ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

যোগাযোগ

ঢাকায় আরেকটি কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন যে কারণে জরুরি

ঢাকায় আরেকটি কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন যে কারণে জরুরি
×

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ | ১০:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ঢাকা শহরে যখন রেল আসে তখন ঢাকা নিতান্তই এক বিভাগীয় শহর। তবুও ৫০ একর জমি হুকুমদখল করে তখনকার ঢাকা শহরের বাইরে ফুলবাড়িয়ায় ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের পত্তন হয় ১৮৮২ সালে। ১৮৮৫ সালে নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা রেলপথ চালু হওয়ার পর তা পর্যায়ক্রমে সম্প্রসারিত হয় ময়মনসিংহ অবধি। ধীরে ধীরে তার ব্যাপ্তি বাড়ে আরও। আর ঢাকা শহরের বিস্তৃতি বাড়ায় রেলস্টেশন হয়ে পড়ে শহরের মাঝখানের এক বিড়ম্বনা। 

১৯৪৭-এ ঢাকা পেল প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা। আগের বিভাগীয় শহরের তুলনায় গুরুত্ব বাড়ল অনেক। ঢাকাকেন্দ্রিক যাতায়াত গেল বেড়ে। প্রয়োজন দেখা দিল নতুন ঢাকা রেলস্টেশনের। টিঅ্যান্ডটি অধিদপ্তরের অধিগ্রহণকৃত জমি থেকে তখনকার শহরের পূর্ব প্রান্ত কমলাপুরে ৩২ একর জায়গা নিয়ে ১৯৬৮ সালের ১ মে যাত্রা শুরু হলো নতুন ঢাকা রেলস্টেশনের।

কমলাপুর রেলস্টেশন চালুর তিন বছরের মধ্যে স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। ঢাকা হয়ে যায় একটা স্বাধীন দেশের রাজধানী; সারাদেশের হৃৎপিণ্ড। রেলওয়ে তার ধমনি, শিরা-উপশিরা। স্বাধীনতা আমাদের সাহস জুগিয়েছে যমুনা বহুমুখী সেতু করতে। স্বাধীনতার সাহস আমাদের পদ্মা সেতু গড়তে উজ্জীবিত করেছে। ফলে খুলনা-যশোর এসেছে ঢাকার সঙ্গে রেলপথে মাত্র তিন ঘণ্টার দূরত্বে। বরিশালে রেল গেলে সে শহরকেও ঢাকায় নিয়ে আসবে ৪ ঘণ্টার কম সময়ে। ভবিষ্যতে ভাবনা চলছে পদ্মা, যমুনায় রেলসহ আরও সেতু করার। ভাবনা আছে নারায়ণগঞ্জ-লাকসাম কর্ডলাইন স্থাপন ও রেলওয়েকে বৈদ্যুতিক ট্রেনে রূপান্তরিত করার। ঢাকা রেলস্টেশন কি এই বিপুল চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট? 

ঢাকাকেন্দ্রিক রেলওয়ে নেটওয়ার্ক চাঙ্গা রাখতে হলে নতুন একটা বড় আকারের রেলস্টেশন তৈরি করা অপরিহার্য। বিদ্যমান রেলওয়ে স্টেশন আগামী বছর কুড়ি পরের যে প্রয়োজনীয়তা, তা কোনোক্রমেই মেটাতে পারবে না। সত্তর দশকেও কমলাপুর রেলস্টেশনের পূর্বদিকে যে বিস্তীর্ণ জলাভূমি ছিল, তা থাকলে হয়তো কমলাপুর রেলস্টেশনকে সম্প্রসারিত করা যেতে পারত আগামী একশ বছরের উপযোগী করে। এখন তা আর সম্ভব নয়। কমলাপুরকে ঢাকার একক স্টেশন হিসেবে বহাল রাখতে হলে ভূগর্ভে বা ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করতে হলেও বর্তমান স্টেশনের কার্যক্রম কয়েক বৎসর বন্ধ না রেখে করা সম্ভব নয়। তাই সে চিন্তাও আকাশকুসুম। 

নতুন ঢাকা রেলস্টেশন করতে হলে কি বর্তমান ঢাকা স্টেশনকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে ফুলবাড়িয়ার মতো? কখনও না। কমলাপুরকে বহাল রাখতে হবে। কমলাপুরকে বহাল রেখেই নতুন স্টেশনের কথা ভাবতে হবে। ঢাকা মহানগরী এখন সম্প্রসারিত হচ্ছে মোহাম্মদপুরের পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা নদীর পশ্চিমপারে কেরানীগঞ্জের বছিলা, আটিবাজার অভিমুখে। নতুন একটা রেলওয়ে স্টেশন করতে হলে এখনই সময় বছিলা থেকে আটিবাজারের মধ্যে স্থান বাছাই করা। এখনও খুব সহজে পর্যাপ্ত জমি অধিগ্রহণ করা সম্ভব বা চাইলে এখনও বুড়িগঙ্গা নদীর পশ্চিমপারে রেলস্টেশন করা সম্ভব। উল্লেখ্য, আটিবাজার হয়ে ইস্ট-ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেস হওয়ার পরিকল্পনাও বাস্তবায়নাধীন, যা বুড়িগঙ্গার পশ্চিম তীরকে সড়ক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাবে পরিণত করবে।

