রোহিঙ্গা
মানবিক দায় থেকে নিরাপত্তা সংকটে দেশ
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ১৬:৪৩
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে প্রায়ই প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটছে। সাম্প্রতিক সময়ে এসব গোলাগুলি ও সশস্ত্র হামলায় বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা ও সাধারণ শরণার্থী নিহত ও আহত হয়েছেন। এ মাসের প্রথমেই ঘটেছে তিনটি সহিংসতার ঘটনা। এই প্রেক্ষিতে আবারও মনে এলো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশে প্রবেশের সময়কালের কথা।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ভয়াবহ সামরিক অভিযানের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘ, পশ্চিমা বিশ্ব এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসহ সারাবিশ্ব তখন বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে ছিল এবং বাংলাদেশকে মানবিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানায়। বাংলাদেশ সেই আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে।
প্রায় এক দশক পরে এসে প্রশ্ন করা যায়, যারা বাংলাদেশকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে বলেছিল, তারা আজ কোথায়? রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক উদ্যোগ কোথায়? কেন আজও বাংলাদেশের মানুষ নিশ্চিত হতে পারছে না, এই বিশাল জনগোষ্ঠী আদৌ শিগগিরই মিয়ানমারে ফিরতে পারবে কিনা?
বাস্তবতা হলো, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক সংকট নয়; এটি ধীরে ধীরে বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জটিল চ্যালেঞ্জে রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পরিস্থিতির গভীরতাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে। মে মাসে পরপর কয়েক দিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক সশস্ত্র হামলায় দুই আশ্রিত রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার, প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সংঘর্ষ এবং সশস্ত্র তৎপরতা এখন উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। প্রায় নিয়মিতভাবে গুলি, অপহরণ, হত্যা এবং ভয়ভীতির ঘটনা ঘটছে বলে সংবাদমাধ্যমে জানা যাচ্ছে। এসব ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার অবনতিই নির্দেশ করে না; বরং এটি দেখায় যে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা ও নিয়ন্ত্রণহীন পরিস্থিতি কীভাবে একটি মানবিক সংকটকে নিরাপত্তা সংকটে রূপান্তর করতে পারে। বাংলাদেশের জনগণের মধ্যেও এ নিয়ে স্বাভাবিক উদ্বেগ সৃষ্টি হচ্ছে যে ক্যাম্পগুলোর ভেতরে যদি সশস্ত্র নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে ভবিষ্যতে এর অভিঘাত সীমান্তবর্তী অঞ্চল ছাড়িয়ে বৃহত্তর জাতীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপরও পড়তে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, ২০২৫ সালে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত তীব্র হওয়ার সময় বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যকার সংঘর্ষ নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। সে সময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে উঠে আসে যে বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা কিছু রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা গোপনে সীমান্ত অতিক্রম করে মিয়ানমারের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে– কখনও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পক্ষে, কখনও অন্য পক্ষের হয়ে। সংখ্যার দিক থেকে এটি হয়তো সীমিত, কিন্তু বিষয়টির তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিন ধরে হতাশা, রাষ্ট্রহীনতা ও ভবিষ্যৎহীনতার মধ্যে থাকা জনগোষ্ঠী সহজেই আঞ্চলিক সংঘাত ও সশস্ত্র রাজনীতির প্রভাববলয়ে চলে যেতে পারে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের জন্যও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
আরও বড় উদ্বেগ হলো, যদি আঞ্চলিক কিংবা বৈশ্বিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর সুযোগ পায়, তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য গভীর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে। কারণ তখন রোহিঙ্গা সংকট আর শুধু মানবিক বা কূটনৈতিক ইস্যু থাকবে না; এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বাস্তবতা।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দীর্ঘ সময় নেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি। আমরা দেখেছি জাতিসংঘ বহুবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবেদন দিয়েছে, আন্তর্জাতিক আদালতে মামলাও হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের ওপর কার্যকর ও বাধ্যতামূলক দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা যায়নি।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা, খাদ্য, আশ্রয় ও স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে– এ কথা সত্য। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এখন আর শুধু ত্রাণ কার্যক্রমের হিসাব শুনতে চায় না; তারা জানতে চায়, প্রত্যাবাসনের বাস্তব অগ্রগতি কোথায়? রোহিঙ্গারা কবে ফিরবে?
জাতিসংঘ বারবার বলছে, প্রত্যাবাসন হতে হবে ‘নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ’। নীতিগতভাবে এটি সঠিক অবস্থান। কিন্তু প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও যদি সেই পরিবেশ সৃষ্টি না হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে! বাংলাদেশ তো অনির্দিষ্টকালের জন্য এই বিপুল জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব বহনের অঙ্গীকার করেনি। বরং সবার অনুরোধে সাময়িক আশ্রয় দিতে চেয়েছিল এবং দিয়েছে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় বলতেই হচ্ছে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে রোহিঙ্গা সংকট এখন আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের তালিকায়ও আগের অবস্থানে নেই। ইরান পরিস্থিতি, ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যু ধীরে ধীরে বিশ্বমঞ্চে গুরুত্ব হারাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে, খাদ্য সহায়তা হ্রাস পাচ্ছে, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম সংকুচিত হচ্ছে। এই দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ক্যাম্পে হতাশা, অপরাধ ও সহিংসতার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, রোহিঙ্গা সংকট ধীরে ধীরে ‘অস্থায়ী মানবিক সংকট’ থেকে ‘দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা’-তে রূপ নিচ্ছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে, যারা জন্ম থেকেই ক্যাম্পে বড় হচ্ছে এবং মিয়ানমারকে কখনও দেখেনি।
শুধু ত্রাণ দিয়ে এ ধরনের সংকটের সমাধান হয় না; সমাধান আসে কার্যকর কূটনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক জবাবদিহি এবং বাস্তব রাজনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্ব এখনও সেই দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি।
ফলে এই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে, রোহিঙ্গা সংকট কি বাংলাদেশের জন্য স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হতে যাচ্ছে? যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়, যদি মিয়ানমারের ওপর বাস্তব চাপ সৃষ্টি না হয়, যদি প্রত্যাবাসনের সুস্পষ্ট রূপরেখা না আসে, তাহলে এই সংকট আগামী দশকগুলোতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ একা এই সংকটের বোঝা বহন করতে পারে না। এখন সময় এসেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে বাস্তব রাজনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণের। অন্যথায় যে সংকট একসময় সীমান্তের ওপার থেকে এসেছিল, সেটিই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটিতে পরিণত হতে পারে।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকারকর্মী
