ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

অপরাধের বিস্তারে জননিরাপত্তায় হুমকি 

অপরাধের বিস্তারে জননিরাপত্তায় হুমকি 
×

মো. আসাদুজ্জামান 

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ | ১৩:১২

বাংলাদেশে জননিরাপত্তা গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় ছিনতাইকারী, কিশোর গ্যাং, রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত কিংবা পেশাদার খুনিদের হাতে মানুষের প্রাণহানির খবর উদ্বেগজনক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনা নিয়ে সাময়িকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলেও, বিচারিক প্রক্রিয়ার জটিল আবর্তে অধিকাংশ মামলার চূড়ান্ত পরিণতি জনমানুষের অগোচরেই থেকে যায়। আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পরও যথাযথ প্রমাণের অভাব, তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিচার ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। 

সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী শিশু রামিসা আক্তার ৭ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে পুলিশ। এর আগে কুমিল্লার কাস্টমস কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বুলেটের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সড়ক ও মহাসড়কের চরম নিরাপত্তাহীনতাকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। ২৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায় ৪১তম বিসিএস (নন-ক্যাডার) এই কর্মকর্তার রক্তাক্ত মরদেহ পাওয়া যায় । র‍্যাবের তদন্তে উঠে এসেছে যে, চিহ্নিত ছিনতাইকারীরা তাকে জোরপূর্বক একটি সিএনজিতে তুলে নিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে এবং চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দেয় । এই ঘটনাটি নির্দেশ করে যে, পেশাদার অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বুলেটের মতো একজন সরকারি কর্মকর্তাও যখন গভীর রাতে নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না, তখন সাধারণ নাগরিকদের জীবনের ঝুঁকি কোন পর্যায়ে তা সহজেই অনুমেয়। যদিও র‍্যাব এই ঘটনায় ৫ জন চিহ্নিত ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করেছে, কিন্তু বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে যে, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রমাণের অভাবে এসব অপরাধীরা প্রায়শই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধে লিপ্ত হয় ।    

অপরাধচিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, অপরাধের ধরন ও প্রকৃতি সময়ের সাথে সাথে আরও নৃশংস এবং প্রযুক্তিগতভাবে জটিল হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কমান্ড কাঠামোতে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা অপরাধীদের জন্য এক সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করেছে । ছিনতাইকারী থেকে শুরু করে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলো এখন প্রকাশ্য দিবালোকে জনাকীর্ণ স্থানে আক্রমণ চালাতে দ্বিধা করছে না।  বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় একটি মামলার মেরুদণ্ড হলো এর তদন্ত প্রতিবেদন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই স্তরেই সবচেয়ে বেশি ত্রুটি ও অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৫৩ শতাংশ হত্যা মামলায় আসামিরা কেবল তদন্তের গাফিলতির কারণে খালাস পেয়ে যাচ্ছে। পিবিআইয়ের গবেষণায় ২৩৮টি হত্যা মামলার রায় বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, তদন্ত কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও দুর্নীতির কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ।

এই গবেষণায় চিহ্নিত প্রধান ত্রুটি পদ্ধতিগত ত্রুটি। ১১১টি খালাস পাওয়া মামলার পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, ১৩ শতাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তারা জব্দ তালিকা  সঠিকভাবে প্রস্তুত করেননি অথবা সাক্ষীদের জবানবন্দির সাথে বস্তুগত আলামতের সমন্বয় করতে পারেননি । প্রায় ১২ শতাংশ মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা নিজে আদালতে সাক্ষ্য দিতে উপস্থিত হননি অথবা গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছেন ।এছাড়াও ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণের সময় আইনি পদ্ধতি অনুসরণ না করায় উচ্চ আদালতে তা বাতিল হয়ে যায়, ফলে সরাসরি প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও আসামী খালাস পায় ।   
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বা সুরতহাল রিপোর্টের ত্রুটি ও জালিয়াতি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার অন্যতম অন্ধকার দিক। ফরেনসিক সায়েন্সের আধুনিকায়নের অভাবে এবং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের কারণে চিকিৎসকরা ভুল রিপোর্ট প্রদান করেন। সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি এর একটি প্রকট উদাহরণ। ২০১৬ সালে কুমিল্লা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে তার মরদেহ পাওয়া গেলেও প্রথম ময়নাতদন্তে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছিল । পরবর্তী সময়ে গণদাবির মুখে দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে গণধর্ষণের প্রমাণ মিললেও দীর্ঘ বিলম্বের কারণে ফরেনসিক আলামতগুলো ততদিনে অস্পষ্ট হয়ে পড়েছিল । আজ পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়নি এবং কোনো আসামী শনাক্ত হয়নি।   

বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মামলার অবিশ্বাস্য পাহাড়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ লক্ষ ৪২ হাজার ৭৩১টি । এই বিশাল সংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় বিচারক ও অবকাঠামো বাংলাদেশে নেই।  আদালতওয়ারী মামলার এই জট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে  আপিল বিভাগ ৪১,৫৫১ টি, হাইকোর্ট বিভাগে ৬,৫৯,২৫৬, অধস্তন আদালত (নিম্ন আদালত) ৪০,৪১,৯২৪ টি মামলা পেন্ডিং আছে।  এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট মামলার ৮৫ শতাংশই পড়ে আছে নিম্ন আদালতগুলোতে, যেখানে সরাসরি বিচারপ্রার্থীরা বিচার আশা করেন । প্রতিদিন গড়ে কয়েক হাজার নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু নিষ্পত্তির হার অত্যন্ত মন্থর। কেবল ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসেই নতুন করে ৪ লক্ষ ৩৬ হাজার ৪৭৯টি মামলা দায়ের হয়েছে । এই পরিস্থিতির কারণে একটি ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তি হতে ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লেগে যায়, যা বিচারপ্রার্থীদের জন্য মানসিক ও আর্থিক ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায় ।   

