ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

উচ্চশিক্ষা

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র‍্যাঙ্কিং মরীচিকা থেকে মুক্তি পাবে কবে

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র‍্যাঙ্কিং মরীচিকা থেকে মুক্তি পাবে কবে
×

শেখ নাহিদ নিয়াজী

শেখ নাহিদ নিয়াজী

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:৪২ | আপডেট: ১৭ মে ২০২৬ | ১১:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবছর কোয়াকুয়ারেলি সাইমন্ডস (কিউএস) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিং এবং টাইমস হায়ার এডুকেশন (টিএইচই) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‍্যাঙ্কিং নিজ নিজ স্কোরকার্ড প্রকাশ করে। এর সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আনন্দ ও হতাশার চক্রে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। তারই ধারাবাহিকতায় কিউএস র‍্যাঙ্কিং ২০২৬ এবং টিএইচই র‍্যাঙ্কিং ২০২৬-এর বার্ষিক প্রতিবেদন বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে এক ধরনের ‘ম্যাট্রিক্স উন্মাদনা’র জন্ম দিয়েছে। এ বছর কিউএস র‍্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বে ৫৮৪তম স্থান পেয়েছে এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ৯৫১ থেকে ১০০০-এর মধ্যে ঢুকেছে। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো কি সত্যিই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে? 

কিউএস এবং টিএইচই ব্যবহৃত প্রাথমিক সূচকগুলো (প্যারামিটার), যেমন আন্তর্জাতিক শিক্ষক অনুপাত, গবেষণার মান, গবেষণার পরিবেশ, শিক্ষকপ্রতি সাইটেশন এবং নিয়োগকর্তার সুনাম-সমীক্ষা, সহজাতভাবেই পশ্চিমা ও ব্যাপক অর্থায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য ‘আন্তর্জাতিকীকরণ’ ম্যাট্রিক্স একটি পরিহাস। 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুরুতর ‘আমলাতান্ত্রিক বাধার’ সম্মুখীন হয়, যা বিদেশি শিক্ষক নিয়োগকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে। ‘আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক’ নামক পরিমাপকটি বিশেষভাবে সেসব বিশ্ববিদ্যালয়কে অসুবিধায় ফেলে; যারা অভ্যন্তরীণ সংকট, যেমন লবণাক্ত-সহনশীল কৃষি, শহুরে দারিদ্র্য, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যাগুলোর ওপর মনোযোগ দেয়। এসব বিষয় হয়তো বৈশ্বিক জার্নালে আলোচিত হয় না, কিন্তু আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব বা টিকে থাকার জন্য অপরিহার্য।

একজন বাংলাদেশি অভিভাবকের কাছে ‘বিশ্বের সেরা ৬০০’ তকমাটি হলো গুণমানের একটি প্রতীক। বাস্তবে এটি এ বিভ্রান্তিকর সংকেত। এই র‍্যাঙ্কিং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য যে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগের অতিরিক্ত ভিড়ে ঠাসা ‘গণকক্ষ’ এবং বিস্ময়কর ১:৫০/৬০ (কিছু ক্ষেত্রে ১:৮০/১০০) শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতকে উপেক্ষা করে। একটি বিশ্ববিদ্যালয় তার তথ্য উপস্থাপন প্রক্রিয়াকে র‍্যাঙ্কিংয়ের অনুকূল করে উপস্থাপন করতে পারে। অথচ প্রকৃত শিক্ষণ পরিবেশের গুণমান ক্রমাগত নিম্নগামী হতে থাকে। আমরা বেকার স্নাতকদের সংখ্যায় ব্যাপক ‘বৃদ্ধি’ প্রত্যক্ষ করছি (২০২৩ সালে যা ছিল ৯ লাখেরও বেশি)। কারণ তারা যে ‘র‍্যাঙ্কযুক্ত’  শিক্ষালাভ করে, তা স্থানীয় চাকরির বাজার থেকে অনেকাংশেই বিচ্ছিন্ন। শিক্ষার্থীদের কাছে একটি ‘বৈশ্বিক’ স্বপ্ন বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ স্থানীয় অর্থনীতিকে চালনা করার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক ‘কর্মসংস্থান দক্ষতা’ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। 

