অন্যদৃষ্টি
নামসর্বস্ব কোর্স দিয়ে কী করব!
রাজীব সূত্রধর
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভর্তি কার্যক্রম শুরুর নোটিশ ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে এবং একই সঙ্গে ২০২৪-২৫ সালে অনার্স প্রথম বর্ষের ফরম ফিলআপ করার বিজ্ঞপ্তিও দেখা যাচ্ছে। গত বছর অনার্সে ভর্তি হওয়ার জন্য আবেদন করা পাঁচ লাখ ৫০ হাজারের মধ্যে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে চার লাখ ৩৬ হাজার ২৮৫ জন।
শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে এবং দক্ষ জনশক্তি গড়তে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৪-২৫ সেশনে আইসিটি এবং ইংরেজি বাধ্যতামূলক কোর্স হিসেবে চালু করে। যেহেতু আইসিটি ও ইংরেজি কোর্স বাধ্যতামূলক, তার মানে সেসব কোর্সে বেশি গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হবে। আইসিটির ল্যাব থাকবে, নির্দিষ্ট শিক্ষক থাকবেন আর ইংরেজি শিখতে হলে সেটিরও বাস্তব উপযোগী পদক্ষেপ থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নামমাত্র কোর্স চালু করে দক্ষতা অর্জন করা যায় না, দক্ষ জনশক্তি গড়া যায় না। বরং বাধ্যতামূলক কোর্স বলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে আগে যেখানে বিষয়ভিত্তিক কোর্স নিয়ে প্রথম বর্ষে আলোচনা থাকত, শিক্ষার্থীরা ন্যূনতম অর্থে হলেও পড়ত, বর্তমানে ইংরেজি ও আইসিটি পরীক্ষায় পাস করার উদ্দেশ্যে অনেকেই প্রাইভেট পড়ছে। কাজের কোনো কাজ হয় নাই। কেননা, উচ্চ মাধ্যমিকেও আইসিটি কোর্স আছে কিন্তু তা প্র্যাক্টিক্যালি করার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় দেখা যায় শিক্ষার্থীরা কোর্স করছে, পরীক্ষায় পাস করছে, তবুও সে বিষয়ে তার দক্ষতা নেই।
একই প্রক্রিয়ায় অনার্সেও আইসিটি কোর্স রাখলে কি দক্ষ হওয়া যাবে? শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে? হবে না। তার চেয়ে বড় কথা, আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে; যা শিক্ষা বাণিজ্যের নগ্ন প্রকাশ। ২০২৪-২৫ সেশনে চার লাখ ৩৬ হাজার ২৮৫ শিক্ষার্থীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া আইসিটি আর ইংরেজি কোর্সের ফি হিসাব করলেই বিষয়টা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। নতুন করে বাধ্যতামূলক কোর্স দুটি থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কতটুকু পেল, তার চেয়ে আর্থিক বিষয়ে প্রশাসনের বেশি ভাবনা বলে মনে করি। সামগ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজন না রেখে যেখানে সেখানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স কোর্স চালু করা মূলত তাদের ব্যবসাকে ত্বরান্বিত করাই।
অবিলম্বে আয়োজনবিহীন আইসিটি ও ইংরেজি কোর্স বন্ধ করে বরং পরিপূর্ণ আয়োজনের মাধ্যম কোর্সগুলো চালু করে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা হোক।
এই নামসর্বস্ব কোর্স চালু করার প্রবণতা দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘ মেয়াদে একটি নেতিবাচক পরিণতি ডেকে আনছে। অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব চাহিদা, দক্ষতা উন্নয়ন কিংবা কর্মবাজারের উপযোগিতা বিবেচনা না করেই শুধু আকর্ষণীয় নাম ব্যবহার করে নতুন কোর্স চালু করা হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা কোর্সে ভর্তি হলেও পড়াশোনা শেষে প্রত্যাশিত চাকরি বা পেশাগত সুযোগ পাচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা কমে যাচ্ছে। অনেক কলেজে পর্যাপ্ত শিক্ষক, আধুনিক ল্যাব, গবেষণার সুযোগ কিংবা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছাড়াই এসব কোর্স পরিচালিত হচ্ছে, যা শিক্ষার মান আরও দুর্বল করে তুলছে। শুধু সনদ অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত এই ধরনের কোর্স শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে। এর ফলে জাতীয় পর্যায়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশ পিছিয়ে পড়ছে। পাশাপাশি অভিভাবকদের অর্থ ও সময় অপচয় হচ্ছে। কারণ বহু শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পাচ্ছে না। নামসর্বস্ব কোর্সের বিস্তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যবসায়িক মানসিকতা বাড়িয়ে তুলছে, যেখানে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে আর্থিক লাভে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। তাই সময়োপযোগী কারিকুলাম, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কোর্স চালুর মাধ্যমে উচ্চশিক্ষাকে কার্যকর ও অর্থবহ করে তোলা জরুরি।
রাজীব সূত্রধর: রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, মৌলভীবাজার
সরকারি কলেজ
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
