ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উচ্চারণের বিপরীতে

গণতান্ত্রিক সমাজে দলীয় রাজনীতির গণ্ডি

গণতান্ত্রিক সমাজে দলীয় রাজনীতির গণ্ডি
×

মাহবুব আজীজ

মাহবুব আজীজ

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ০৭:১৯ | আপডেট: ১২ মে ২০২৬ | ১০:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে কল্যাণ প্যারেডে রোববার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগত হবে না। পুলিশ প্রশাসন বিধিবদ্ধ আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘ফ্যাসিবাদী সরকার নিজেদের স্বার্থে পুলিশকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। পুলিশ যেন আর ফ্যাসিবাদের হাতিয়ার না হয়’ (সমকাল, ১১ মে, ২৬)। প্রধানমন্ত্রী যথার্থ বলেছেন; বিশেষত জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা তুমুল বিতর্কিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বল শাসনকালে পুলিশ বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তায় জাতি চরম নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। 
ঘনবসতির বাংলাদেশে জনসংখ্যার বিপরীতে পুলিশের সংখ্যা ও সক্ষমতা যেমন অপ্রতুল, তেমনি অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের প্রথম বলি এই বাহিনীর সদস্যরাই হয়ে থাকেন। যদিও যে কোনো নিরাপত্তা ইস্যুতে দেশের মানুষের প্রাথমিক ভরসার নামই পুলিশ; সরকার স্বৈরাচারী বা অগণতান্ত্রিক হলে তার প্রথম বর্মও হয় পুলিশ। সাধারণ সদস্যদের এসব কাজে সামনে ঠেলে দিয়ে বাহিনীর কর্তারা পেছনে নিজের আখের গোছানোর সুড়ঙ্গ তৈরি করেন। জাতি জানতে পারে, পুলিশপ্রধান এক দিনে গুলশানে এক হালি ফ্ল্যাট কিনতে পারেন!

দাতব্য গৃহ থেকেই শুরু হয়– এই আপ্তবাক্য মেনে পুলিশ প্রশাসনে ন্যূনতম দুর্নীতিও যাতে না ঘটতে পারে, সে জন্য নিয়োগ-পদায়ন-বদলি প্রতিটি ধাপে অভ্যন্তরীণ কমিটি তৈরি করা যেতে পারে। নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে আন্তঃবিভাগীয় সদস্য অন্তর্ভুক্তির পাশাপাশি স্বচ্ছতা নিশ্চিতে বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতার মধ্যে রাখা উচিত। আজকের সফল করপোরেট দপ্তরেও কর্মীদের পদায়ন ও বদলির জন্য সুবিশাল মানবসম্পদ বিভাগ কাজ করছে। দেশের পুলিশ সদস্যদের দেখভাল করবার জন্যও উচ্চ প্রযুক্তির, বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদ বিভাগ প্রয়োজন। সশস্ত্র বাহিনী ও বিচার বিভাগের মতো পুলিশ বাহিনীও স্বতন্ত্র পে স্কেল চাইছে। এই দাবি সময়োপযোগী ও যৌক্তিক। একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর স্বায়ত্তশাসিত কাঠামো প্রণয়নও জরুরি। পুলিশ যেন অগণতান্ত্রিক সরকার বা বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের লাঠিয়াল হয়ে না ওঠে– এই প্রত্যয় বাহিনীর কাঠামোর মধ্যেই যুক্ত করে দিতে হবে। কাজটি নির্বাচিত সরকারকে দায়িত্ব নিয়ে সম্পন্ন করতে হবে। এর সুফল দলমত নির্বিশেষে সকলেই পাবেন। কারণ গণতন্ত্র মানেই আজ যিনি সরকারে, কাল তিনি সেখানে না-ও থাকতে পারেন। তবে পুলিশ প্রশাসন সুনির্দিষ্ট আইনে চললে তা দেশের সব মানুষের নিরাপত্তা ও ভরসার জায়গা হয়ে উঠবে।

২.
পুলিশ ছাড়াও সাংবাদিক, আইনজীবী ও চিকিৎসকদের দলবাজি রাষ্ট্র ও সমাজে নানা সমস্যার জন্ম দেয়। বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্সের প্রথম দিনে ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, ‘আমরা সাংবাদিকতা করতে করতেই রাজনীতির মধ্যে ঢুকে যাই। এক শাসনামলে এক দল সাংবাদিক নেতৃত্বে থাকে, অন্যরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে; আবার শাসন বদলালে নেতৃত্বও বদলে যায়’ (সমকাল, ৯ মে, ২৬)। 

সাংবাদিক যদি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হন; পেশাগত সততা বজায় রাখা সম্ভব নয়। সংবাদমাধ্যম মানেই অবলার কণ্ঠস্বর, দুর্বলের শক্তি। বরাবর বিরোধী মত আমাদের সমাজে উপেক্ষিত ও নিগৃহীত। কাজেই সংবাদমাধ্যমে নিপীড়িত ও আক্রান্তদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের কারণে সাংবাদিকদের বিশেষ দলের সমর্থক ‘ট্যাগ’ দেওয়া হয়। সব আমলেই ক্ষমতাবলয়ের আশীর্বাদপুষ্ট সাংবাদিকরা ট্যাগবাজির কাজটি করেই ক্ষান্ত হন না; সম্ভব হলে বিরুদ্ধ মতপ্রকাশ বন্ধেও কাজ করেন। এটি প্রকৃত সংবাদিকতার জন্য প্রতিবন্ধকতা, তেমনি গণতন্ত্রের জন্যও ক্ষতিকর।

