ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

দিনের শুরু কেন ঘড়িতে মধ্যরাতে

দিনের শুরু কেন ঘড়িতে মধ্যরাতে
×

মোশফেকুর রহমান

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ | ০৭:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

মানুষের প্রতিদিনের জীবনে সবচেয়ে স্বাভাবিক ও দৃশ্যমান ঘটনা সূর্যোদয়। পাখি ও মোরগের ডাক, গবাদি পশুর জেগে ওঠা, মানুষের কর্মপ্রস্তুতি– সবকিছুই যেন নতুন দিনের সূচনার ঘোষণা দেয়। অথচ আধুনিক সভ্যতায় প্রতিটি নতুন দিন শুরু হয় রাত ১২টায়, যখনই পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ গভীর ঘুমে থাকে বা ঘুমাতে যায়। এখানেই ঘড়ির সময় (প্রশাসনিক সময়) ও মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি মৌলিক অসামঞ্জস্য স্পষ্ট।

বর্তমান সময়ব্যবস্থার ইতিহাস বহু প্রাচীন। প্রায় চার হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ার ব্যাবিলন সভ্যতার মানুষ সময়কে ভাগ করার ধারণা তৈরি করে। পরে প্রাচীন মিসরে দিন ও রাতকে ১২টি করে ভাগ নির্ধারণ করে। প্রাচীন রোম প্রশাসনিক সুবিধার জন্য তারিখ গণনার প্রচলনকে আরও সুসংগঠিত করে। মধ্যযুগে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ধর্মীয় পঞ্জিকা ব্যবহারকারীরা মধ্যরাতকে দুই দিনের সীমানা হিসেবে গ্রহণ করেন। কারণ এটি দিনের আলো থেকে আলাদা একটি নিরপেক্ষ মুহূর্ত।

১৮৮৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল মেরিডিয়ান কনফারেন্সে বৈশ্বিক সময় গণনায় একক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করে এবং মধ্যরাতভিত্তিক দিন গণনা আন্তর্জাতিকভাবে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে সে সময়ের মানুষ সৌর ব্যবস্থা, পৃথিবীর আহ্নিক গতি এবং দেহঘড়ির দৈনিক ছন্দসহ (সার্কাডিয়ান রিদম) অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক স্পষ্ট জ্ঞান অর্জন করেনি। সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতায় মধ্যরাতে দিন শুরু করা যৌক্তিক ছিল। কিন্তু আজ বিজ্ঞান আমাদের জানাচ্ছে, মানুষের শরীরের প্রকৃত দৈনিক ছন্দ সূর্যের আলোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বর্তমান ব্যবস্থায় রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত সময় নতুন দিনের প্রথম ছয় ঘণ্টা হলেও অধিকাংশ মানুষ এই সময় ঘুমিয়ে কাটায়। তারিখ বদলে যায়, কিন্তু নতুন দিনের অভিজ্ঞতা তখনও শুরু হয় না। মানুষসহ প্রাণীর শরীর আলোকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে জেগে ওঠাই জীববিজ্ঞানের স্বাভাবিক নিয়ম।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় একটি বিকল্প প্রস্তাব হতে পারে– প্রশাসনিক দিন শুরু হবে সকাল ৬টায় বা সূর্যোদয়ের সঙ্গে। অর্থাৎ সকাল ৬টা থেকে পরদিন ভোর ৫টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত হবে একটি পূর্ণ দিন। এতে অফিস, আদালত, স্কুল, বাণিজ্য বা পরিবহন ব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হবে না। পরিবর্তন হবে শুধু দিন গণনার সূচনাবিন্দু।
এই নতুন সময়ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হবে, ঘড়ির প্রতিটি সংখ্যা সূর্যোদয়ের পর অতিক্রান্ত ঘণ্টাকে প্রকাশ করবে। বর্তমান ঘড়িতে বিকেল ৩টা মানে সূর্যোদয়ের পর প্রায় ৯ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা অনুভব করতে পারেন না। নতুন ব্যবস্থায় এটি হবে বিকেল ৯টা, যা দিনের নবম ঘণ্টা। ফলে ঘড়ির দিকে তাকালেই সময়, সূর্যের অবস্থান এবং পৃথিবীর আহ্নিক গতির সম্পর্ক সহজে বোঝা যাবে।

দিনের প্রথম ঘণ্টাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা ‘হেড আওয়ার’ বা ‘দিবসের প্রথম ঘণ্টা’ বলা যেতে পারে। শিক্ষক ও অভিভাবক শিশুদের জিজ্ঞেস করতে পারেন, ‘তুমি তোমার মূল্যবান গোল্ডেন আওয়ারে কী করেছ?’ এতে শিশু-কিশোরেরা দিনের সূচনালগ্নকে গুরুত্ব দিয়ে কাজে লাগাতে উৎসাহী হবে। 
জাতীয় দিবস ও উৎসব উদযাপনেও এ ব্যবস্থার ইতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে। ইংরেজি নববর্ষ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, পরিবেশ দিবস ইত্যাদি যদি সূর্যোদয়ের সঙ্গে মিল রেখে শুরু হয়, তবে মানুষ সতেজ ও মানসিকভাবে প্রস্তুত অবস্থায় এতে অংশ নিতে পারবে। প্রশ্নটি তাই সহজ, কিন্তু গভীর: আমরা ঘুমিয়ে থাকার সময় কেন নতুন দিন শুরু হয়, আর সূর্যোদয়ের সঙ্গে কেন নয়? সময় এসেছে ঘড়িকে শুধু ঘণ্টা গণনার যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং প্রকৃতি, বিজ্ঞান ও মানবজীবনের ছন্দের প্রতিফলন হিসেবে নতুনভাবে ভাবার।

মোশফেকুর রহমান: সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×