ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

বাকচাতুর্যসর্বস্ব রাজনীতি

বাকচাতুর্যসর্বস্ব রাজনীতি
×

ইফতেখারুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৭:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশের রাজনীতিবিদদের একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য– বড় বড় কথার প্রতিশ্রুতি! খুব অদ্ভুত ঠেকলেও এটা বাস্তব যে জনগণও এসব কথায় আন্দোলিত হয়। তারা এখনও কাজ, নীতি বা পলিসির চেয়ে বয়ানকে বেশি গুরুত্ব দেয়। অথচ একজন রাজনীতিবিদকে মূল্যায়নের মাপকাঠি হওয়া উচিত, তিনি অতীতে কী কাজ করেছেন, বর্তমানেই বা কী করছেন, তা বিবেচনা করা। মোদ্দা কথা, এ অঞ্চলে বয়ানের নিজস্ব একটা রাজনীতি আছে– বড় বড় কথা বলে জনগণকে ধোঁয়াশায় ফেলা। এটাই যেন এখানকার বড় বড় রাজনীতিকের বৈশিষ্ট্য। এ কারণে রাজনীতি এখানে অনেকাংশেই বাকচাতুর্যসর্বস্ব। 

এ কারণে এখানে রাজনীতিবিদরা বক্তৃতাদানের কৌশলকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। সম্প্রতি যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ করছেন। তিনি যখন চাটগাঁইয়া ভাষায় বক্তৃতা দেন, তখন তা এতই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে যে, সারকথা তেমন না থাকলেও শব্দগুলো শুনে মনে হয়, একেকটা রত্ন ঝরে পড়ছে।

যেমন– সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন সংস্থার জরিপ বলছে, নির্বাচনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি হয়নি। ক্ষেত্রবিশেষে বরং অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। অথচ রোববার ঢাকায় পুলিশ সপ্তাহ অনুষ্ঠানে তিনি বললেন, বিগত দুই মাসে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদের ভেতরেও বিশেষ করে সংবিধান ও সংস্কার নিয়ে বেশ কৌশল করে কথা বলেন। জনগণও তা উপভোগ করছে। তিনি সংবিধানকে এমনভাবে তুলে ধরেন, মনে হবে সংবিধানের কোনো ধারার লঙ্ঘন তাদের দ্বারা হচ্ছে না। 
আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যেও নিজেকে খোলামেলা তুলে ধরার একটা চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে থাকার কারণে সেই সমাজের কিছু প্রভাব সম্ভবত তাঁর ওপর পড়েছে। কিন্তু তাঁর বক্তৃতাও যে মাত্রায় প্রতিশ্রুতিনির্ভর, সে মাত্রায় প্রয়োগনির্ভর নয়। বিশেষত রাষ্ট্র ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়গুলোতে তিনি খুব কমই বলছেন। 
দেশের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে বৈজ্ঞানিক তথা পদ্ধতি অনুযায়ী সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়াই আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলোতে প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো সমস্যা বাস্তবসম্মত উপায়ে সমাধানের চেষ্টা না করা। সোমবার পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি বা দল কিন্তু আপনাদের দল নয়। বরং আপনারা আইনের রক্ষক– আপনারা দায়িত্ব পালন করবেন রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণে। জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক হবে আইনগত ও মানবিক।’ কিন্তু আমাদের পুলিশ কি সেই জায়গায় আছে? এ জন্য বাহিনীটির যে সংস্কার দরকার ছিল, তাও কিন্তু হয়নি।

দুদিন আগে দ্য কাঠমান্ডু পোস্টে নেপালের সংস্কার নীতি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে– ‘নীতি বা পলিসি অবশ্যই বাস্তবতা থেকে শুরু হতে হবে; তত্ত্ব থেকে নয়। স্কুল, হাসপাতাল এবং জনগণকেই সিদ্ধান্ত নিতে দিন– কোনটি তাদের জন্য সর্বোত্তম। যেহেতু মানুষ সর্বদা নিজের স্বার্থেই কাজ করবে, তাই আমাদের উচিত তাদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত লড়াই করার চেষ্টা পরিহার করা।’ 
এনসিপিদলীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ সামাজিক মাধ্যমে পুলিশ সংক্রান্ত একটি স্ট্যাটাসে বলেছেন, “পুলিশ যেন কাজ চালাতে গিয়ে কাউকে ‘ম্যানেজ’ করতে বাধ্য না হয় এবং কারও কাছে হাত পাততে না হয়।…মামলার কাজে আদালতে যাতায়াত, সাক্ষ্য প্রদান কিংবা তদন্ত সংক্রান্ত বিভিন্ন খরচের জন্য অনেক ক্ষেত্রে কোনো সরকারি বরাদ্দ থাকে না। ফলে এসব ব্যয় তাদের ব্যক্তিগতভাবে বহন করতে হয়।” এই পর্যবেক্ষণ সরাসরি নীতির সঙ্গে যুক্ত। সেখানে সরকারের বক্তব্য কী? আসলে নীতিকেন্দ্রিক রাজনীতি গড়ে তোলার বিকল্প নেই। 

ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল  

আরও পড়ুন

×