অন্যদৃষ্টি
বিপন্ন করাত মাছের সুরক্ষা
বিভূতি ভূষণ মিত্র
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ০৮:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঠাকুরমার ঝুলির একটি গল্পে করাত মাছের কথা আছে। সেখানে গল্পটি এমন, গ্রামের মানুষ করাত মাছের কারণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। নানাভাবে এই মাছ গ্রামের মানুষদের কষ্ট দিচ্ছিল। তখন নানা বুদ্ধি করে একটি বালক করাত মাছ থেকে গ্রামকে উদ্ধার করে। দুষ্ট মাছগুলোকে বালক ধরে ফেলে। এ গল্পে করাত মাছ নেতিবাচকভাবে ব্যবহৃত। শুধু এখানে নয়, করাত মাছ নিয়ে নানা রকম গল্প প্রচলিত। এসব গল্পের অধিকাংশই অতিরঞ্জিত, ভ্রান্ত ও নেতিবাচক।
ইউরোপীয় একটি রূপকথাতেও করাত মাছের কথা আছে। যেখানে বলা আছে, করাত মাছ জাহাজের তলা ছিদ্র করে দেয়। এটা একেবারেই অসম্ভব। আফ্রিকায় অনেক গোষ্ঠীর মধ্যে করাত মাছ খাওয়া গ্রহণযোগ্য হলেও কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে এটি নিষিদ্ধ। থাইল্যান্ডের বৌদ্ধমন্দিরে করাত মাছের চিত্র অঙ্কন দেখা যায়। করাত মাছ নিয়ে আমাদের সমাজেও নানা রকম ধারণা আছে। যেমন একটি ধারণা হচ্ছে, করাত মাছ খেলে ক্যান্সার সেরে যায়। অর্থাৎ এই মাছের একটা ঔষধি গুণ আছে। এটা শুধু আমাদের দেশে নয়; সারাবিশ্বেই এদের দাঁত ও রোস্ট্রাম ঔষধি কাজে ব্যবহৃত হয়। এমন ধারণার কারণে এই মাছ বেশি ধরা হচ্ছে।
করাত মাছ দেখতে অনেকটা লম্বা, সরু ও চ্যাপ্টা। এদের নাকের বাড়তি অংশ করাতের মতো সাজানো। এ মাছ ৭ থেকে ৭.৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এরা সামুদ্রিক হলেও মিষ্টি জলের নদী ও হ্রদে পাওয়া যায়। করাত মাছের করাত দিয়েই তারা খাবার শনাক্ত ও শিকার ধরে। করাত মাছের যে অংশগুলোকে আমরা দাঁত বলছি, তা আদতে দাঁত নয়। এগুলোকে ডার্মাল ডেন্টাকল বলা হয়ে থাকে। এ ধরনের দাঁত এদের সারাজীবন ধরেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই দাঁত হারিয়ে গেলে প্রতিস্থাপিত হয় না। এরা নিরীহ। কিন্তু আত্মরক্ষার্থে করাত দিয়ে আঘাত করে। করাত মাছ ৩০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।
করাত মাছের পাঁচটি প্রজাতি রয়েছে। আইইউসিএনের মতে, এই পাঁচ প্রজাতিই এখন মহাবিপন্ন। বাংলাদেশে করাত মাছের তিনটি প্রজাতি রয়েছে। সুন্দরবনের নদী থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত এদের বিচরণস্থল।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০২৬ অনুযায়ী এই মাছ ধরা, বিক্রি, খাওয়া আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য অপরাধ। এ জন্য তিন বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। এর পরও করাত মাছ ধরা পড়ছে। সম্প্রতি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সরাসরি হস্তক্ষেপে অভিযান চালিয়ে বিপন্ন প্রজাতির করাত মাছ উদ্ধার করা হয়।
মঠবাড়িয়া উপজেলার দক্ষিণ বন্দর বাজারে সামাজিক বন বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে এই অভিযানে ১৫০ কেজি মাংসও উদ্ধার করা হয়। পরে উদ্ধারকৃত মাছ ও ২-৩ কেজি হাড়সহ মাংসের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়।
অভিযানে কাউকে আটক করা না গেলেও মাছ ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের বন্যপ্রাণী শিকার, হত্যা, ক্রয়-বিক্রয়ে শাস্তির বিষয়ে সতর্ক করা হয়। মহাবিপন্ন এই প্রজাতি রক্ষার্থে মন্ত্রীর এ উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। এমন ধরনের উদ্যোগ বাঁচিয়ে দিতে পারে অসংখ্য মহাবিপন্ন ও বিপন্ন প্রজাতিকে। তবে মন্ত্রীর নির্দেশে বসে থেকে কাজ করলে এসব প্রজাতিকে বাঁচানো যাবে না। স্থানীয়ভাবে এসবের সংরক্ষণ ও তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলতে হবে। সম্পৃক্ত করতে হবে জেলে ও আড়তদারদেরও।
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র: পরিবেশ বিষয়ক লেখক
[email protected]
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
