ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দিবস

নীরব মহামারি থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে করণীয়

নীরব মহামারি থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে করণীয়
×

রেজাউল করিম কাজল

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৮:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

থ্যালাসেমিয়া একটি জন্মগত গুরুতর রক্তরোগ। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত  শিশুদের শরীরে রক্তের মূল্যবান উপাদান হিমোগ্লোবিন ঠিকমতো তৈরি হয় না। বাবা-মা এ রোগের বাহক হলে তাদের সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে জন্মাতে পারে। জন্মের পরপরই এ রোগটি ধরা পড়ে না। বয়স এক বা দুই বছর হলে শিশুর রক্তশূন্যতা দেখা দেয় এবং ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে। শিশুর স্বাভাবিক দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে শরীরের দরকারি অঙ্গ যেমন প্লীহা, যকৃৎ বড় হয়ে যায় এবং কার্যক্ষমতা হারাতে থাকে। বাবা-মায়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, যখন জানতে পারেন যে তারা দুজনেই এই রোগের বাহক। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের অন্যের রক্ত নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন থ্যালাসেমিয়া রোগের একমাত্র চিকিৎসা; যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সব সময় সফল নয়। কাজেই থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ জরুরি।

দেশের পরিস্থিতি
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালে পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, দেশে গড়ে ১১.৪ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক অর্থাৎ প্রতি আটজনে একজন বাহক। অর্থাৎ প্রায় দুই কোটি মানুষ থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক। অথচ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে ২০০৬ সালে এই হার ছিল মাত্র ৭ শতাংশ। 
বর্তমানে দেশে এক লাখের মতো শিশু থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। প্রতিদিন গড়ে সাতজন শিশু থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং এর চেয়ে দ্বিগুণ শিশু বাহক হিসেবে জন্মগ্রহণ করে। দেশে সংগৃহীত রক্তের প্রায় ষাট ভাগই থ্যালাসেমিয়া রোগীদের বাঁচিয়ে রাখতে ব্যবহার করা হয়। বারবার রক্ত সঞ্চালনের ফলে তাদের দেহে হেপাটাইটিস বি, সিসহ ভয়াবহ জীবাণু সংক্রমণ ঘটে। থ্যালাসেমিয়া রোগ শিশু মৃত্যুর একটি বড় কারণ; যা সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। এই রোগ প্রতিরোধের কিছু সুনির্দিষ্ট উপায় রয়েছে।

সচেতনতা
দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব থাকলেও এ রোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তেমন সচেতনতা তৈরি করা হয়নি। কাজেই এ রোগ প্রতিরোধে ব্যাপক সচেতনতা জরুরি। সাধারণ মানুষ থেকে স্বাস্থ্যকর্মী সব পর্যায়ে সচেতনতার জন্য সংবাদমাধ্যমে ও জনপরিসরে ব্যপক প্রচারনা চালাতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সচেতনতার জন্য সভা-সেমিনার করে মসজিদের ইমাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ, বিভিন্ন করপোরেট সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া রোগ সম্পর্কে সম্যক ধারণা তৈরি করতে হবে।

বাহক নির্ণয়
স্বামী-স্ত্রী উভয়ে থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হলেই কেবল থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর জন্ম হতে পারে। কাজেই বিয়ের আগে পাত্রপাত্রীর থ্যালাসেমিয়া বাহক নির্ণয় পরীক্ষা এবং বাহকে বাহকে বিয়েকে নিরুৎসাহিত করাই থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের কার্যকরী উপায়। যাদের পরিবারে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু আছে সেসব পরিবারের সদস্যদের বাহক নির্ণয় সবার আগে জরুরি। কারণ, সবচেয়ে বেশি বাহকের বিস্তার এসব পরিবারে। যেসব দম্পতি সন্তান নেওয়ার চিন্তা করছেন তাদেরও বাহক নির্ণয় জরুরি। 

প্রশিক্ষণ ও পরীক্ষা সুলভকরণ 
চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত সকল জনবলকে থ্যালাসেমিয়া বাহক নির্ণয়সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে; যাতে বাহক নির্ণয় পরীক্ষায় কেউ পজেটিভ হলে ভীতি না ছড়িয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া যায়। অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ে থ্যালাসেমিয়া বাহক নির্ণয় সহজলভ্য করতে হবে। 

গর্ভাবস্থায় ভ্রুণের পরীক্ষা
স্বামী এবং স্ত্রী দুজনই যদি থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক হন তবে তাদের সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে, বাহক হিসাবে বা অসুস্থ শিশু হিসেবে জন্ম নিতে পারে। তাই বাহক দম্পতির সন্তান গ্রহণের ক্ষেত্রে মাতৃজঠরে বাচ্চার ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখতে হবে। রোগাক্রান্ত ভ্রুণ অপসারণ করে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত শিশুর জন্ম প্রতিরোধ সম্ভব। এজন্য বিদ্যমান গর্ভপাত আইন পরিবর্তনসহ গর্ভবতী মাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা দিতে হবে। 

আইন প্রণয়ন
অনেক দেশে যেমন, সাইপ্রাস ১৯৭৩ সালে, বাহরাইন ১৯৮৫, ইরান ২০০৪, সৌদি আরব ২০০৪ এবং সর্বশেষ পাকিস্তান ২০১৩ সালে বিয়ের আগে পাত্র-পাত্রীর বা বাচ্চা নেওয়ার আগে স্বামী-স্ত্রীর থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এমন আইন আমাদের দেশেও প্রণয়ন জরুরি। 

থ্যালাসেমিয়া দিবস
মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করার জন্য ৮ মে আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস পালন করা হয়। দেশে থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসার কথা যতটা বলা হয়, প্রতিরোধের কথা তেমন বলা হয় না। দৈনন্দিন জীবনে আমরা ভালো থাকার জন্য কত না পরিকল্পনা করি। আসুন সুস্থ সন্তানের বাবা-মা হওয়ার জন্য, মেধাদীপ্ত দেশ গড়ার জন্য, থ্যালাসেমিয়া রোগ সম্পর্কে সচেতন হই। মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে শিশুর জন্ম প্রতিরোধ করি।

ডা. রেজাউল করিম কাজল: অধ্যাপক, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ, বিএমইউ
    [email protected]
 

আরও পড়ুন

×