কমিটি নিয়ে সংঘাত
ছাত্রদলকে যে ‘শিক্ষা’ নিতে হবে
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৮:১৯ | আপডেট: ০৮ মে ২০২৬ | ১১:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘ছাত্রদলের গান’ কবিতায় ইতিবাচক কাজে ছাত্রদের বন্দনা করেছেন: ‘মোদের চোখে বিশ্ববাসীর/ স্বপ্ন দেখা হোক সফল। আমরা ছাত্রদল।।’ অথচ ক্ষমতাসীন বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাম্প্রতিক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে যে তুলকালাম দেখছি, তা নজরুলের প্রত্যাশার সঙ্গে যায় না; ছাত্র রাজনীতির জন্যও অশনিসংকেত।
চলতি সপ্তাহের সূচনায একযোগে দেশের বিভিন্ন ইউনিটে ৪৫ কমিটি ঘোষণা করে ছাত্রদল। মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম– ছাত্রদলের কমিটিতে বিবাহিত, অছাত্র ও ছাত্রলীগ। শুধু তা-ই নয়। এই কমিটি ঘিরে কোথাও ‘বঞ্চিত’ সংক্ষুব্ধদের বিক্ষোভ এবং কোথাও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ এড়াতে ১৪৪ ধারা জারির মতো পরিস্থিতিরও উদ্ভব হয়েছে। কোথাও সড়ক অবরোধ এমনকি ঝাড়ু মিছিলও করেন বঞ্চিতরা। যারা বিক্ষোভ করছেন তাদের অভিযোগ, কমিটিতে অছাত্র, ব্যবসায়ী এবং নব্যদেরও পদায়ন করা হয়েছে। আরও গুরুতর অভিযোগ– টাকার বিনিময়ে পদ বিক্রি করা হয়েছে।
প্রথম কথা হলো, ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্ব শিক্ষার্থীদের হাতেই থাকবে। যাদের ছাত্রত্ব শেষ, তাদের পদে থাকা কিংবা পদ পাওয়ার চেষ্টা-তদবির শোভা পায় না। যখনই ছাত্রদের বাইরে নেতৃত্ব যাচ্ছে তখনই নানামুখী সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তখন তো আসলে ছাত্র রাজনীতিই থাকে না। এ ক্ষেত্রে ছাত্রদলের গোড়ায়ই গলদ। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটিতে কতজন নিয়মিত ছাত্র আছেন? কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ২০০৬-০৭ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ২০২৪ সালের ২ মার্চ তিনি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান। বর্তমানে তাঁর কোথাও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রত্ব নেই বলে সংবাদমাধ্যমের খবরে দেখেছি। সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছিরের সেশন ২০০৭-০৮। উভয়ের বয়স ৩৫ থেকে ৪০-এর মধ্যে।
বয়সের বিষয় তো আছেই, উপরন্তু ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সেক্রেটারির দুই বছরের মেয়াদ গত ১ মার্চ শেষ হয়ে গেছে। উচিত ছিল আগে নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন এবং পুরো কেন্দ্রীয় কমিটি ১ মার্চের মধ্যেই সম্পন্ন করা। এরপর নতুন কমিটি এসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কমিটি দিতে পারে। এখন একটা মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি কীভাবে অন্য কমিটি নির্বাচন করছে? সংগত কারণেই এ কমিটি যখন বিভিন্ন জায়গায় কমিটি দিচ্ছে, সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
তারপরও কমিটি নির্বাচনে ছাত্রদলের গঠনতন্ত্রে কী আছে, বোঝার চেষ্টা করলাম। গঠনতন্ত্র খুঁজতে গিয়ে দেখলাম তাদের কোনো ওয়েবসাইটই নেই। ১০ লাখ ফলোয়ার-সংবলিত ছাত্রদলের ভেরিফায়েড ফেসবুকে পরিচিতিতে দেওয়া আছে বিএনপির ওয়েবসাইটের ঠিকানা। তবে ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ওয়েবসাইটে গঠনতন্ত্র অপশনে ঢুকলে জানা যায়– ‘ওয়েবসাইটের কাজ চলছে, সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত’। পরে অবশ্য সংবাদমাধ্যমে পেলাম, ‘৪২ বছরেও গঠনতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি ছাত্রদল’।
এমন পরিস্থিতির জন্য ছাত্রদলকেও এককভাবে দায়ী করা যায় না। কারণ তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে বিএনপি। ২০২৪ সালের ১ মার্চ বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেই আমরা দেখেছি রাকিবুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এখনও নতুন কমিটি নিয়ে যেসব প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, তাতে বলা হয়েছে, বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই ঠিক করছেন– ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে কারা আসছেন।
বিএনপি যখন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের চিন্তা করছে, তাদের মনে রাখতে হবে, শিক্ষার্থীরা এখন আদু ভাইদের নেতা হিসেবে দেখতে চায় না। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পরই বিএনপির বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা দরকার ছিল। তাহলে হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এমন দুরবস্থা হতো না। দুঃখজনক হলেও সত্য, নির্বাচনে জেতার পরও বিএনপি বিষয়টি কতটা অনুভব করছে, জানা নেই।
তবে ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিকে ধন্যবাদ দিতে হবে। সম্প্রতি তিনি জাতীয় সংসদে বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর জাতি আর আগের মতো আক্রমণাত্মক ছাত্র রাজনীতি দেখতে চায় না। চট্টগ্রামে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার সংঘর্ষের পর তিনি এ কথা বলেছেন। এ ধরনের রাজনীতি যদি বন্ধ করতে হয়, তবে গোড়ার নেতৃত্বে হাত দিতে হবে। বিএনপির উচিত ছাত্রত্ব যাদের আছে এমন শিক্ষার্থীদেরই নেতৃত্বে আনা। যোগ্যদের মূল্যায়ন করতে হবে। ত্যাগী হলেও যদি ছাত্রত্ব না থাকে, তাদের জন্য তো বিএনপির যুব সংগঠনই আছে।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজনীতির নামে দখলদারিত্ব চায় না। এ অবস্থায় ছাত্রদলের জন্য সুস্থ ধারার ও শিক্ষার্থীবান্ধব রাজনীতির বিকল্প নেই। এমন রাজনীতি, যেখানে ভাগ-বাটোয়ারার বিষয়, টেন্ডারবাজি, দখলদারিত্বের সুযোগ থাকবে না। তবেই কমিটি নিয়ে আর সমস্যা হবে না। সে জন্য কেন্দ্রের কমিটি আগে ঠিক করে সারাদেশে কমিটি দিতে পারে।
শিক্ষা, ঐক্য, প্রগতি ছাত্রদলের মূলনীতি। এখানে শুরুতে থাকা ‘শিক্ষা’তেই দলটিকে ফোকাস করতে হবে। নিয়মিত ছাত্রদের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের স্বার্থে দলটি কাজ করতে পারে। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে সহাবস্থান ঐক্য ও প্রগতির কাজ করা সম্ভব হবে। বিএনপিরও উচিত হবে ভিন্নভাবে ভাবা– তারা ছাত্রদলকে লেজুড় সংগঠন বানাবে, নাকি স্বাধীনতা দেবে, তার ওপর নির্ভর করবে ছাত্রদলের ভবিষ্যৎ।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ
সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
- বিষয় :
- মাহফুজুর রহমান মানিক
