ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পরিবেশ-প্রতিবেশ

কৃষিব্যবস্থার পুনর্গঠনে করণীয়

কৃষিব্যবস্থার পুনর্গঠনে করণীয়
×

নজরুল ইসলাম হক্কানী

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ | ১৪:২৯ | আপডেট: ২০ মে ২০২৬ | ১৬:৩৮

বাংলাদেশের কৃষি আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, খরা, লবণাক্ততা ও পানিসংকট; অন্যদিকে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ন্যায্যমূল্যের অভাব ও কৃষিজমি হ্রাস—সব মিলিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি গভীর চাপে রয়েছে। উত্তরের তিস্তা অববাহিকা থেকে দক্ষিণের পদ্মা তীর, হাওর থেকে চলন বিল কিংবা ভবদহ—সব অঞ্চলেই কৃষকের সংকটের ধরন ভিন্ন হলেও মূল সমস্যা একই: কৃষি ও পানিসম্পদের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই বাস্তবতায় প্রয়োজন একটি ‘নয়া কৃষি আন্দোলন’—যে আন্দোলন শুধু ফসল উৎপাদনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পানি, নদী, জমি, সমবায়, বাজার ও গ্রামীণ শিল্পায়নকে একসূত্রে গেঁথে কৃষিকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।

তিস্তা: পানির ন্যায্য হিস্যার আন্দোলন: উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে তিস্তা শুধু নদী নয়, জীবন ও জীবিকার প্রতীক। শুষ্ক মৌসুমে ভারত থেকে পর্যাপ্ত পানি না আসায় তিস্তা আজ অনেক স্থানে মৃতপ্রায়। কৃষকরা সেচের পানির অভাবে বছরে একাধিক ফসল ফলাতে পারছেন না। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, নদীভাঙন বাড়ছে, চরাঞ্চলে দারিদ্র্য গভীর হচ্ছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, নদী খনন, সেচব্যবস্থা আধুনিকীকরণ এবং আন্তঃনদী সংযোগের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের কৃষিকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। চীনের নদীভিত্তিক উন্নয়ন অভিজ্ঞতা দেখায়—সঠিক পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ থাকলে নদীকে কেন্দ্র করেই কৃষি, শিল্প ও নগরায়ণের নতুন অর্থনীতি গড়ে তোলা যায়।

পদ্মা ও দক্ষিণাঞ্চল: লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার চ্যালেঞ্জ: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পদ্মা ও তার শাখানদীগুলোর প্রবাহ কমে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা। যশোরের ভবদহ অঞ্চল বছরের পর বছর পানিবন্দি থাকে। অনেক কৃষক চাষাবাদ ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছেন। পদ্মা ব্যারাজ, নদী পুনঃখনন ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। শুধু ধান নয়—মৎস্য, সবজি, ফল, হাঁস পালন ও জলজ সম্পদভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে।

হাওর ও চলন বিল: জলাভূমিভিত্তিক কৃষির নতুন ভাবনা: হাওর অঞ্চল ও চলন বিল বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কিন্তু আগাম বন্যা, অপরিকল্পিত বাঁধ, নদী ভরাট ও যোগাযোগ সংকটের কারণে এখানকার কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নয়া কৃষি আন্দোলনের অংশ হিসেবে হাওর ও বিলাঞ্চলে মৌসুমি কৃষির পাশাপাশি সমবায়ভিত্তিক মৎস্যচাষ, হাঁস পালন, ভাসমান কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা জরুরি। এতে কৃষকের আয় বাড়বে এবং সারা বছর কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

সমবায়ভিত্তিক কৃষি: বিচ্ছিন্ন কৃষক থেকে সংগঠিত শক্তি: বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষকের জমি ছোট ও খণ্ডিত। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ে, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার কঠিন হয়। এই সংকটের সমাধান হতে পারে সমবায়ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা। চীনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ক্ষুদ্র কৃষকদের সংগঠিত করে সমবায় গড়ে তুললে উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং বাজার ব্যবস্থায় কৃষকের শক্তি বাড়ে। ‘মিল্ক ভিটা’ মডেলের মতো সমবায়ভিত্তিক দুগ্ধশিল্প গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে পারে।

কৃষির সঙ্গে গ্রামীণ শিল্পায়নের সংযোগ:
কৃষি শুধু মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে কৃষকের আয় বাড়বে না। কৃষির সঙ্গে ক্ষুদ্র শিল্প ও প্রক্রিয়াজাত শিল্প যুক্ত করতে হবে। আলু থেকে চিপস, টমেটো থেকে সস, দুধ থেকে দুগ্ধজাত পণ্য, মাছ থেকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য—এভাবে গ্রামে শিল্পভিত্তি তৈরি করা গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তিস্তা থেকে পদ্মা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে যদি কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে ওঠে, তবে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।

স্থানীয় সরকার ও কৃষক সংগঠনের ভূমিকা:
নয়া কৃষি আন্দোলন কেবল সরকারের প্রকল্প দিয়ে সফল হবে না; এতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, কৃষক সমিতি ও সমবায় সংগঠনগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রতিটি অঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি, কৃষি সমবায় ও কৃষিপণ্য বাজার কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এতে কৃষক সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবেন।

শেষকথা: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের প্রশ্নে কৃষিকে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে। নদী ও জলাভূমিকে ধ্বংস করে নয়, বরং সেগুলোকে কেন্দ্র করে কৃষি ও অর্থনীতির পুনর্গঠন করতে হবে। তিস্তা থেকে পদ্মা—এই বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে যদি পানিসম্পদ, সমবায়, আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়, তবে একটি শক্তিশালী নয়া কৃষি আন্দোলন গড়ে উঠবে। সেই আন্দোলন শুধু কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে না; বরং বাংলাদেশকে খাদ্য, পানি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নতুন যুগে প্রবেশ করাবে।

নজরুল ইসলাম হক্কানী: সভাপতি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ
[email protected]

আরও পড়ুন

×