সমকালীন প্রসঙ্গ
সড়কে মৃত্যুমিছিল থামবে কবে
মাহমুদুল হাসান
প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬ | ১৯:৫৩
কেবল সংখ্যার ভিত্তিতে কোনো বড়সংখ্যক হত্যাকে ‘গণহত্যা বলা যায় না কিংবা নির্বিচার হত্যা করলেই গণহত্যা হয় না, কোনো হত্যাকে গণহত্যা বলার জন্য উদ্দেশ্যকে গণনায় আনতে হবে। প্রচলিত সংজ্ঞায়নে বাংলাদেশের সড়ক কিংবা জলপথে নিহতের ঘটনা কোনোভাবেই গণহত্যার কাতারে ফেলা যায় না। কিন্তু প্রতিবছর যে হারে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে, তাতে কোনোভাবেই গণহত্যার সংখ্যাগত ধারণাকে ফেলে দেওয়া যায় না। ২০২৫ সালে সড়কে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ হাজার ১১১ জন (বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি)। এসব দুর্ঘটনায় অর্থনৈতিক ক্ষতি বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা হলেও মানবিক ক্ষতির বিষয়টি অপূরণীয়। আকস্মিক বিকলাঙ্গতা থেকে শুরু করে পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন হওয়ার যন্ত্রণা ক্ষতিগ্রস্তদের এবং তা প্রত্যক্ষ করে আতঙ্কিত করে পুরো জাতিকে। এই ঘটনাগুলোর শিকার বেশির ভাগ সময়ে সীমিত আয়ের মানুষজন।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে প্রত্যেক অংশীজনেরই দায় থাকে সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখা। নিরাপদ সড়কের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি, কেননা যানবাহন মালিক কিংবা শ্রমিক উভয় ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব প্রকটরূপে দৃশ্যমান। রাজনৈতিক প্রভাবেই তুলনামূলক কঠোর সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ পাস হলেও তা থেকে বিধি প্রণয়নে সময় নেয় চার বছর। যখন কারণগুলো চিহ্নিত হওয়ার পরও ত্বরিত এবং ফলপ্রসূ ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তখন সরকারি উদাসীনতা এমন হত্যাযজ্ঞের সহায়তাকারী বা সহযোগী হিসেবে কাজ করে। যে কোনো হত্যা প্রতিরোধে রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা না মানা, উদ্দেশ্যমূলক অবজ্ঞা বা ‘ইচ্ছাকৃত অন্ধত্ব’ উপাদানগুলো বাংলাদেশের সড়ক বা নৌ নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত সব সরকারি-বেসরকারি অংশীজনকে দায়বদ্ধ করে। যানবাহনের কাঠামো, চালক প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ দর্শন, ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তার পরিকল্পনা, মেরামতের অভাব, সর্বোপরি ট্রাফিক আইন বা নিয়ম না জানা বা মানা এবং জানানোর চেষ্টা না করার নিষ্ক্রিয়তা সড়ক ও নৌপথের তথাকথিত ‘দুর্ঘটনা’-কে এতটাই অবশ্যম্ভাবী করে তুলেছে, যা এখন ‘কাঠামোগত গণহত্যা’য় পরিণত হয়েছে। এগুলো এখন আর দুর্ঘটনা নয়, তা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে রূপান্তরিত হয়েছে।
প্রতিবছর এই বিপুল হত্যাকাণ্ড পরিহারে রাষ্ট্রের কিংবা রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব প্রকটভাবে দৃশ্যমান। তবে পরবর্তী ধাপের কারণ অনুসন্ধানে বেপরোয়া ও বিপজ্জনক গাড়ি চালানো, চালকের ক্লান্তি, মাদক বা অ্যালকোহলের প্রভাবে গাড়ি চালানো, নিম্নমানের সড়ক অবকাঠামো, অতিরিক্ত বোঝাই যানবাহন, যানবাহনের দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ, সচেতনতা ও শিক্ষার অভাব প্রতিষ্ঠিত। উপরোক্ত কারণগুলো নিয়ে কাজ করার জন্য সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮, সড়ক পরিবহন বিধিমালা ২০২২, মোটর ভেহিক্যালস অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩ এবং পুলিশ অ্যাক্ট ১৮৬১ সহ আরও বেশ কিছু আইন প্রযোজ্য। আইনবলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ এবং হাইওয়ে পুলিশ সড়কে শৃঙ্খলা এবং আইনের প্রতিষ্ঠা করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত।
