সমাজ
মুসলিম পরিবারে সংস্কৃতিচর্চায় অবরোহণের কাল
মামুনুর রশীদ
মামুনুর রশীদ
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৮:০৯ | আপডেট: ২২ মে ২০২৬ | ১১:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ কমছে। এর মধ্যে মুসলিম পরিবারের সন্তানদের সংখ্যা হ্রাস আরও বেশি দৃশ্যমান। যদিও এর মূলে শিক্ষা ব্যবস্থাকেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী করতে হয়। অসংখ্য শ্রেণি পরীক্ষা, কোচিং সেন্টারে উপস্থিতি, একাধিক কোচিং শিক্ষকের কাছে পাঠের চাপের ফলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে সংস্কৃতিচর্চার। এরই ফলাফল সমাজের অস্থিরতা, ভারসাম্যহীনতা। যে কোনো ধর্মের সঙ্গে সেই দেশের সংস্কৃতির মিশেল থাকতে হয়। যে কোনো ধর্মযাজক, ধর্মপ্রচারক এবং মিশনারিরা এই কাজ দিয়েই তাদের ধর্ম প্রচারের সূচনা করে থাকেন। আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাসও তাই। উদাহরণ হিসেবে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (র.), নিজামউদ্দিন আউলিয়া এবং হজরত শাহ্জালালের (র.) নাম উল্লেখ করতে পারি। তারা যুদ্ধ-বিগ্রহ ছাড়াই সংস্কৃতির ভেতরে প্রবেশ করে মানুষের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
যারা সুফি মতাবলম্বী তারা সূচিকর্ম, সংগীত এবং নানা ধরনের চারুকলার কাজ দিয়ে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করেন। বাল্যকালে দেখেছি, গৃহাভ্যন্তরে আমাদের জননীরা এম্ব্রয়ডারি করতেন এবং সেগুলো ছিল দেয়ালে টাঙানো চমৎকার সব সূচিকর্ম। গ্রামাঞ্চলে অসংখ্য নারী বিয়ের গীত রচনা করে গাইতেন। পালাগান, কবিগান, যাত্রাপালা ছিল ঋতু পরিবর্তনের কালে অবধারিত আয়োজন। ঈদের আগে-পরে গ্রামাঞ্চলে গানবাজনা ও নাট্যানুষ্ঠান ছিল অলিখিত নিয়ম। এসবের মধ্য দিয়েই আমাদের প্রজন্ম বেড়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের পরও এসব চর্চা অবারিত ছিল। কিন্তু শিশু-কিশোরদের শিক্ষার সিলেবাস এত ভারী হতে শুরু করল যে, তাদের জীবনে আর কোনো অবসর রইল না। আস্তে আস্তে বাড়িতে যে সংস্কৃতিচর্চা ছিল, তাতে ভাটা পড়তে শুরু করল।

শিশুরা জন্মগতভাবেই প্রাকৃতিক জ্ঞানের অধিকারী। কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই তারা অসাধারণ সব কাজ করে থাকে। শিক্ষার পাশাপাশি এসব শিল্পচর্চার মাধ্যমে তাদের জীবনের নানা দিগন্তের উন্মেষ হতে থাকে। আমাদের গ্রামীণ জীবনে বিভিন্ন সময়ের মেলা, সংস্কৃতিতে আসা ভ্রাম্যমাণ সাংস্কৃতিক দলগুলোর আগমন শিশু-কিশোরদের মন আর্দ্র করে রাখত এবং সেখান থেকে নতুন নতুন প্রেরণার জন্ম হতো। এর পাশাপাশি ছিল গ্রাম থেকে শুরু করে শহর পর্যন্ত নানা ধরনের ছোট-বড় পাঠাগার। পাঠ্যবইয়ের বাইরে এসব পাঠাগার থেকে বই-পুস্তক নিয়ে বিভিন্ন বয়সের ছেলেমেয়ে তাদের চিন্তার ছাপ রাখত হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকায়। স্কুল-কলেজের বার্ষিক সাংস্কৃতিক আয়োজনে গান, আবৃত্তি, নাটক, ছবি আঁকায় তাদের অংশগ্রহণ ছিল উৎসবমুখর। প্রতিটি স্কুল-কলেজে কিছু শিক্ষক থাকতেন, যারা এসব শিল্পের ক্ষেত্রে নানাভাবে উৎসাহী এবং ছেলেমেয়েদের উৎসাহ দিতেন। পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি এই শিল্পের আয়োজন শিশু-কিশোরদের মনকে ভরাট করে রাখত। এখান থেকেই তাদের শিল্পের জিজ্ঞাসা তৈরি হতো এবং শিল্পী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিত। তাদের মধ্য থেকে তৈরি হতো ভবিষ্যতের বড় শিল্পী। শৈশব ও কৈশোরের এসব আনন্দময় দিন তাদের ভবিষ্যৎ রচনা করত, যেখান থেকে মনুষ্যত্বের একটা ভিত্তি রচনা হতো। সেই সঙ্গে যুক্ত হতো ক্রীড়া। ক্রীড়া শিশুর শরীর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। পিটি-প্যারেড, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, আন্তঃস্কুল ফুটবল, ক্রিকেট এবং নানা অ্যাথলেটিকের প্রচলন থাকায় অনেক বড় বড় খেলোয়াড়ের জন্ম হতো। কিন্তু সর্বনাশা কোচিংয়ের সঙ্গে নোটবুক, গাইডবুকের ব্যবসা শুরু হওয়ায় সর্বজনীন শিক্ষাকে ধ্বংসপ্রাপ্ত। সেই স্থানে শিক্ষা একটি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এবং