ব্রিটিশ আমলে আমাদের দেশের নারায়ণগঞ্জ, খুলনা ও চাঁদপুর রেলস্টেশন স্থাপিত হয়েছিল একেবারে নদীর পারে। পশ্চিমবাংলার হাওড়া স্টেশনও নদীর পারে। লক্ষ্য ছিল নদীকেন্দ্রিক যাত্রী ও পণ্য সহজে রেলে পরিবহন। বুড়িগঙ্গা এখনও ঢাকার নদীকেন্দ্রিক যাত্রী পরিবহনের প্রধান সহায়। বুড়িগঙ্গার ওপরে পানগাঁও বন্দরে আছে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল। বুড়িগঙ্গার পশ্চিম তীরে নতুন রেলস্টেশন হলে পানগাঁও কনটেইনার টার্মিনালটি নতুন রেলস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে কনটেইনার পরিবহনে আরও নতুন দিগন্তের উন্মোচন করতে পারবে। চট্টগ্রাম থেকে নৌপথে আসা কনটেইনার রেলপথে পৌঁছে যেতে পারবে দেশের উত্তর এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের দূরবর্তী স্থানে। তাতে সারাদেশে ব্যবসায়ের প্রসার ঘটবে।

আটিবাজার, বছিলা বা বুড়িগঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরের রেলস্টেশন সাধারণভাবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল যথা– ফরিদপুর, বরিশাল ও খুলনা বিভাগের জন্য প্রধান স্টেশন হতে পারবে। মানিকগঞ্জকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কে আনার যে সম্ভাবনা, তাও নতুন স্টেশনকেন্দ্রিক হতে পারবে। মানিকগঞ্জ ছাড়িয়ে রেলপথ সম্প্রসারিত হলে তাও হবে নতুন স্টেশনের আওতাভুক্ত। এমনকি নারায়ণগঞ্জ-লাকসাম কর্ডলাইনের সঙ্গে নতুন স্টেশনকে জুড়ে দিলে নতুন স্টেশনও হতে পারবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালীর সঙ্গে সংযোগ স্টেশন। এমনকি উড়াল পথে জয়দেবপুরের সঙ্গে সংযুক্ত করলেই সারাবাংলার রেলওয়ে নেটওয়ার্কে জুড়ে যাবে নতুন রেলস্টেশনটি।

নতুন স্টেশন হলে তা যে শুধু নির্দিষ্ট গন্তব্যের জন্য সুগম হবে, তা নয়। দুই স্টেশনের কোনোটি ননস্টপ ট্রেন, সেমি ননস্টপ ও আন্তঃদেশীয় ট্রেনের ঘাঁটিও হতে পারবে। তবে হ্যাঁ, লোকাল ট্রেন দুই স্টেশন হতেই চলবে। ভবিষ্যতের, অন্ততপক্ষে দুইশ বছরের ভবিষ্যৎকে বিবেচনায় রেখে নতুন স্টেশনে ভূগর্ভস্থ অবকাঠামোসহ ঊর্ধ্বে আপাতত একতলা করে অধিকতর ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের সুযোগ রাখতে হবে।
কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে পদ্মা সেতু অ্যাপ্রোচ রেলপথের নিমতলী বা কেরানীগঞ্জ স্টেশন হয়ে নতুন স্টেশনের সঙ্গে সংযাগ রেল হতে পারবে। কমলাপুর রেলস্টেশনকে যোগাযোগের হাব করা হচ্ছে। চারটি মেট্রোরেলের রুট এসে মিলবে কমলাপুরে। নতুন রেলস্টেশন হলে কমলাপুরের সঙ্গে নতুন স্টেশনের সরাসরি মেট্রোরেল যোগাযোগও স্থাপন করা যাবে, যাতে দুই প্রান্তের দুই রেলওয়ে স্টেশন ছাড়া আর কোনো মেট্রোস্টেশন থাকবে না। ফলে ঢাকার প্রধান দুই রেলস্টেশনের মধ্যে যাত্রী চলাচল খুবই সহজসাধ্য হবে। অনেকটা আন্তর্জাতিক বড় বিমানবন্দরগুলোর টার্মিনাল বদলের মতো।

গণপরিবহনগুলোর মধ্যে রেলওয়ে এখনও সবচেয়ে সস্তা। বর্তমান সরকারও রেলকে প্রাধান্য দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। সারাদেশের প্রধান রেলপথগুলো ব্রডগেজ ডাবল লাইনে উন্নীত করলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় যে আমূল পরিবর্তন আসবে তা আরও ত্বরান্বিত হবে বুড়িগঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে একটি নতুন বড় আকারের কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনসহ রেলওয়ে নেটওয়ার্ক স্থাপনের মাধ্যমে।

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কলাম লেখক; অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
 

আরও পড়ুন

×