ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ট্রাম্পের কারণে চীন-রাশিয়া সম্পর্ক আগের চেয়েও শক্তিশালী

ট্রাম্পের কারণে চীন-রাশিয়া সম্পর্ক আগের চেয়েও শক্তিশালী
×

চীন সফরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন

লিওনিড রাগোজিন

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ১৭:৫০

২০২৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার কয়েক দিন আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া ও চীনকে ‘বিচ্ছিন্ন’ করার অঙ্গীকার করেন। শুধু তাই নয়, এসময় তিনি পূর্বসূরি জো বাইডেনকে তাদের আরও কাছাকাছি টেনে আনার জন্য অভিযুক্ত করেন। কিন্তু তার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড প্রকৃতপক্ষে তার পূর্বসূরিদের সেইসব নীতিরই অনুরূপ, যা রুশ-চীনা জোটকে উৎসাহিত করেছে।

এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, ট্রাম্পকে আপ্যায়ন করার মাত্র কয়েক দিন পরেই চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাঁর রুশ প্রতিপক্ষ ভ্লাদিমির পুতিনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মনে হচ্ছে, শি-ট্রাম্প শীর্ষ সম্মেলনের ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে দুই নেতা এই বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন, যেখানে তাঁরা নিজেদের মধ্যে কুশল বিনিময় ও সমন্বয় করবেন।

ইরান যুদ্ধ রুশ-চীনা সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী প্রেরণা জুগিয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চীন রাশিয়ার তেল ও গ্যাস সরবরাহের ওপর মারাত্মকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আর এর ফলে মস্কো তার কোষাগার পূর্ণ করতে ও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত তহবিল পেতে সক্ষম হয়।

চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। আশা করা হচ্ছে যে, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা আরও বাড়বে। আর পুতিন তাঁর সফরের আগে উল্লেখ করেছেন, তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রে ‘একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হবে।
ইতোমধ্যে গত বছর সেপ্টেম্বরে—ইরানের ওপর ইসরায়েলি হামলার তিন মাস পর—চীনা কোম্পানিগুলো রাশিয়ার সঙ্গে একটি সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে। এতে জ্বালানি জায়ান্ট গ্যাজপ্রমের সঙ্গে দুটি পাইপলাইনের মাধ্যমে রুশ গ্যাস আমদানি ৪৮ বিলিয়ন ঘনমিটার থেকে বাড়িয়ে ৫৬ বিলিয়ন ঘনমিটার করার কথা বলা হয়েছে।  দীর্ঘ-বিলম্বিত ‘পাওয়ার অফ সাইবেরিয়া ২’ গ্যাস পাইপলাইনটি আবারও আলোচনার টেবিলে এসেছে। চীনা যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তির অব্যাহত রপ্তানি রাশিয়ার সামরিক শিল্পকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের চাহিদা মেটাতেও সাহায্য করেছে।

বেইজিং ও মস্কোর মধ্যে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এই মুহূর্তে যা তাদের সত্যিই একত্রিত করছে তা হলো মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব এবং বাকি বিশ্বের জন্য এর সৃষ্ট বিপদ সম্পর্কে তাদের অভিন্ন বিশ্লেষণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি দুর্বৃত্ত ও মৌলিকভাবে স্বেচ্ছাচারি বলয় হিসেবে দেখার ধারণাটিই স্বাভাবিকভাবে তাদের একত্রিত করছে।

কিন্তু পরিস্থিতি সবসময় এমন ছিল না। কয়েক দশক আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন; তাছাড়া দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মধ্যকার মতপার্থক্যকে কাজে লাগাতে সফলও হয়েছিল। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিপর্যয়ের কারণে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে একটি সমঝোতায় আসতে চেয়েছিলেন এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি দেশটিকে সংস্কারের দিকে আলতোভাবে ঠেলে দেন, যা দেশটিকে আমূল বদলে দিয়েছিল। দীর্ঘমেয়াদে উভয় কৌশলই মার্কিন কূটনীতির জন্য ব্যাপক সাফল্য হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল। এর ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন উভয় দেশেই শান্তিপূর্ণভাবে এমন রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় যা মার্কিন স্বার্থের জন্য অনেক বেশি সহায়ক ছিল।

আজ ইরানের উপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার ফলে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ এবং দেশটির নেতাদের গুপ্তহত্যা মস্কো ও বেইজিংকে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পৃথক চুক্তি এড়াতে জোরালোভাবে প্রেরণা যোগাচ্ছে। একই মনোভাব ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান রূপের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, যাকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী বা ডেমোক্র্যাটদের পুতুল হিসেবে দেখে।

ট্রাম্পের মনোযোগের স্বল্পতার কথা বিবেচনা করলে তিনি হয়তো মনেই করতে পারবেন না যে, তিনি একসময় চীন ও রাশিয়াকে বিভক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অবশ্যই দেশ দুটি বিষয়টি ভালোভাবেই মনে রেখেছে। ট্রাম্পের সফরের পরপরই পুতিনকে শি-এর আমন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি শক্তিশালী সংকেত যে, রুশ-চীনা জোট আগের চেয়েও বেশি শক্তিশালী।

লিওনিড রাগোজিন: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×