সমকালীন প্রসঙ্গ
ভিউ বাণিজ্য কি কোরাবানির মাহাত্ম্য ম্লান করছে?
গোলাপি রঙের অ্যালবিনো মহিষের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’
বদরুল হাসান
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ১৬:২৮
‘নারায়ণগঞ্জে দেখা মিলল পিঙ্ক কালারের এক রাজকীয় মহিষের। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে অ্যালবিনো মহিষটি এখন দেশ জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একে তো গায়ের রং মেয়েদের পছন্দের পিঙ্ক কালার, তার ওপর দেখতে ট্রাম্পের মত।’
একটি সংবাদপত্রের ভিডিও রিলের এই ধারা বর্ণনা শুনলে মনে হতে পারে, আমরা কোনো সার্কাস বা বিনোদন জগতের খবর শুনছি। অথচ এটি আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর বাজারের চিত্র। এই মহিষটিকে ঘিরে মূলধারার সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ইউটিউবার ও টিকটকার—সবাই যেন ‘ফোমো’তে আক্রান্ত: কিছু একটা মিস হয়ে যাচ্ছে! সেই তাড়নাতেই এক অবলা প্রাণী রাতারাতি মৌসুমি সেলিব্রিটিতে পরিণত হয়েছে!
যে সাংবাদিকরা সারা বছর রাজনীতি, অর্থনীতি, দুর্নীতি, বাজারদর কিংবা জনজীবনের নানা সংকট নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, কোরবানি আসলেই তাদের একাংশ গরুর উচ্চতা, ওজন, রং, জাত, দাম ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। সংবাদমাধ্যমের এই অতি-উৎসাহে কোরবানি আর কেবল ধর্মীয় ত্যাগের উৎসব থাকে না; এটি যেন এক ধরনের প্রদর্শনী, খানিক ফ্যাসান প্যারেডও বটে।
পশুর হাটে নামকরণের সাম্প্রতিক প্রবণতা বেশ লক্ষণীয়, কিন্তু একই সঙ্গে অস্বস্তিকরও। এখানে পশুর নাম হতে হয় ক্ষমতাধর, বিতর্কিত, জনপ্রিয় অথবা আলোচিত কোনো ব্যক্তির নামে। কোনোটি বিশ্বনেতা, কোনোটি চলচ্চিত্র তারকা, কোনোটি ক্রীড়াবিদ, আবার কোনোটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত মুখ।
গোলাপি রঙের অ্যালবিনো মহিষের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে খবরটি এমনভাবে পরিবেশিত হয়, যেন পশুটির রং, চামড়া ও বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এক ধরনের দৃশ্যগত মিল রয়েছে। কেউ কেউ ক্যামেরার সামনে আবার এই দাবির প্রতি জোড়ালো সমর্থন ব্যক্ত করে ভাইরাল হতে চাইছেন। আরেক মহিষের নাম রাখা হয় ‘নেতানিয়াহু’। প্রতিবেদনে বলা হয়, মহিষটি নাকি বেশ উগ্র ও ছটফটে; মানুষ দেখলেই তেড়ে আসে। তাই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে তার নামকরণ!