সবচেয়ে বড় অসামঞ্জস্য হলো, ক্যাম্পাস পরিচালনা, স্বায়ত্তশাসন এবং একাডেমিক স্বাধীনতার বিষয়ে এই র‍্যাঙ্কিংগুলোর নীরবতা। কোনো বৈশ্বিক অ্যালগরিদমই ভিন্নমত দমন বা উপাচার্য নিয়োগের রাজনীতিকীকরণের বিষয়টি বিবেচনা করে না। 
এখন আমরা উদ্ধৃতির খেলা বা ফাঁদের সম্মুখীন হচ্ছি। ‘শিক্ষকপ্রতি সাইটেশন’ মাপকাঠি পূরণ করতে গিয়ে শিক্ষকদের ‘প্রকাশ কর অথবা ধ্বংস হও’ সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রায়ই ইনডেক্সড জার্নালে এমন গবেষণা প্রকাশিত হয়, যার বাংলাদেশের স্থানীয় চাহিদা বা উন্নয়নে ‘শূন্য’ প্রভাব থাকতে পারে। এসব বাণিজ্যিক র‍্যাঙ্কিং বিপণনের হাতিয়ার; কোনো উন্নয়নশীল দেশের উচ্চশিক্ষার স্বাস্থ্য নির্ণয়ের যন্ত্র নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাংলাদেশের করদাতাদের কাছে দায়বদ্ধ করতে হলে সরকারকে অবিলম্বে একটি স্বাধীন ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’ গঠন করতে হবে। এই কমিশন বৈশ্বিক বাহ্যিক ম্যাট্রিক্সের পরিবর্তে আমাদের আর্থসামাজিক চাহিদার প্রতিফলনকারী মাপকাঠি ব্যবহার করবে। এ জাতীয় র‍্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত:

১) আমাদের অবশ্যই শিক্ষার্থী-জীবনের মান পরিমাপ করতে হবে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে ছাত্রাবাসের আসন সংখ্যার সঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কঠোরভাবে নিরীক্ষিত অনুপাত এবং ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহিংসতা নির্মূল করা। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে ব্যর্থ একটা বিশ্ববিদ্যালয় ‘শীর্ষস্থানীয়’ তকমা পেতে পারে না।

২) অবশ্যই এমন গবেষণাকে পুরস্কৃত করতে হবে, যা ব-দ্বীপ ব্যবস্থাপনা, পাটের বহুমুখীকরণ, জলবায়ু সংকট মোকাবিলা, বেকারত্ব দূরীকরণ, খাদ্য সংকট বা নগর-দুর্যোগ সহনশীলতার মতো স্থানীয় সংকট মোকাবিলা করে। আমাদের স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কহীন কোনো বিষয়ে পশ্চিমা জার্নালে প্রকাশিত একশ/হাজারটি সাইটেশনের চেয়ে একটি স্থানীয় জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্র (উপকূলীয় ফসল রক্ষায় কার্যকর সমাধান দিতে পারে এমন) বাংলাদেশের জন্য অনেক বেশি মূল্যবান।

৩) স্নাতকদের ‘কর্মসংস্থান যোগ্যতা এবং দক্ষতা’র সমন্বয় করা খুবই জরুরি। স্নাতক হওয়ার ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে চাকরিপ্রাপ্তির হার এবং বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। এটি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তৈরি পোশাক, ওষুধ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে তাদের পাঠ্যক্রমকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে বাধ্য করবে।  

৪) একাডেমিক নিয়োগের স্বায়ত্তশাসন নিরীক্ষণের জন্য একটি পরিমাপক চালু করতে হবে। পক্ষপাতমূলক নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শাস্তি এবং স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের জন্য পুরস্কৃত করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় একাডেমিক ইউনিয়নের (রাজনৈতিক দলীয় আনুগত্যহীন প্ল্যাটফর্ম) ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা ছাড়া শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা, প্রতিযোগিতামূলক বেতন এবং অন্যান্য অনুমোদিত সুযোগ-সুবিধা বিশ্ববিদ্যালয়কে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় ইমপ্যাক্ট ম্যাট্রিক্স গ্রহণ করার মাধ্যমে আমরা এমন একটি বৈশ্বিক মানের পেছনে ছোটা বন্ধ করতে পারি, যা আমাদের জন্য তৈরি হয়নি এবং এমন একটি টেকসই ‘বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা’ গড়ে তুলতে শুরু করতে পারি, যা প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের মানুষের জন্য কাজ করবে।

শেখ নাহিদ নিয়াজী: স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক 
 [email protected]  
 

আরও পড়ুন

×