পল্লবীতে শিশুহত্যা
শৈশবের নিরাপত্তা আর কতদূর?
রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তা পরিমাপ করা হয় সেখানে শিশুরা কতটা নিরাপদ তার ওপর ভিত্তি করে
দীপা দত্ত
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ | ২০:০৪
‘আমি বিচার চাই না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার রেকর্ড নেই’–পল্লবীতে নৃশংসভাবে খুন হওয়া শিশুটির বাবার এই বুকভাঙা খেদোক্তি শুধু একজন শোকাহত পিতার ব্যক্তিগত আক্ষেপ নয়। এটি আসলে আমাদের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার প্রতি দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং গভীর আস্থাহীনতার দলিল। যে পিতা তার ফুটফুটে সন্তানের নিথর, রক্তাক্ত লাশের সামনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র ও আইনের কাছে বিচার চাওয়ার ন্যূনতম শক্তি বা ভরসা হারিয়ে ফেলেন, সেই সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত যে কতটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে, তা আর আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এই আস্থাহীনতা এক দিনে তৈরি হয়নি। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়া, প্রভাবশালী আসামিদের আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসা এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ মানুষকে আজ এই দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন দীর্ঘ আইনি লড়াইকে কেবলই এক মানসিক হয়রানি ও অর্থ অপচয় মনে করে। আর এই সুযোগে সমাজে খুনি ও অপরাধীরা আরও বেশি বেপরোয়া ও দুর্ধর্ষ হয়ে উঠছে।
রাজধানীর পল্লবীর একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। তার চমৎকার একজোড়া চোখ ছিল। সে যখন হাসত, তখন তার চোখগুলোও হেসে উঠত। সেই চোখ দিয়ে সে হয়তো বড় কোনো স্বপ্নও দেখত। কিন্তু গত মঙ্গলবার সকালে সেই চোখের আলো নিভে গেল। চিরদিনের জন্য। ধর্ষণের পর অবলীলায় এক বিকারগ্রস্ত প্রতিবেশী তার গলায় ধারালো অস্ত্র চালিয়ে দিল। শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল মাথাটি।
এটি কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়। সে রক্ত-মাংসের এক শিশু। যে তার মায়ের কাছে একটু আগেও হয়তো কিছু না কিছু নিয়ে বায়না ধরেছিল। সকালে মা যখন মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য পুরো ভবন খুঁজছেন, তখন একটি ফ্ল্যাটের দরজার সামনে পড়ে ছিল তার ছোট্ট এক স্যান্ডেল। মা কি তখন জানতেন, ওই বন্ধ দরজার ওপাশে কোনো মানুষ বাস করে না? ওপাশে ওত পেতে বসে আছে এক আদিম পিশাচ?
আমরা হরহামেশাই বলি, মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। আশরাফুল মাখলুকাত। অথচ রিকশা মেকানিক সোহেল রানা নামে একটি নরপশু যখন আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর তার গলা কেটে ফেলে, মাথাটা বাথরুমে রেখে দেয় আর দেহটা খাটের নিচে লুকিয়ে লাশ গুমের চেষ্টা করে, তখন বিবেকের সব আলো এক নিমেষে নিভে যায়। কোনো সুস্থ মস্তিষ্ক কিংবা স্বাভাবিক মানবিকতা দিয়ে এই আদিম ও কুৎসিত আচরণকে ব্যাখ্যা করা যায় না।
পল্লবীর এই হত্যাকাণ্ড আমাদের চোখের সামনে এক নির্মম সত্যকে আবার উন্মোচিত করেছে–আমাদের শিশুরা আজ কোথাও নিরাপদ নয়। যে শৈশব হওয়ার কথা ছিল আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর নিশ্চিন্তে প্রজাপতির মতো ডানা মেলে বেড়ে ওঠার, সেই শৈশব আজ ঘরে-বাইরে, চেনা-অচেনা সব পরিবেশে এক অদৃশ্য আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
এই নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম কারণ হলো আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের আশঙ্কাজনক অবক্ষয়। রাষ্ট্র যখন অপরাধীকে যথাসময়ে শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেখানে বিচারহীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসে। অতীতে দেখা গেছে, বহু শিশু হত্যার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে অথবা প্রভাবশালী আসামিরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ধরে নেয় যে আইনি লড়াই কেবলই দীর্ঘমেয়াদি হয়রানি ও অর্থ অপচয়। এই মানসিকতা অপরাধীদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলছে, যা সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে ধুয়েমুছে সাফ করে দিচ্ছে।
শিশুদের জন্য বিপদ কোনো দূরবর্তী স্থানে নয়, বরং ঘরের দরজা পেরোলেই ওত পেতে থাকে। আমরা সাধারণত বাইরের রাস্তাঘাট বা অপরিচিত পরিবেশকে অনিরাপদ ভাবি, কিন্তু এই রোমহর্ষক ঘটনাটি আমাদের চেনা গণ্ডি এবং প্রতিবেশীর বিশ্বস্ততার দেয়ালকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। পাশের ফ্ল্যাটের চেনা মানুষটিই যখন ডেকে নিয়ে এমন পৈশাচিকতা চালায়, তখন শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষার শেষ আশাটুকুও থাকে না। এই নির্মমতা শুধু একটি জীবন কেড়ে নেয়নি, বরং প্রতিটি মা-বাবার মনে চিরস্থায়ী ট্রমা ও গভীর অনাস্থা তৈরি করেছে। নিহত শিশুর বাবার ‘আমি বিচার চাই না’ আকুল আক্ষেপ সমাজের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ ও অসহায়ত্বকে ফুটিয়ে তোলে। চেনা মানুষের ছদ্মবেশে থাকা এই ঘাতকদের কারণে আজ শিশুরা নিজের ভবনের ভেতরেও নিরাপদ নয়। এই সামাজিক অবক্ষয় ও পাশবিকতা বন্ধ করতে না পারলে আমরা কখনোই আমাদের শিশুদের একটি ভয়হীন, স্বাভাবিক ও নিরাপদ শৈশব উপহার দিতে পারব না।
রাষ্ট্র কতটা সভ্য, তা পরিমাপ করা হয় সেখানে শিশুরা কতটা নিরাপদ তার ওপর ভিত্তি করে। পল্লবীর এই শিশুটির বাবার মনে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আমরা আর কোনো বাবার এমন অসহায় উক্তি শুনতে চাই না। আমরা চাই প্রতিটি শিশুর জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর বাংলাদেশ।
তারপরও মাঝরাতে যখন পুরো শহর ঘুমে কাদা হয়ে থাকবে, তখন হয়তো শিশুটির মায়ের চোখের পাতা এক হবে না। তিনি শূন্য ঘরের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে মেয়ের খিলখিল হাসির শব্দ খুঁজবেন। আর সেই বন্ধ দরজার সামনে পড়ে থাকা ছোট্ট স্যান্ডেল কেবলই এক অবিনশ্বর হাহাকার হয়ে আমাদের তাড়া করে বেড়াবে।
দীপা দত্ত: সংবাদকর্মী
- বিষয় :
- শিশু হত্যা
- নিরাপত্তা