ফুটবল মাঠের চিরচেনা বিশ্বসেরা ‘মেসি’ও বাদ যায়নি। কোনো চটপটে বা চঞ্চল ষাঁড়ের নাম হয়েছে মেসি। বিনোদন জগতের প্রতিনিধি হিসেবে ‘শাকিব খান’, ’জায়েদ খান’, ‘ডিপজল’, ‘হিরো আলম’ ধরনের নামও দেখা যায়।
এ ধরনের নামকরণকে অনেকে নির্দোষ রসিকতা হিসেবে দেখেন। একটু গভীরভাবে দেখলে, এর মধ্যে কৌতুকের পাশাপাশি অবজ্ঞা, বিদ্রূপ, এমনকি মানহানির উপাদানও রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক নেতা, তারকা বা বিতর্কিত ব্যক্তিকে পছন্দ না করার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তাঁর নামে পশুর নামকরণ সুস্থ রুচির পরিচায়ক নয়।
আরও অস্বস্তিকর হলো, কোরবানির মতো ধর্মীয় অনুষঙ্গের সঙ্গে এ ধরনের নামকরণ জুড়ে গেলে তার ভেতরে এক ধরনের প্রতীকী আক্রোশ তৈরি হয়। কোনো অপছন্দের ব্যক্তি বা প্রতিপক্ষের নামে পশুর নাম রেখে পরে সেই পশুকে কোরবানি দেওয়া—এর ভেতরে প্রতিহিংসার এক ধরনের ছায়া থাকে।
কোরবানির মূল শিক্ষা আত্মত্যাগ, সংযম, লোভ ও অহংকার ত্যাগের মধ্যে নিহিত। সেখানে কারও নামে পশুর নাম দিয়ে হাসি-তামাশা করা কিংবা সেটিকে বিনোদনে পরিণত করা কোরবানির আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের সঙ্গে যায় না। এটি আমাদের গণমাধ্যম, বাজারসংস্কৃতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রুচির প্রশ্নও সামনে আনে।
আরও একটা জিনিস খেয়াল করেছেন? এই নামকরণের তালিকায় কোনো নারী তারকার নাম নেই। ‘দীপিকা’ বা ‘অ্যাঞ্জেলিনা জোলি’ নামে কোনো গরু হাটে উঠেছে বলে শোনা যায় না। কেন? কারণ আমাদের পৌরুষদীপ্ত সমাজে ‘ষাঁড়’ মানেই বীর পুরুষ হতে হবে। গরুর গায়ে চর্বি আর পেশি বেশি থাকলে তার নাম দিতে হবে ‘টাইসন’—কারণ সে গুঁতো দিলে বডি বিল্ডারের মতো ভাব আসে।
বংশমর্যাদা সম্পন্ন গরুর কল্পকাহিনি
শুধু গরুর সাইজ, ওজন বা স্বাস্থ্য নয়; মিডিয়া ও এগ্রো-ফার্মগুলো পশুর ‘বংশমর্যাদা’ নিয়েও রীতিমতো নাটকীয় বয়ান তৈরি করে। খামারিরা ক্যামেরার সামনে এমনভাবে গরুর জাত, বংশ, খাবার, পরিচর্যা ও জীবনযাপন তুলে ধরেন, যেন সেটি কোনো বিশেষ বংশের রাজপুত্র।
রিপোর্টারও অনেক সময় সেই বয়ানকে আরও নাটকীয় করে তোলেন। “এই ষাঁড়টি সাধারণ নয়”, “বিশেষ জাতের”, “রাজকীয় খাদ্যে বড় হয়েছে”, “ওজন এত মণ”, “দাম এত লাখ”—এসব বাক্য যেন মৌসুমি প্রতিবেদনের নিয়মিত উপকরণ।
একটি প্রাণী ঘাস, খৈল, ভুসি বা খামারের খাবার খেয়ে বড় হয়েছে—এটাই বাস্তবতা। কিন্তু মিডিয়ার চটকদার ভাষায় সে হয়ে ওঠে ‘রাজকীয়’, ‘দেশ কাঁপানো’ বা ‘ভাইরাল’ পশু। এভাবে পশুর বাজারকে বাস্তব অর্থনীতি থেকে সরিয়ে এক ধরনের কল্পিত মর্যাদা-বাজারে পরিণত করা হয়।
একটি পশুকে ভাইরাল করতে বিশেষ নাম, বিশেষ খাবার, সাজসজ্জা, আলো, ভিডিও, ফেইসবুক পোস্ট, টিকটক ক্লিপ—সবকিছু ব্যবহার করা হয়। এই পুরো প্রদর্শনী একতরফা নয়। এর পেছনে রয়েছে খামারিদের বিপণন কৌশল, মিডিয়ার চাহিদা এবং দর্শকের ডিজিটাল অংশগ্রহণ।
দাম যখন সংবাদ
