জনশক্তি
দারিদ্র্য নিরসনে বৈদেশিক কর্মসংস্থান
দেশের দুর্দিনে অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রবাসী আয়
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ১৭:৩২
অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়ে জীবিকার তাগিদে প্রবাস জীবন বেছে নেন নেত্রকোনার রাজীব তালুকদার। বিদেশে যাওয়ার পর একদিন তাঁর মা আবদার করেন, তাঁকে বিয়ে দিয়ে হেলিকপ্টারে করে বউ নিজ বাড়িতে আনবেন। মায়ের ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে ২৫ এপ্রিল হেলিকপ্টারে বউ এনে মায়ের অনেক দিনের স্বপ্ন পূরণ করেছেন মালয়েশিয়া প্রবাসী এ যুবক। শুধু তাই নয়, ছেলের সঙ্গে হেলিকপ্টারে চড়ে নিজেই পুত্রবধূকে বাড়িতে নিয়ে আসেন রাজীবের মা। রাজীবের মায়ের স্বপ্ন আজ বাস্তব হয়েছে। প্রবাসী রাজীবের মতো আজ লাখো যুবক বিদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজের ও পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর মতো বাংলাদেশের প্রান্তিক যেসব পরিবারের সদস্য বিদেশে কাজ করতে গিয়েছেন, তারা তুলনামূলক কম দারিদ্র্যের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। যে কোনো চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে এ পরিবারগুলো ভালোভাবে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে পারছে। অথচ দেশের নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আর্থিক ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
প্রতি বছর ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ নতুন করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে। নতুন চাকরি প্রার্থীদের অর্ধেকেরও কম মানুষের মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। দেশে বর্তমানে ২৬ লাখের বেশি বেকার রয়েছে; যার মধ্যে ৮৩ শতাংশই ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ-তরুণী। এর মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশ স্নাতক বা তারও বেশি শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন তরুণ বেকার। দেশের কর্মক্ষম জনশক্তির ২৫ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান হয় অভিবাসনের মাধ্যমে। বৈদেশিক কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব না হলে বাংলাদেশে দরিদ্র লোকের সংখ্যা আরও ১০ শতাংশ বেড়ে যেত। আমরা যদি সময়োপযোগী বৈশ্বিক চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারতাম তাহলে বিশ্ব শ্রমবাজারে আরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হতো। বিশ্ব চাহিদার আলোকে এ সময়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দক্ষ, অতিদক্ষ ও স্মার্ট জনশক্তি তৈরি করা। তাই অভিবাসনে ইচ্ছুক কর্মীদের সম্ভব হলে দুটি কিংবা অন্ততপক্ষে একটি কারিগরি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে বিদেশে যাওয়া উচিত। কারিগরি দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি ইংরেজি ছাড়া আরও অন্তত একটি ভাষাজ্ঞান অর্জন করা অত্যাবশ্যক। যে দেশে যাবে সেই দেশের ভাষাজ্ঞান, আইন-কানুন, খাদ্যাভ্যাস, আবহাওয়া, কর্মপরিবেশ, বেতন– সবকিছু জেনেবুঝে গেলে অধিক বেতন ও শোভন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
দেশের অর্থনীতি একটা কঠিন সময় পার করছে। করোনার মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে টালমাটাল অবস্থা বিরাজ করছিল বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। এর মধ্যে গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশসহ বিশ্বের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে আওয়ামী শাসনামলের অর্থনীতির লন্ডভন্ড অবস্থা নিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে। বর্তমানে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১৩ বিলিয়ন ডলার। বছরে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের বেশি; যা দেশের আর্থিক খাতে ভয়াবহ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা সাত মাস তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ কমেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র ও তারপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ কমেছে। এতে কয়েক মাস ধরেই রপ্তানি কম হচ্ছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ক্রয়াদেশ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে কারখানায় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়াসহ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে আইএমএফের শেষ কিস্তির ঋণ ছাড় না হওয়ায় অর্থনীতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় প্রবাসী আয় একমাত্র আশার আলো দেখাচ্ছে। দেশের এই দুর্দিনে অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রবাসী আয়। চলতি বছরের মার্চে আমাদের প্রবাসীরা ৩.৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন; যা স্বাধীনতার পর একক কোনো মাসে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত রেমিট্যান্স। এপ্রিলে এসেছে ৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত ২০২৪ সালে আমাদের প্রবাসী আয় এসেছে ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালে এসেছে ৩২.৮২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রেমিট্যান্স প্রবাহের ঊর্ধ্বগতি ধরে রাখা গেলে বছরে আমরা ৪০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাওয়ার আশা করতে পারি।