কেবল সরকার বা রাজনৈতিক দলের চাপেই কি মুক্ত সাংবাদিকতার দ্বার রুদ্ধ হয়? না। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ক্ষেত্র ভূলুণ্ঠিত হওয়ার পেছনে স্বয়ং সাংবাদিকদের দায়ও কম নয়। ব্যক্তিস্বার্থ বা স্বার্থসিদ্ধির সর্পিল হাতছানির সামনে পেশার বস্তুনিষ্ঠতা পরাজিত হয়। তাই এ দেশে সাংবাদিক ইউনিয়ন রাজনৈতিক দলের নামে বহুধাবিভক্ত। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন সেই পন্থি সাংবাদিকরা নিজেদের সরকারের অংশ মনে করেন। এই মনোভাবই স্বাধীন সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠার অন্তরায়। একই সঙ্গে সরকারকে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার পথও সুগম করে। সংবাদমাধ্যমের সুতীক্ষ্ণ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিনিয়ত নিজেকে নবায়ন করবে; নিজেদের ভুল ঠিক করে নেবে। পরিবর্তে সরকারের তুষ্টিমূলক রচনা সাংবাদিকতার নামে অর্থহীন প্রহসন, সার্বিক বিচারে গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার মূলে কুঠারাঘাত। নাগরিক অধিকার প্রশস্ত করবার জন্য স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের বিকল্প নেই। এর মূল দায়িত্ব পালন করতে হয় সৎ ও বিবেকি সাংবাদিকদের। গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে মতপ্রকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে কাজ করে থাকে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের কর্মকাণ্ড মূলত আত্মরক্ষা ও আইনি লড়াইয়ে সীমিত হয়ে আছে। আইনজীবীরা নিজেদের পেশাগত দায়িত্বের বাইরে গিয়ে দলীয় রাজনৈতিক কর্মীর মতো আচরণ করবার কারণেই তাদের এই পরিণতি। গত সোমবার চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির বার লাইব্রেরিতে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা ‘সাধারণ’ আইনজীবীর ব্যানারে মনোনয়ন ফরম কিনতে গেলে তাদের ‘ফ্যাসিস্ট’ আখ্যা দিয়ে লাঞ্ছিত করে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা বলছেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দল-সমর্থিত আইনজীবীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই (যুগান্তর, ৫ মে, ২৬)। এর আগে সুপ্রিম কোর্টে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের সংবাদ সম্মেলন পণ্ড করে সেখানে স্থান দখল করেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। গত দুই বছরে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীদের এ ধরনের হেনস্তার বিস্তর খবরের সঙ্গে মিলে যায় আওয়ামী লীগ আমলে একইভাবে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের লাগাতার হেনস্তা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের কর্মীসুলভ আচরণ দেখা যায়। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র প্রাণপণে ছুটে চলা শিক্ষকের শার্ট খুলে গলা জড়িয়ে টেনে পেছন পেছন ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছে– ভব্যতার বিচারে এই ঘটনা যতই নিকৃষ্ট হোক না কেন; পেশাজীবী শিক্ষকরা যখন দলীয় কর্মী হিসেবে আবির্ভূত হন; তখন সম্মানের পাশাপাশি পেশার মর্যাদা ও দায়িত্ববোধও লুণ্ঠিত হয় বটে।

৩.
পেশাজীবীদের রাজনৈতিক আনুগত্য যখন সুনির্দিষ্ট পেশাগত নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের সীমানা ছাড়িয়ে যায়, তখন দলীয় কর্মীর সঙ্গে পার্থক্য থাকে না। নিছক কৌতূহল বা আদর্শবাদিতার জন্য অবশ্য পেশাজীবীরা রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আবির্ভূত হন না। এর কারণ, রাজনৈতিক প্রভাব বলয় ব্যবহার করে অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতা অর্জনের পথ প্রশস্ত করা। রাজনীতি যখন লুটেরাতন্ত্রের নিয়ামক হয়, পেশাজীবীরা তখন সেই নিয়ামকের সলতে। 

সুসময়ে পুলিশ থেকে সাংবাদিক, আইনজীবী থেকে চিকিৎসক– সবাই যার যার পেশার বিশেষত্ব ভুলে একেকজন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। যুক্তি ও বিবেক, পেশাগত দায়বোধ সেখানে অনুপস্থিত। নিজেদের রাজনৈতিক দল যখন সরকারে থাকে, তখন এসব পেশাজীবী নিজেদের প্রভাব-বলয় যতটা সম্ভব বাড়িয়ে উপগ্রহের মতো জ্বলতে শুরু করেন। এই আত্মজ্বলন একসময় গ্লানিতে রূপান্তরিত হয়ে সরকারকে যতটা না ক্ষতিগ্রস্ত করে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হয় গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার পরিবেশ। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষাতে কুঠারাঘাত করে এই বর্ণচোরা গোষ্ঠীবাজি, যা আপন পেশার অনিবার্য স্খলন। যার কাজ তার সাজে। রাজনীতি থাকুক রাজনীতিবিদদের হাতে; অন্যেরা যে যার পেশার মূল দায়িত্ব পালন করুন।  বিরাজনীতিকীকরণ চিকিৎসা নয়; তেমনি পেশাজীবীরা নিজ কাজের মূল সত্য অস্বীকার করে দলীয় গণ্ডিতে বিলীন হলে প্রকৃত গণতন্ত্রই মুখ থুবড়ে পড়ে। 
 
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×