তৃতীয় মেরু
পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তনের তিস্তা-পরীক্ষা
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ০৮:৩০ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ১১:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত ৬ মে ভারতের এনডিটিভিতে সম্প্রচারিত এক প্রতিবেদনে তিস্তাকে যেভাবে ‘সাউথ এশিয়াস মোস্ট সেন্সিটিভ রিভার ডিসপুট’ বা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিরোধপূর্ণ নদী আখ্যা দেওয়া হয়েছে, তাতে অতিরঞ্জন সামান্যই।
পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনামল শেষে চলতি সপ্তাহে ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি। বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এককালীন দক্ষিণহস্ত এবং পরবর্তী সময়ে প্রবল প্রতিপক্ষ শুভেন্দু অধিকারী শনিবার নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথও নিয়েছেন। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই বাংলাদেশি ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ‘হাইপ’ উঠেছে– তিস্তা চুক্তির কী হবে।
মনে রাখতে হবে, একদা অখণ্ড বাংলার দুই অংশ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে ‘ধ্রুপদি’ কিংবা ‘অধুনা’ নানা বিবাদ-বিসম্বাদের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছিলেন তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিতে। প্রায় ছয় দশকের দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরের জন্য ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত’ চুক্তিটি ঝুলে গিয়েছিল মূলত তাঁর বিরোধিতার কারণে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত মূলত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের বিরোধিতার কারণেই তিস্তা চুক্তি কীভাবে ঝুলেই ছিল এ নিয়ে অন্যত্র বিস্তারিত লিখেছি; আগ্রহীরা পড়তে পারেন আমার দীর্ঘ নিবন্ধ ‘তিস্তার অধরা চুক্তি কিংবা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের পঁচাত্তর বছর’ (সমকাল ঈদসংখ্যা, ২০২৪)।
বস্তুত শেখ হাসিনার টানা সোয়া তিন মেয়াদের প্রধানমন্ত্রিত্বকালে ঢাকা ও নয়াদিল্লি দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক নানা ইস্যুতে যদিও অভূতপূর্ব নিকটবর্তী হয়েছিল; তিস্তা চুক্তি ঝুলেই থেকেছে বছরের পর বছর। এমনকি শেষের দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনানুষ্ঠানিক শর্ত দিয়েছিলেন– তাঁর সঙ্গে আলোচনায় তিস্তা চুক্তির কথাই তোলা যাবে না। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১৮ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে ‘বাংলাদেশ ভবন’ উদ্বোধনকালে। সেখানে উপস্থিত শেখ হাসিনা, নরেন্দ্র মোদি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়; কারও বক্তব্যেই তিস্তা প্রসঙ্গ ওঠেনি। ২০২৩ সালে বরং তিস্তা সেচ প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার আরও তিনটি খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছিল।
ততদিনে অবশ্য ‘বিকল্প ব্যবস্থা’ হিসেবে চীনা অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ। এতেই ভারত নড়েচড়ে বসেছিল। ২০২৪ সালের ২১-২২ জুন নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির সর্বশেষ শীর্ষ বৈঠকের যৌথ বিবৃতিতে তিস্তা প্রসঙ্গ ফিরে এসেছিল। ওই বিবৃতির ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল– ‘উন্নয়ন সহযোগিতার অংশ হিসেবে পারস্পরিক সম্মত সময়সীমার মধ্যে ভারতের সহায়তায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আমরা তিস্তা নদীর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনাগত উদ্যোগ গ্রহণ করব।’
সে সময় ‘তিস্তা পরিস্থিতি তাহলে কী দাঁড়াল’ শীর্ষক নিবন্ধে আমি বলেছিলাম– তার মানে, এবারের সফরে তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যুটি কার্যত হিমাগারে চলে গেল। বরং উজানের দেশ থেকে পানিপ্রাপ্যতার অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশ যে নিজস্ব সীমানার মধ্যে চীনের সহায়তায় একটি কারিগরি সমাধানের কথা ভাবছিল, সেটাই ভারত বাস্তবায়ন করে দিতে চাইছে। বলা বাহুল্য, চীনকে সরিয়ে দিয়ে (সমকাল, ২৪ জুন ২০২৪)।
ওই বছর ৮-১০ জুলাই শেখ হাসিনা বেইজিং সফরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে ১৪ জুলাই তৎকালীন গণভবনে ‘ভাগ্যনির্ধারণী’ সংবাদ সম্মেলনে ‘রাজাকারের নাতিপুতি’-সংক্রান্ত বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেই বক্তব্যের পর বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। এক পর্যায়ে গণঅভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার এসে আবার চীনের সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়। ২০২৫ সালের ২৮ এপ্রিল তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরকাল ‘চীনের পুনঃপ্রবেশ’ নিশ্চিত করে যৌথ ঘোষণার ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছিল– ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) চীনা কোম্পানির অংশগ্রহণকে বাংলাদেশ পক্ষ স্বাগত জানায়।’