আইন বা বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও নৌপথ বা সড়কে যে শৃঙ্খলার ব্যাপক অভাব তা সর্বজনস্বীকৃত। সড়কে নিহত কিংবা আহতের সংখ্যা এবং যাপিত জীবনে সড়কের ভয়ংকর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিতে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল এবং আইনের প্রতি অশ্রদ্ধাশীল আচরণ গন্তব্যে জীবিত ফেরাকে করে অনিশ্চিত। সীমিত সক্ষমতার প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তরিকতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যপরিকল্পনা দর্শন প্রশ্নবিদ্ধ। পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সেতুবন্ধে মান বজায় রাখতে প্রয়োজন স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ, শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং ফলাফলভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি। নিরাপদ সড়ক বা সড়ক পরিবহনে সরকারি উদ্যোগে এর সবকটিই অনুপস্থিত। অন্তত গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত নয়।
এসবের বাইরে আরও কয়েকটি উদ্বেগজনক বিষয় রয়েছে, যা এই হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধ করা দুরূহ করে তুলেছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জবাবদিহির অভাব। এই বিপুল পরিমাণ জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পরও দায়িত্ববান কাউকে দায় স্বীকার করতে দেখা যায় না, শাস্তির বিধান তো দূরের কথা। সর্বোচ্চ যানবাহনের চালক বা সহকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ‘দুর্ঘটনা’ শুধু চালক বা সহকারীর দোষে যে ঘটে না, এর পেছনে অনেক কারণ থাকে– তা সবসময়ই ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষিত। ঠিক সে কারণেই ‘দুর্ঘটনা’ না বলে ‘কাঠামোগত গণহত্যা’ বলাই শ্রেয়। দ্বিতীয়ত, জ্ঞানভিত্তিক সড়ক ব্যবস্থাপনার অভাব। জাতিগত জ্ঞানবিমুখতা সড়ক নিরাপত্তায় ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। যে কোনো ‘দুর্ঘটনা’ পরবর্তী তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ এবং বিশেষজ্ঞ মতামতের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরিকল্পনার কোনো সাদৃশ্য থাকে না। সক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিবর্গের অবকাঠামোগত ‘উন্নয়নের’ দিকে ভয়ংকর মাত্রায় ঝোঁক আসল সমস্যা সমাধানে ইচ্ছা এবং পরিকল্পনার প্রতি সংগত সংশয়ের উদ্রেক করে। তৃতীয়ত, সড়কের মাঠ পর্যায়ের আইন রক্ষাকারী মানবসম্পদের আইনের প্রতি উদাসীনতা এবং সক্ষমতার অভাব।
উদাহরণস্বরূপ, সড়কের বেপরোয়া চলাচলের জন্য মোটরসাইকেল ছাড়া আর কোনো বাহনের (বাস, ট্রাক, কার) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। অথচ সড়ক পরিবহন বিধিমালা ২০২২ অনুযায়ী অধিকাংশ বাহন আইন ভঙ্গকারী। প্রতিটি বাস, ট্রাকে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে উজ্জ্বল এলইডি লাইট সংযোজন করা হয়েছে, যা সাময়িক অন্ধত্ব তৈরি করে। তুলনামূলক কম গতির যানবাহন বামের পরিবর্তে ডানের লেনে চলাচল, ইন্ডিকেটর ছাড়াই লেন পরিবর্তন, যত্রতত্র ইউটার্ন নেওয়া, বিকট হর্ন ব্যবহার, নির্দিষ্ট স্থান ব্যতিরেকে যাত্রী ওঠানামা করানো, ট্রাকে যাত্রী পরিবহন করা, অপরিকল্পিত রাস্তা নির্মাণসহ হাজারো অনিয়মে ভর্তি সড়ক– যা কিনা মরণফাঁদ তৈরি করেছে। কিন্তু এসবের কারণে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা মামলা দেওয়ার অনুশীলন বা তথ্যও পাওয়া যায় না। দেখা যায়, মামলার বেশির ভাগ কারণ কাগজপত্র বা হেলমেট না থাকা কিংবা মেট্রোপলিটন এলাকায় সীমিত আকারে বাসের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতে এর বাইরে যে ব্যাপক ফলপ্রসূ পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন, তা কাউকে বলতেও শোনা যায় না।
এই ‘কাঠামোগত গণহত্যা’ প্রতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি আইন এবং বিধির প্রয়োগে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্ষমতার উন্নয়নের বিকল্প নেই। আরও প্রয়োজন সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, জ্ঞানী, অভিজ্ঞ দায়িত্বশীল ব্যক্তি নির্বাচন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সড়ক নিয়ন্ত্রণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহি এবং সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা। হাজারো মানুষের ব্যাপক প্রাণহানি কিংবা অঙ্গহানির ক্ষতি পরিবার কিংবা রাষ্ট্রের পক্ষে মেটানো অসম্ভব। যত দ্রুত সম্ভব সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
মাহমুদুল হাসান: উন্নয়ন ও মানবাধিকারকর্মী
- বিষয় :
- সড়ক দুর্ঘটনা
- সড়কে মৃত্যু