পরবর্তীকালেও সনাতন ধর্মের অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তি, গুণী শিক্ষক দেশ ত্যাগ করলে শিল্পচর্চায় একটা শূন্যতা তৈরি হয়। তবে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর উঠে এলেন এক দল কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গায়ক, অভিনেতা, নাট্যকার। সেই প্রভাবে গত শতাব্দীজুড়ে শেষ পর্যন্ত একটা সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল শিল্পের জগৎকে আমরা পেয়েছি। এই সময়ে অনুপ্রবেশ করে শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবসা এবং ঘরে ঘরে মৌলবাদীদের বিভ্রান্তিকর ফতোয়া প্রদান। ধর্মের অনুশাসনের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে গানবাজনা, নাটক, চারুশিল্পকে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়। এই সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষারও উত্থান হয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠী কোচিং ও শিক্ষার ব্যয় মেটাতে অক্ষম হয়ে সন্তানদের মাদ্রাসায় ভর্তি করতে শুরু করে।
শুধু তাই নয়, অন্তঃপুরের নারীদের আরও বেশি করে অন্তরীণ করার জন্য সমস্ত পাকা ব্যবস্থা শুরু করা হয়। দেশের শিল্পের জগতে একটা বড় সম্পদ বাউল সম্প্রদায়কে নানাভাবে আক্রমণ করতে থাকে। চারণ কবি ও নাট্যকর্মীরাও আক্রান্ত হয়। আর এসবই হয় ধর্মীয় অনুশাসনের অপব্যাখার কারণে। আবার উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তরা জাতীয় সংস্কৃতিকে ত্যাগ করে বিজাতীয় সংস্কৃতি আমদানি করতে শুরু করে, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি তাদের সহায়তার হাত সম্প্রসারণ করে। সম্প্রতি দেখা গেছে, একটি শিশু বা কিশোর দিনের পাঁচ ঘণ্টা কাটায় সেলফোনের বিভিন্ন অ্যাপস এবং ইন্টারনেটের মধ্যে। বই পড়ার চেয়ে তাদের কাছে এটি অনেক বেশি আনন্দময়। ফলে অধিকাংশ শিশুর চোখের সমস্যা দেখা দেয় এবং নানা ধরনের অস্থিরতা ও উৎকেন্দ্রিকতা সমাজকে দিশেহারা করতে থাকে। অভিভাবকরা এসব বিষয়কে খুব গুরুত্ব দেন না। এ কারণে বাংলার ঘরে ঘরে এক সময় যে সংস্কৃতিচর্চা হতো, সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে আছে অপরাজনীতি। উদ্দেশ্যহীন রাজনীতির ফলে কিশোর-তরুণরা ক্রমাগত বিভ্রান্ত হয়। সম্প্রতি ইউনূসীয় শাসনে পত্রপত্রিকায় দেখা যায়, সংস্কৃতির সংকোচন নীতির মাধ্যমে হাজার হাজার শিল্পীকে অপমান এবং সংস্কৃতিচর্চা বন্ধ করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। এই সময়ে নাটক, চলচ্চিত্র, সংগীত, চারুকলা মুখ থুবড়ে পড়ে। মিলনায়তনগুলোতে দর্শক সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমতে থাকে। বিভিন্ন শিল্পকলা একাডেমিতে অগ্নিসংযোগ, পরিশেষে ছায়ানটের ওপর হামলা করে তাদের বিজয় উৎসবের চূড়ান্ত পর্যায় দৃশ্যমান হয়। কিন্তু এর বিপরীতে পহেলা বৈশাখে বিপুলসংখ্যক মানুষের এই উৎসবে অংশগ্রহণ প্রমাণ করে– বাংলাদেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক এবং সংস্কৃতিচর্চা অব্যাহত রাখতে মরিয়া। এখন সিনেমা হল, নাট্য মিলনায়তনে সর্বত্র দর্শক সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। মানুষের সংস্কৃতিচর্চার পুরোনো অভ্যাস আবার জাগছে। মবকে যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত করা না হয়, তাহলে শিল্পের এক বাঁধভাঙা জোয়ার দেখার প্রত্যাশা করি। কিন্তু বাঙালি মুসলমানদের গৃহে যে সংস্কৃতিচর্চা, এটিকে যদি অভিভাবকরা উৎসাহিত করেন, তাহলে অবশ্যই এবং সামাজিক অস্থিরতা অনেকাংশেই কমে আসবে। একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে এই চর্চার প্রতি আমাদের গভীর মনোযোগ প্রয়োজন। শিশু-কিশোরদের মধ্যে শিল্পের স্বাভাবিক চর্চা অত্যন্ত শৈল্পিক এবং গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আজ যদি আমরা ব্যর্থ হই বা শিশুদের কোমল মনকে শিল্পের দিকে আকর্ষণ করতে না পারি তবে যে অস্থিরতার জন্ম হবে, তা রোধের ক্ষমতা সমাজ ও সরকারের কারও আয়ত্তে থাকবে না।
মামুনুর রশীদ: নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
- বিষয় :
- মামুনুর রশীদ