এরপর অন্তর্বর্তী সরকার প্রকল্পটি চূড়ান্ত করে ২০২৫ সালের আগস্টের মধ্যেই চীন সরকারের কাছে পাঠিয়ে দেয়। তখনকার এক খবরে বলা হয়, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের কাছে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এ বছরের মধ্যেই আর্থিক চুক্তি সই করতে পারে দুই দেশ’ (প্রথম আলো, ১৯ আগস্ট ২০২৫)।
ওদিকে রংপুর অঞ্চলেও ‘নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগেই’ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সভা-সমাবেশ শুরু হয়। স্রোতের বিপরীতে গিয়ে আমি এক নিবন্ধে লিখেছিলাম– ‘ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে আমার ধারণা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ নির্বাচনের আগে শুরু হবে না’ (সমকাল, ২৬ অক্টোবর ২০২৫)।
এবারও, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সীমান্তের দুইপাশের একাধিক সংবাদমাধ্যম থেকে আমার কাছে এ ব্যাপারে মতামত জানতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি যারা জানেন, তাদের পক্ষে আশার বাণী শোনানো কঠিন।

মনে রাখা জরুরি, তিস্তা চুক্তির বিরোধিতাকারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতা থেকে চলে গেলেও পশ্চিমবঙ্গের তিস্তা অববাহিকা বা সেখানকার উত্তরবঙ্গের আর্থসামাজিক শর্তের পরিবর্তন হয়নি। আমাদের পছন্দ হোক বা না হোক, এটা স্পষ্ট– পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশের জনসাধারণ ছিল তিস্তা চুক্তির বিরোধী। মমতার বিরোধিতার অন্যতম প্রধান কারণও ছিল সেটাই। মমতা যে কারণে, উত্তরবঙ্গে জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য তিস্তা চুক্তি নিয়ে বিরোধিতা করতেন, একই কাজ বিজেপি করতে পারে জনপ্রিয়তা ধরে রাখার জন্য।
এটাও মনে রাখতে হবে, মমতা কেবল তিস্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের বিপক্ষে ছিলেন; পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সার্বিকভাবে বাংলাদেশ প্রশ্নেই কঠোর বিরোধী অবস্থান ইতোমধ্যে বহুবার ব্যক্ত করেছেন। মমতা তবুও মুখে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথা বলতেন; শুভেন্দু অধিকারী সেই প্রতিবেশীসুলভ সৌজন্যেরও এতদিন ধার ধারেননি। অবশ্য ইতোমধ্যে তিনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রসঙ্গে বলেছেন– ‘আমি আজ মুখ্যমন্ত্রী। কোনো বিতর্কিত কথা বলব না’ (আনন্দবাজার অনলাইন, ৯ মে ২০২৬)। তাই বলে তিনি তিস্তা চুক্তি বা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক প্রশ্নে ইতিবাচক হবেন– এমন আশা বাস্তবসম্মত?
এ ছাড়া গত দেড় দশকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দোহাই দিলেও সেটা কতখানি বাস্তবোচিত ছিল, দেখার বিষয়। কারণ ভারতীয় সংবিধানের ২৫৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের আপত্তি মানতে বাধ্য নয় কেন্দ্রীয় সরকার। এমনকি এনআরসি বা সিএএ বাস্তবায়নে যদি পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যের বিরোধিতা উপেক্ষা করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার; কেবল তিস্তা ইস্যুতেই দৃশ্যত পারেনি।
এটা সত্য, ভারত সরকার এখন বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন চাইছে। যদি তারা আন্তরিকভাবেই সেটা চায়, তাহলে তিস্তা চুক্তি আগের চেয়ে সহজ হবে। কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকার একই দলের হওয়ায় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সহজ হবে। যেমন কেন্দ্রে ও আসামে বিজেপি সরকার থাকায় স্থল সীমান্ত চুক্তি লোকসভায় পাস সহজ হয়েছিল। প্রশ্ন– বিজেপি তিস্তা চুক্তি আন্তরিকভাবে চেয়েছিল বা চাইছে কিনা।
নিরপেক্ষভাবে দেখলে চীন সরকারের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় নির্মিতব্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হওয়া উচিত নয়। কারণ পদ্মা সেতুর মতো বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোতে ভারত ও চীনের একসঙ্গে কাজ করার নজির রয়েছে। যদিও ভূ-রাজনৈতিক বিরোধ এড়াতে আমরা বারবার বলে এসেছি, মহাপরিকল্পনাটি নিজস্ব অর্থায়ন বা বহুপক্ষীয় অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা হতে পারে। সেখানে চীন ও ভারত ছাড়াও নেদারল্যান্ডস, বিশ্বব্যাংক, এডিবি থাকতে পারে।
এখন প্রয়োজন শুধু তিস্তার প্রশ্নে ভারতের সদিচ্ছা। কেন্দ্রীয় সরকার আন্তরিক হলে রাজ্য সরকার অন্তত আগের মতো বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের দিক থেকেও কূটনৈতিকভাবে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ জরুরি।
এনডিটিভির প্রতিবেদনটিতে যথার্থই বলা হয়েছে– ‘আপাতত তিস্তা চুক্তি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক ঐকমত্য, আঞ্চলিক কূটনীতি ও কৌশলগত আস্থার পরীক্ষা হয়ে রইল। দীর্ঘ দিন ঝুলে থাকা চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত এগোবে কিনা, এখন নির্ভর করবে দিল্লি ও কলকাতা সরকারের অগ্রাধিকার কতটা মিলবে।’
শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- শেখ রোকন
