ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পরিবেশ রক্ষায় নদী ও খাল যেভাবে খনন করতে হবে

পরিবেশ রক্ষায় নদী ও খাল যেভাবে খনন করতে হবে
×

আব্দুল্লাহ আল মামুন, ফয়সাল কবীর শুভ ও মো. মাসুদ পারভেজ রানা

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ১০:১০

নদীমাতৃক বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা অগ্রগণ্য। বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নদ-নদী, খাল ও জলাভূমির পুনর্জাগরণের বিকল্প নেই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের অপরিণামদর্শী কৃতকর্মের ফলে নদী ও জলাধারে পরিপূর্ণ বাংলাদেশের বাস্তুসংস্থান আজ মৃতপ্রায়।

একটি জলাধারের বাস্তুতান্ত্রিক অবনমন শুধু ওই জলাধারের জৈব বা অজৈব উপাদানগুলোর বিলুপ্তি ঘটায় না, বরং ওই অববাহিকায় বসবাসরত মানুষের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। প্রকারান্তরে এটি দেশের অস্তিত্ব; সামগ্রিকভাবে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে।

সম্প্রতি সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদ-নদী ও খাল পুনর্খননের উদ্যোগ এই সংকট মোকাবিলার একটি শক্তিশালী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত। তা ছাড়া এ সংকট সমাধানে রাজনৈতিক অঙ্গীকার গ্রহণ এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন বর্তমান সরকারের যথাযথ উদ্যোগ বলেই প্রতীয়মান। যদিও সম্পূর্ণ কর্মসূচি কীভাবে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে; কেন্দ্রীয় সরকার, স্থানীয় সরকার এবং বসবাসরত জনসাধারণ কীভাবে অংশগ্রহণ করবে; খাল খননের সঙ্গে মৃতপ্রায় নদ-নদী যুক্ত হবে কিনা; কোন খাল বা নদ-নদী অগ্রাধিকার পাবে এবং তা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে– এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও পরিষ্কার নয়। আমাদের বিশ্বাস, বর্তমান সরকার গবেষণাভিত্তিক ফলাফল এবং সঠিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমেই নদী ও খাল খনন কর্মসূচি পরিচালনা করবে। এটি যেন অতীতের মতো একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মধ্যেই সুপ্ত থেকে না যায়। কারণ এটি এখন শুধু একটি রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার পূরণের সার্থকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং সম্পূর্ণ কর্মসূচির সফলতা হবে বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বাঁচিয়ে রাখার শামিল।   

বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী অববাহিকার অংশ। দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ড এবং কৃষিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে ওঠার মূল কারণ নদ-নদী ও অন্যান্য জলাধারের উপস্থিতি ও প্রয়োজনীয় সেচ সুবিধা। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফার আলোকে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত  খাল খনন কর্মসূচি ছিল বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের জন্য একটি যুগান্তকারী  উদ্যোগ। সেই সময় ১২০০ মাইল খাল খননের ফলে ৭ লাখ একর জমি সেচ সুবিধার আওতায় এসেছিল। খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ করেছিল এক নতুন রেকর্ড। প্রমাণিত হয়েছিল– কৃষি উন্নয়নে ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহারের বিকল্প নেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, পরবর্তী সরকারগুলো নদী ও খাল খননের ওই ধারাবাহিকতা ধরে না রাখার ফলে ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ নদ-নদী নাব্য হারিয়েছে এবং হাজারো খাল ও জলাভূমি বিলীন হওয়ার মাধ্যমে সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের কৃষি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বিপজ্জনকভাবে নির্ভরশীল। বরেন্দ্র অঞ্চলসহ উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নেমে গেছে। কারণ কৃষি সেচের জন্য প্রায় ৮০ শতাংশ পানির উৎস ভূগর্ভস্থ জলাধার।

যা হোক, বাংলাদেশে পরিবেশগত অবনমন এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার এমন করুণ অবস্থায় কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভূপৃষ্ঠের পানিনির্ভর সেচ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য নদ-নদী ও খাল খননের বিকল্প নেই। তা ছাড়া গবেষণা থেকে পাওয়া যায়, ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহারে কৃষকের সেচ খরচ ২০-৩০ শতাংশ কম হয়। আবার সেচ সুবিধা ১ শতাংশ বাড়লে কৃষি উৎপাদন ০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি প্রাকৃতিক জলাধার বৃদ্ধির মাধ্যমে মৎস্য সম্পদের উৎপাদন ১৫-২০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। এ ছাড়া নদ-নদী ও খাল খননের মতো বিশাল কর্মযজ্ঞে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে ৮-১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করবে। 

বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক খাল খনন কর্মসূচি তাদের গ্রামীণ অর্থনীতি জোরদারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের পরিকল্পনাকে মনে করিয়ে দেয়। এটি নিশ্চিত, শুধু নগরভিত্তিক উন্নয়ন নয়, বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন মূলত নির্ভর করছে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে একটি পরিবেশবান্ধব সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

আপাতদৃষ্টিতে খাল খনন কর্মসূচিকে সহজ মনে হলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে এটি কতটুকু বৈজ্ঞানিক গবেষণা, অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা আর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে করা হবে তার ওপর। অর্থাৎ শুধু অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতায় নয়; খননের জন্য নির্বাচিত নদ-নদী ও খালগুলো প্রকৃতপক্ষেই অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য কিনা, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অঞ্চলভিত্তিক বা রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব হবে না। 

এমনকি জনগণ যেন বিশ্বাস করতে পারে, কোনোরূপ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই সম্পূর্ণ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। এ জন্য সরকারের উচিত হবে নদ-নদী ও খালগুলো নির্বাচনের জন্য একটি জরিপ পরিচালনা করা এবং সাধারণ কথায়, জরিপের ফলাফল জনগণের সামনে তুলে ধরা। অর্থাৎ সম্পূর্ণ কর্মযজ্ঞ কীভাবে পরিচালিত হবে সে সম্পর্কে জনসচেতনতা এবং তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার। এ জন্য শুধু কেন্দ্রীয় সরকার নয়, স্থানীয় সরকারকেও এ প্রক্রিয়ার অগ্রভাগে নিয়ে আসা দরকার। যেমন জরিপ পরিচালনার জন্য স্থানীয় সরকারকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। আবার খনন-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণে সহায়তার জন্য স্থানীয়ভাবে পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি করা যেতে পারে । নদ-নদী ও খালের অবৈধ দখল প্রতিরোধ করার জন্যও এ কমিটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

আব্দুল্লাহ আল মামুন, ফয়সাল কবীর শুভ, মো. মাসুদ পারভেজ রানা: পরিবেশ ও উন্নয়ন গবেষক
[email protected]

আরও পড়ুন

×