর্ষের মধ্যে ভূত পুষে রেখে মাদক কিংবা চাঁদাবাজি যে দূর করা যাবে না এমন সহজ কথাটি বলার জন্য বর্ষীয়ান এ রাজনীতিক হয়ত জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের ওই অনুষ্ঠানকেই যথাযথ মনে করেছিলেন।

আদনান মনোয়ার হুসাইন: সহকারী বার্তা সম্পাদক, সমকাল
[email protected] 

আরও পড়ুন

×