ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

বোর্ডের খাতা মূল্যায়ন সংকট

বোর্ডের খাতা মূল্যায়ন সংকট
×

আজিজুল হক সরকার

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ০৭:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডগুলো শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র মূল্যায়নের ব্যাপারে যে ভূমিকা রাখে, তাতে আদৌ কি শিক্ষার্থীদের সুফল মেলে? পরীক্ষা শুরুর প্রাথমিক স্তরগুলো যতটা কড়া এবং নিয়মশৃঙ্খলায় পরিপূর্ণ, পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরের ধাপগুলো ততটাই ঢিলেঢালা।  

শিক্ষা বোর্ডের খাতা পরীক্ষণ তথা উত্তরপত্র মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কারণ, এর ওপরেই নির্ভর করে একজন শিক্ষার্থীর চূড়ান্ত ফল, ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন এবং কখনও কখনও পেশাগত পথ। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, পরীক্ষা শুরুর আগে ও চলাকালে যতটা কঠোর নিয়মকানুন অনুসরণ করা হয়; খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সেই কঠোরতা অনেক সময় শিথিল হয়ে পড়ে।

পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, নিরাপত্তা, ভিজিলেন্স টিমের তৎপরতা;  সবই থাকে কঠোর নজরদারির মধ্যে। অথচ খাতা পরীক্ষণের সময় অনেক পরীক্ষককে স্বল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক খাতা মূল্যায়ন করতে হয়। ফলে প্রতিটি খাতা গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখা সব সময় সম্ভব হয় না। এতে মেধাবী শিক্ষার্থী কখনও প্রাপ্য নম্বর থেকে বঞ্চিত হয়, আবার কেউ কেউ অতিরিক্ত নম্বর পেয়ে যায়, যা মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে।

এ ছাড়া মূল্যায়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট গাইডলাইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ সব সময় নিশ্চিত করা যায় না। বিভিন্ন পরীক্ষকের মধ্যে মানের তারতম্য, সময়ের চাপ এবং কখনও অবহেলা– এসব কারণে পরীক্ষার ফলে অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। খাতা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ থাকলেও তা সীমিত এবং অনেক শিক্ষার্থীর নাগালের বাইরেই থেকে যায়।
শিক্ষা বোর্ডগুলো যেভাবে প্রধান পরীক্ষকদের জন্য উত্তরপত্র মূল্যায়ন বিষয়ে প্রায়োগিক (প্রাকটিক্যাল) নির্দেশনা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে; একই ধরনের কাঠামোগত নির্দেশনা সাধারণ পরীক্ষকদের ক্ষেত্রেও থাকা জরুরি। কারণ, মূলত পরীক্ষকরাই উত্তরপত্র মূল্যায়ন সম্পন্ন করেন। বাস্তবে প্রধান পরীক্ষক বা নিরীক্ষকের পক্ষে চার-পাঁচ হাজার খাতা যথাযথ ও গভীরভাবে পুনঃপরীক্ষা করা অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে মূল্যায়নের মান একেক ক্ষেত্রে একেক রকম হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
উত্তরপত্র মূল্যায়নের সম্মানী দীর্ঘদিন বিলম্বিত হওয়া, পর্যাপ্ত জবাবদিহির অভাব এবং মূল্যায়ন কার্যক্রমে কার্যকর তদারকির দুর্বলতার কারণে অনেক পরীক্ষক খাতা দেখায় অনীহা প্রকাশ করেন। এর প্রভাব সরাসরি শিক্ষার্থীদের ফলের ওপর পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।

৪০০ থেকে ৫০০ উত্তরপত্র মূল্যায়নে সাধারণত ২০-২২ দিন সময় নির্ধারিত থাকে। উত্তরপত্র সঠিক মূল্যায়নের জন্য এটুকু সময় একেবারেই অপর্যাপ্ত। নির্ধারিত এই সময়সীমার মধ্যেই যথাযথভাবে খাতা মূল্যায়ন, সূক্ষ্মভাবে বৃত্ত ভরাট, নির্ভুল গণনা করে নিজ নিজ প্রধান পরীক্ষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আবার পোস্ট অফিসের মাধ্যমে খাতা প্রেরণ করাও ঝুঁকি ও ঝামেলাপূর্ণ হওয়ায় অনেকে তা এড়িয়ে চলেন। ফলে সশরীরে উপস্থিত হয়ে উত্তরপত্র হস্তান্তর করাকেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও নিরাপদ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করেন।
এদিকে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাপ্য নম্বর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাড়াহুড়া করে খাতা দেখার কারণে ফলে অসংগতি ও বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ফল প্রকাশের পর খাতা পুনর্মূল্যায়নের আবেদনে হিড়িক পড়ে যায়।

কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের ধারণা, পুনর্মূল্যায়নের সময় উত্তরপত্র নতুন করে মূল্যায়ন করা হয়। বাস্তবে তা নয়। সাধারণত শুধু নম্বরের যোগফল সঠিক হয়েছে কিনা; ওএমআর শিট বা বৃত্ত ভরাটে কোনো ভুল আছে কিনা–  এসব যাচাই করেই পুনর্নিরীক্ষণের কার্যক্রম শেষ করা হয়। এতে প্রকৃত মূল্যায়নজনিত ভুল থেকে গেলে তা সংশোধনের সুযোগ থাকে না।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই প্রক্রিয়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এটি শিক্ষাবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থার চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

nআজিজুল হক সরকার: সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ফুলবাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজ, দিনাজপুর
[email protected]

আরও পড়ুন

×