ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রতিবেশী

সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দেয়ালের ঘনত্ব বনাম আস্থার গভীরতা

সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দেয়ালের ঘনত্ব বনাম আস্থার গভীরতা
×

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ | ১০:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতার সম্প্রসারণের সাম্প্রতিক ভারতীয় সিদ্ধান্ত আবারও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এটি বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্ত রাজনীতির গভীর কাঠামোগত প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। 

জাতিসংঘ সনদের ২(১) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রের সার্বভৌম সমতা নিশ্চিত করে, আর ২(৭) অনুচ্ছেদ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করে। এই কাঠামো অনুযায়ী প্রতিটি রাষ্ট্র তার সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন কখনোই কেবল অনুমতির তালিকা নয়; এটি একই সঙ্গে দায়িত্ব ও সীমাবদ্ধতার কাঠামো। ১৯৬৯ সালের চুক্তিবিষয়ক আইনসংক্রান্ত ভিয়েনা সনদের ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি চুক্তি সৎ বিশ্বাসে (গুড ফেইথ) মেনে চলতে হবে। 

ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত সম্পর্ক গড়ে উঠেছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি এবং ২০১৫ সালের বাস্তবায়ন প্রটোকল সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই চুক্তির মূল দর্শন ছিল সীমান্তকে সংঘাতের এলাকা থেকে সহযোগিতার এলাকায় রূপান্তর করা; যাতে স্থানীয় জনসাধারণের জীবন, চলাচল এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক ব্যাহত না হয়। এই চুক্তির আওতায় দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়। 

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় একটি অঘোষিত কিন্তু কার্যকর রীতি বিদ্যমান, যেখানে সীমান্তের নিকটবর্তী এলাকায় বড় ধরনের স্থায়ী নির্মাণের আগে দুই দেশের সমন্বয়কে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি কোনো একক আইনি ধারা নয়, বরং স্টেট প্র্যাকটিস বা রাষ্ট্রীয় চর্চার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রচলিত আন্তর্জাতিক রীতিনীতি, যা সীমান্ত স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা বলে, সীমান্ত অবকাঠামো প্রায়ই প্রতীকী অর্থ বহন করে। এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা অবস্থানকে দৃশ্যমান করে তোলে। আবার একই সঙ্গে পারস্পরিক সন্দেহ ও দূরত্বের ধারণাও তৈরি করতে পারে। 

এই প্রশ্নটি বোঝার জন্য তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। ভারতের অন্যান্য সীমান্তে রাষ্ট্রীয় আচরণ একরকম নয়। যেমন পাকিস্তান সীমান্তে, বিশেষ করে পাঞ্জাব ও জম্মু অঞ্চলে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে বহুস্তরীয় কাঁটাতার, সেন্সর সিস্টেম এবং সামরিক নজরদারির একটি কঠোর কাঠামো গড়ে তুলেছে। সেখানে সীমান্ত মূলত নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সংঘাতের ইতিহাস দ্বারা নির্ধারিত হওয়ায় নীতি তুলনামূলকভাবে প্রতিরোধমূলক ও সামরিকীকৃত।

অন্যদিকে, নেপালের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৫০ সালের ভারত-নেপাল শান্তি ও মৈত্রী চুক্তির ভিত্তিতে উন্মুক্ত সীমান্ত ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যেখানে জনগণের মুক্ত চলাচল একটি স্বীকৃত বাস্তবতা। সেখানে সীমান্তের মূল ভিত্তি নিরাপত্তা নয়, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা।  

মিয়ানমার সীমান্তে আবার ধীরে ধীরে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক কঠোরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিদ্রোহ, মাদক ও অস্ত্র পাচার এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে ভারত সেখানে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করছে এবং কিছু অংশে কাঁটাতার সম্প্রসারণও করছে।  

চীনের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। সেখানে কোনো স্থায়ী সীমান্তরেখা নেই; বরং ভারত-চীন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল) ভিত্তিক সামরিক অবস্থান বিদ্যমান। সেখানে কাঁটাতারের পরিবর্তে সামরিক অবকাঠামো, সড়ক, রাডার ও দ্রুত মোতায়েন সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রধান কৌশল। স্পষ্টত, ভারতের সীমান্তনীতি একক নয়; এটি প্রতিটি সীমান্তের রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী ভিন্নভাবে গঠিত।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সীমান্তকে কেবল পাকিস্তান বা চীন সীমান্তের নিরাপত্তা লেন্সে দেখা একটি অসম্পূর্ণ বিশ্লেষণ। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ঐতিহাসিক ভিত্তি কেবল রাষ্ট্রীয় সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভাষা, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, নদী ব্যবস্থা, বাণিজ্য এবং মানুষের আন্তঃসম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই সম্পর্কের গভীরতা সীমান্তকে শুধু নিরাপত্তা রেখা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেয় না। 
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ট্রানজিট, বন্দর ব্যবহার, বিদ্যুৎ সহযোগিতা, সড়ক ও রেলসংযোগ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এই বাস্তবতায় সীমান্তে অতিরিক্ত অনাস্থা বা কঠোরতা দীর্ঘ মেয়াদে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সংযোগভিত্তিক কূটনীতির সঙ্গে একটি টানাপোড়েন তৈরি করতে পারে। 
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক বাস্তবতা হলো– অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা যত গভীর হয়, নিরাপত্তানির্ভর বিচ্ছিন্নতার খরচও তত বাড়ে। ফলে সীমান্তকে কেবল নিরাপত্তার চোখে দেখলে তা কৌশলগত সম্পর্কের বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে। 

এখানেই মূল প্রশ্নটি দাঁড়ায়–সীমান্তে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি দীর্ঘ মেয়াদে ট্রানজিট, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগের কৌশলগত লক্ষ্যকে ব্যাহত করে? কিংবা বলা যায়, আস্থার ঘাটতি কি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে?  

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে পাকিস্তান বা চীনের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে এক করে দেখার সীমাবদ্ধতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান সীমান্ত ঐতিহাসিকভাবে সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনার দ্বারা নির্ধারিত। চীন সীমান্ত এখনও অনির্ধারিত ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র। কিন্তু বাংলাদেশ সীমান্ত দীর্ঘমেয়াদি জনসম্পর্ক, সাংস্কৃতিক নৈকট্য এবং অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতার ভিন্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। এই পার্থক্য অস্বীকার করলে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

সীমান্ত নিরাপত্তা অবশ্যই বৈধ রাষ্ট্রীয় অধিকার, কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের কৌশল যদি সম্পর্কের প্রকৃত চরিত্রকে উপেক্ষা করে, তবে তা দীর্ঘ মেয়াদে কূটনৈতিক আস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।  আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ভৌত দেয়াল কখনোই দীর্ঘ মেয়াদে আস্থার বিকল্প হতে পারে না। 

রাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, কিন্তু স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে ওঠে কেবল তখনই, যখন নিরাপত্তা ও সহযোগিতা একে অপরের প্রতিপক্ষ না হয়ে পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ভবিষ্যৎও শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে এই ভারসাম্যের ওপর, দেয়ালের ঘনত্বে নয়, বরং আস্থার গভীরতায়।  

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকার কর্মী 

আরও পড়ুন

×