প্রবাসীদের মধ্যে রয়েছে প্রবল দেশপ্রেম। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিদেশে অবস্থান করে রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করার মাধ্যমে আওয়ামী সরকারের পতন নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন প্রবাসীরা। আওয়ামী সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলসহ জুলাই-আগস্ট ছাত্র আন্দোলনে হত্যার প্রতিবাদে ছাত্রজনতার বিপ্লবের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিলেন রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রী অভিবাসীদের কাছে হাত জোর করে ক্ষমা চাইলেও তারা দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ রাখা অব্যাহত রেখেছিলেন। আওয়ামী সরকারের পতনের পর অভিবাসীরা আবার রেমিট্যান্স পাঠানো শুরু করলে দেশের অর্থনৈতিক শক্তি আরও শক্তিশালী হতে থাকে। ফলে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে আমাদের মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। রপ্তানি আয়ের সঙ্গে তুলনা করলে যোগ-বিয়োগের হিসাবে প্রবাসীদের পাঠানো এ আয়কেই আমরা প্রধান আয় হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। কারণ রেমিট্যান্স আহরণে সরকারের তেমন কোনো বিনিয়োগ নেই।
বিশ্বের ১৭৬টি দেশে প্রায় দেড় কোটিরও বেশি প্রবাসী বিদেশে অবস্থান করছেন। একজন অভিবাসীর উপার্জনের ওপর পরিবারের চার থেকে পাঁচজন সদস্য নির্ভরশীল। সে হিসাবে এক কোটি অভিবাসী দেশের প্রায় ৫-৬ কোটি মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রদান করছেন। প্রত্যন্ত গ্রামেও আধুনিকতার পরশ এনেছেন প্রবাসীরা। নিজের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সঙ্গে এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন করছেন। দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ করছেন। হাজার হাজার অভিবাসী নারী আছেন, যারা সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে কাজ করে নিজের পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করে সুন্দর অর্থনৈতিক ভিত তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন। নিজের আয়ের টাকা দিয়ে নতুন ঘরবাড়ি তৈরি করেছেন। ভবিষ্যতের জন্য ব্যাংকে সঞ্চয় রেখেছেন। ছেলেমেয়েদের ভালো করে লেখাপড়া শিখিয়ে সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন। যাদের অবদানের কথা দেশবাসী সবসময় স্মরণ করে।
আমাদের প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন জরুরি। এ শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা কেবল চাকরিনির্ভর হয়ে গড়ে উঠছে। চাকরি না পেলে সেই পুঁথিগত বিদ্যার কোনো মূল্য নেই। ফলে তরুণরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে বিপথে চলে যাচ্ছে। তাদের জীবনের লক্ষ্য ঠিক করতে হিমশিম খাচ্ছে। অথচ যদি প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি তরুণদের প্রফেশনাল করে গড়ে তুলতে কর্মমুখী শিক্ষার আলাদা প্রসার ঘটানো যেত, তাহলে দেশ-বিদেশে মর্যাদার সঙ্গে তারা অর্থ উপার্জনের সুযোগ পেত। দেশে লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার, অথচ আমাদের বিদেশ থেকে ম্যানেজমেন্ট টিম হায়ার করে আনতে হচ্ছে। আমাদের তরুণরা তাদের অধীনে কাজ করছে। অনেক সময় দেখা যায়, পরিবারের দুটি সন্তান কেউ প্রচলিত শিক্ষা গ্রহণ করে সম্মানজনক পেশা না পেলেও কর্মমুখী শিক্ষা গ্রহণ করে অন্যজন দেশে অথবা বিদেশে গিয়ে ভালো উপার্জন করছে। এতে তার অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি সম্মান ও সামাজিক মর্যাদা বাড়ছে।
বাংলাদেশের দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাসের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশে সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হচ্ছে না। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার হ্রাস পেয়েছে। সেই সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারও কমেছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে আরও ১২ লাখ বাংলাদেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাই অর্থনৈতিক সুরক্ষা অর্জন ও দারিদ্র্য নিরসনে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ: চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি
- বিষয় :
- প্রবাসী
- রেমিট্যান্স
