প্রাথমিকে নিয়োগ
সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানি নয়
মাহফুজুর রহমান মানিক
মাহফুজুর রহমান মানিক
প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ | ১১:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকতেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত ফল চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করে গেছে। সেখানে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়োগের পূর্ব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। গত বছরের নভেম্বরে শিক্ষকের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পর জানুয়ারিতে লিখিত পরীক্ষা নিয়ে একই মাসে ফল প্রকাশ করা হয়। ২৮ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মৌখিক পরীক্ষা হয়। একদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয় যেমন ছিল, তেমনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট ঘোচানোরও চেষ্টা ছিল।
১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া আর আগায়নি। উপরন্তু প্রাথমিকের এ শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে নানা কথাবার্তাও বাতাসে ভাসতে থাকে। যদিও লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই প্রার্থীরা চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য মনোনীত হয়েছেন। অবশেষে স্বস্তি যে, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সুপারিশকৃত শিক্ষকদের পুলিশ ভেরিফিকেশনের কাজ শুরু করেছে। সুপারিশকৃতদের দ্রুতই নিয়োগ দেওয়া দরকার।
প্রশ্ন হলো, শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে মাঝখানে অযথা অচলাবস্থা কেন তৈরি হলো? এটা ঠিক, প্রার্থীদের অকৃতকার্য অংশের অনেকেই পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে আন্দোলন করেছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার তাতে কান না দিয়ে চূড়ান্ত সুপারিশের প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। যেহেতু প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হয়ে এবং সব প্রক্রিয়া মেনেই সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়েছিল, সেহেতু বিএনপির উচিত ছিল দ্রুততম সময়ে নিয়োগ সম্পন্ন করা। কিছুটা দেরি হলেও নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করেছে প্রশাসন।
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন ও শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ শুরু থেকেই ১৪ হাজার শিক্ষকের নিয়োগের ব্যাপারে ইতিবাচক কথাবার্তাই বলেছেন। সুপারিশকৃত শিক্ষকরা এ লক্ষ্যে তাদের কাগজপত্র জমা দিচ্ছেন। এ তদন্ত কাউকে বাদ দেওয়ার জন্য নয়, বরং নিয়োগ দেওয়ার স্বার্থে ইতিবাচকভাবেই করা হোক।
দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা সাড়ে ৬৫ হাজার। এসব বিদ্যালয়ে ২৪ হাজার সহকারী শিক্ষকের পদ খালি। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি ৩৪ হাজার। বলা চলে প্রায় অর্ধেক সংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয়েই প্রধান শিক্ষক নেই। দীর্ঘদিন ধরে এসব পদে শিক্ষক নিয়োগ না দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটছে। শিক্ষক সংকট কাটাতে সে জন্য প্রাথমিকভাবে গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং সে অনুযায়ী সুপারিশ করে যেতে সক্ষম হয়। এখন ১৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন হলে শিক্ষার্থীদের জন্য শিখনশূন্যতা পূরণে অনেকটাই সহায়ক হবে। পাশাপাশি প্রধান শিক্ষক সংকটের দ্রুত সমাধান করার আশ্বাস দিয়েছে বর্তমান সরকার।
দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রাথমিকের ১৪ হাজার শিক্ষকের নিয়োগ নিয়ে মাঝে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার পর সুপারিশকৃত শিক্ষকদের আন্দোলনে নামতে হয়। গত মাসের শেষ সপ্তাহে তাদের দুদিনের লাগাতার আন্দোলনের পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের আশ্বাস দেন। তারপরই ১০ মে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর একটি নির্দেশনা জারি করে। সেখানে বলা হয়েছে, সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫-এ প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত ১৪ হাজার ৩৮৪ প্রার্থীর পুলিশি তদন্তের মাধ্যমে তাদের পূর্ব কার্যকলাপ যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের জমা দেওয়া ডকুমেন্টস ও কাগজপত্রের সত্যতাও যাচাই করা হবে। প্রার্থীরা আগে যেসব কাগজপত্র জমা দিয়েছেন, সেগুলোর সত্যতা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে যাচাই করতেই পারে। কিন্তু পুলিশি তদন্তের মাধ্যমে তাদের পূর্ব কার্যকলাপ যাচাই করার ব্যাখ্যা কী?
আগে যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়োগের আগে পুলিশ ভেরিফিকেশন বা পুলিশি যাচাইয়ের প্রয়োজন হতো না। নিয়োগের পর করা হতো। এখন নিয়োগের আগে এই পুলিশি যাচাইয়ের প্রয়োজন পড়ল কেন? তারপর যদি যাচাই করতেই হয়, পুলিশ কি যাচাই করবে? পূর্ব কার্যকলাপ যাচাই করার বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
‘বিসিএসের স্বপ্ন বনাম ভেরিফিকেশনের দুঃস্বপ্ন’ (সমকাল, ৬ জানুয়ারি ২০২৫) শিরোনামে এর আগে আমি লিখেছি, পুলিশের কেবল দেখা উচিত তাঁর অপরাধ আছে কিনা। না থাকলে তাঁকে ক্লিয়ারেন্স দিয়ে দেওয়া উচিত। সেখানে এও বলেছি, চাকরির ভিত্তি হবে মেধা। যেহেতু প্রার্থীরা লিখিত ও ভাইভা শেষ করে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন, এখানে তাঁকে আটকানোর সুযোগ নেই। তিনি যদি বাংলাদেশের নাগরিক হন তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
শিক্ষামন্ত্রীও তাঁর বক্তব্যে এটা নিশ্চিত করেছেন– সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষকের কাউকে বাদ দেওয়া হবে না। সুতরাং সেভাবেই আন্তরিকতার সঙ্গে পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করতে হবে। কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন– তাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রাসঙ্গিকভাবে শিক্ষামন্ত্রী আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করেছেন। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষকদের যোগদানের পর প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) পাঠানো হতে পারে। অর্থাৎ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগেই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে চাইছে সরকার। এটা জরুরি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য প্রি-সার্ভিস ট্রেনিংয়ের বিষয় অনেকদিন ধরেই আলোচিত। এবার তার বাস্তবায়ন হলে প্রাথমিকের শ্রেণিকক্ষে আমরা গুণগত পরিবর্তন দেখব বলে আশাবাদী।
আমরা দেখেছি, প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের জন্য ১০ লাখ ৮০ হাজারের বেশি আবেদন পড়েছিল। সেখান থেকে চূড়ান্তভাবে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এখানে কতটা প্রতিযোগিতা হয়েছে, বলাই বাহুল্য। সুতরাং তাদের নিয়োগ দিতে আর দেরি নয়।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল, [email protected]
- বিষয় :
- মাহফুজুর রহমান মানিক