এমনিতেই কোরবানির পশুর দামের প্রতি মানুষের আগ্রহ অপিরসীম। হাল আমলে এই ভিউ-ব্যবসার সবচেয়ে কার্যকর উপাদান হয়ে উঠেছে পশুর গগণচুম্বী দাম। খামারিরা যখন আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দাম হাঁকেন, অনেক সংবাদমাধ্যম তা যাচাই না করেই শিরোনামে তুলে আনে। “১৫ লাখ টাকার গরু”, “৩৭ লাখ টাকার বস”, “কোটি টাকার ষাঁড়”—এসব শিরোনাম পাঠক-দর্শকের কৌতূহল বাড়ায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দাম কি সত্যিই বাজারমূল্য, নাকি কেবল প্রচারণার কৌশল? পশুটি শেষ পর্যন্ত কত দামে বিক্রি হলো? ক্রেতা কে? লেনদেন বাস্তব ছিল, নাকি আলোচনার জন্য দাম হাঁকা হয়েছিল? এসব প্রশ্ন সাধারণত অমীমাংসিত থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দামটি তথ্যের চেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন হয়ে ওঠে।
এ ধরনের দামের অতিরঞ্জন বাজারেও প্রভাব ফেলে। সাধারণ ক্রেতা মনে করতে পারেন, কোরবানির বাজার অস্বাভাবিকভাবে চড়া।
অঘটন-ঘটন পটিয়সী ছাগলকাণ্ড
অনেক সময়ে এই ভাইরাল কনটেন্ট অবশ্য কেবল হাসাহাসিতে শেষ হয় না। কখনও কখনও সেখান থেকেই বড় প্রশ্ন উঠে আসে। সাম্প্রতিক সময়ের বহুল আলোচিত ‘১৫ লাখ টাকার ছাগলকাণ্ড’ তার একটি উদাহরণ।
ঈদের বাজারে আভিজাত্য প্রদর্শনের অংশ হিসেবে এক তরুণের দামি খাসি কেনার খবর যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, তখন প্রথমে সেটিও ছিল ভিউ-নির্ভর কনটেন্ট।
একজন সাংবাদিক ভাবলো, “ভাইরে, ছাগলের দাম ১৫ লাখ হলে ক্রেতার বাবার বেতন কত?” সেই এক ছাগল থেকেই বেরিয়ে এল এনবিআরের বড় কর্তা মতিউর রহমানের দুর্নীতির পাহাড়। এই ‘ছাগলকাণ্ড’ শুধু বিনোদন ছিল না, এটি ছিল ক্ষমতার দর্পের প্রতীক। অনেকে রসিকতা করে বলেন, ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের সলতে পাকানোতে ওই সাদা ছাগলটির ‘ঐতিহাসিক অবদান’ রয়েছে।
ডিজিটাল তামাশা নয়, চাই সাংবাদিকতা
কোরবানির মূল দর্শন অহংকারের বিসর্জন। কিন্তু আমাদের সিজনাল সাংবাদিকতা আর সোশ্যাল মিডিয়া একে বানিয়ে দিয়েছে অহংকারের প্রদর্শনী। কে কার চেয়ে দামি পশু কিনল? কার গরুর নাম বেশি ভাইরাল—এই প্রতিযোগিতায় ত্যাগের সেই শান্ত সমাহিত ভাবটি হারিয়ে গেছে।
পরের বার যখন টিভি স্ক্রিনে দেখবেন কোনো সাংবাদিক একটি গরুর নাকের সামনে বুম ধরে জানতে চাইছেন, “মেসি সাহেব, আপনার দাম কি এবার ৫০ লাখ হবে?”—তখন হাসবেন ঠিকই, কিন্তু মনে রাখবেন, এই তামাশা আসলে আমাদের সাংবাদিকতার দৈন্য আর সমাজের অগভীর রুচিকেই তুলে ধরছে। আর বৃহদাকায় পশুর সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি তোলার সময় আপনার কি কখন মনে হয় আপনিও এই তামাশার অংশ।
দিনশেষে, সেই ছাগলের মতো কোনো একদিন হয়তো আমাদের এই মিথ্যে আভিজাত্যের বুদবুদও ফেটে যাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত, হ্যাপী ভাইরাল কোরবানি!
বদরুল হাসান: উন্নয়ন ও মানবিক নীতিবিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- কোরবানি
- পশু
- পশুর হাট
- সংবাদমাধ্যম
- সামাজিক মাধ্যম