আইন কমিশনের প্রতিবেদন এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, মামলার এই পাহাড় সৃষ্টির পেছনে মূলত বিচারক স্বল্পতা, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, আইনজীবীদের ভূমিকা এবংঔপনিবেশিক আইন দায়ী বলে মনে করে । জনসংখ্যার অনুপাতে বিচারকের সংখ্যা বাংলাদেশে বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। হাইকোর্টে ১১১ জন এবং নিম্ন আদালতে মাত্র ২,১৮৭ জন বিচারক দিয়ে কোটি কোটি মানুষের বিচার নিশ্চিত করা অসম্ভব।    

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার পেছনে বিচার বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের প্রকট অভাব দায়ী। পুলিশ আসামী গ্রেফতার করলেও প্রসিকিউশন বা সরকারি আইনজীবীদের দুর্বলতার কারণে আসামী দ্রুত জামিন পেয়ে যায়। অন্যদিকে, আদালত অনেক সময় সাক্ষীদের হাজির করার জন্য কড়া নির্দেশ দিলেও পুলিশ তা বাস্তবায়নে উদাসীন থাকে। উচ্চ আদালত সম্প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, ফৌজদারি মামলায় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হওয়া সত্ত্বেও তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা বারবার সমন সত্ত্বেও আদালতে হাজির হন না। একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার নজির উল্লেখ করে আদালত জানান যে, ২১ বছরেও একজন সাক্ষী আদালতে হাজির হননি । অনেক সময় পুলিশ কর্মকর্তারা শান্তি রক্ষা মিশনে বিদেশ চলে যান অথবা চিকিৎসকরা উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে যান, ফলে বিচার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর থমকে থাকে। হাইকোর্ট এই মর্মে নির্দেশ দিয়েছে যে, যদি সরকারি কর্মচারীরা সাক্ষী দিতে না আসেন, তবে তাদের বেতন বন্ধ করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে ।   

দেশের বিচার ব্যবস্থার একটি বড় অংশ দখল করে আছে এমন সব মামলা, যা প্রকৃতপক্ষে ফৌজদারি অপরাধ হওয়ার কথা ছিল না। একে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘ওভার-ক্রিমিনালাইজেশন’ বা অতি-ফৌজদারীকরণ বলে অভিহিত করছেন । ছোটখাটো দেওয়ানি বিবাদ, বিশেষ করে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধকে ফৌজদারি রূপ দিয়ে মামলা করার ফলে প্রকৃত হত্যা বা ডাকাতির মামলাগুলো গুরুত্ব হারাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে হাজার হাজার ‘কাল্পনিক’ বা হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রায় ১৪০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হত্যার মামলা দেওয়া হয়েছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে বাদী নিজেই আসামিকে চেনেন না । এই ধরনের মামলার কারণে পুলিশের তদন্ত সংস্থার সক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে এবং প্রকৃত খুনিরা এই সুযোগে আড়ালে চলে যাচ্ছে ।   

দেশের বিচারহীনতার এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আমূল সংস্কার প্রয়োজন। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচার বিভাগ এবং পুলিশ বাহিনীর সংস্কারের জন্য বিভিন্ন কমিশন গঠন করেছে কিন্ত বাস্তবে এখনো দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নেয়নি। প্রস্তাবনায় পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করতে একটি স্বাধীন ‘পুলিশ সার্ভিস কমিশন’ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি, যা পুলিশের নিয়োগ, বদলি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে । বর্তমানে দলীয় বিবেচনায় সরকারি আইনজীবী নিয়োগের পরিবর্তে একটি স্থায়ী ও স্বতন্ত্র প্রসিকিউশন সার্ভিস গঠন করতে হবে, যারা কেবল আইনের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে। 

দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং বিচারিক ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ব্যর্থতার ফল। ছিনতাইকারীর হাতে বুলেট হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া কিংবা তদন্তের ভুলে খুনিদের খালাস পাওয়া—সবই একই ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশ। যখন একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় এবং বিচার ব্যবস্থাকে অপরাধীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেয়, তখন সেই সমাজে নৈরাজ্য অনিবার্য। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতির দায় আদালত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—উভয়কেই নিতে হবে।

দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং জবাবদিহিতার অভাবই আজ অপরাধীদের সবচেয়ে বড় শক্তি। ২০২৫-২০২৬ সালের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো যদি দ্রুত বাস্তবায়ন না করা হয়, তবে সাধারণ মানুষের বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে শেষ আস্থাটুকুও হারিয়ে যাবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিচারিক সক্রিয়তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্বের সমন্বয়েই কেবল একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব, যেখানে অপরাধী যেই হোক না কেন, তাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। বিচারহীনতার অন্ধকার ঘুচিয়ে আইনের শাসনের আলো ফিরিয়ে আনাই হোক আজকের দিনের অঙ্গীকার।

মো. আসাদুজ্জামান: সহকারী অধ্যাপক, আইন ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected] 

আরও পড়ুন

×