ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

ডিজিটাল আসক্তির বিপদ

ডিজিটাল আসক্তির বিপদ
×

মাহজাবিন আলমগীর

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

ডিজিটাল আসক্তি হলো স্মার্টফোন, ইন্টারনেট বা সামাজিক মাধ্যমের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার; যা দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যে ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। স্মার্টফোন আমাদের জীবনযাত্রাকে যেমন অনেক সহজ করে দিয়েছে, জ্ঞানের নতুন ভান্ডার উন্মোচন করেছে, পাশাপাশি শিশুর জন্য নিয়ে এসেছে এক ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ। সমকালে প্রকাশিত এক গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, রাজধানী ঢাকার শিশুরা দিনে পাঁচ ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটায়।  

একটা সময় ছিল যখন শিশুরা খেলাধুলায়, গল্পের বইয়ের পাতায় ডুবে থাকত, ছবি আঁকা বা কোনো সৃজনশীল কাজে অবসর কাটাত। আজ তারা স্ক্রিনে এতটাই মগ্ন যে তাদের কল্পনাশক্তি, প্রাণচাঞ্চল্য যেন হারিয়ে যাচ্ছে। যেসব শিশু স্ক্রিনে অত্যধিক সময় কাটায়, তাদের মাথাব্যথা, চোখের সমস্যা এসব তো আছেই, মনোযোগের অভাবও চরম। শিশুরা ফোনে যখন কোনো ধ্বংসাত্মক গেম দেখে, তখন তাদের মস্তিষ্কে কোপমিনো সিক্রেয়েশন বেড়ে যায়। ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে তারা মজা পায়, গেমসের নানা ধ্বংসাত্মক দৃশ্য তাদের সহিংস আচরণে উদ্বুদ্ধ করে তোলে। সমাজে শিশু-কিশোরদের মাঝে আজ হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডগুলো যে বেড়ে গেছে, তার অন্যতম কারণও এগুলো। মেজাজ রুক্ষ ও খিটখিটে হয়ে আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়। 

শিশু-কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হেলাল উদ্দীন আহমেদ মনে করেন, যুগের প্রয়োজনে প্রযুক্তি বা ডিভাইস ব্যবহার থেকে শিশুকে দূরে রাখা সম্ভব নয়। করোনা পরবর্তীকালে আমাদের সবার মাঝেই ডিভাইস ব্যবহার বেড়েছে। কিন্তু অভিভাবকদের উচিত শিশুর স্ক্রিন টাইম নির্দিষ্ট করে দেওয়া, আবার ইন্টারনেটের পর্নোগ্রাফিক সাইট শিশু যে ফোন ব্যবহার করে, তাতে বন্ধ রাখতে হবে। শিশু হোয়াটস অ্যাপ বা মেসেঞ্জার চ্যাটে যেন তীব্রভাবে আসক্ত হয়ে না পড়ে, সে জন্য অভিভাবকদের তার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে ভার্চুয়াল পৃথিবী কখনোই বাস্তব পৃথিবীর বিকল্প নয়। 
শিশুদের জন্য অনলাইনে যে কনটেন্টগুলো তৈরি হয়, তা দ্রুত পরিবর্তনশীল, উচ্চশব্দ যুক্ত, সহজেই তাদের আকর্ষণ করে। এতে মূল টার্গেটই থাকে শিশুর মনোযোগ সার্বক্ষণিক সেখানে ধরে রাখা। শিশুরা অল্পতেই এতে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এবং নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। দেখা যায় কোনো শিশু হয়তো আধা ঘণ্টার জন্য এসব কনটেন্টে ঢুকেছে, অথচ ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানেই পার হচ্ছে, তারা যে আসক্ত হয়ে পড়েছে তা বুঝতে পারে না। 

স্ক্রিনে অতিরিক্ত সময় কাটানো মস্তিষ্কে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমাদের মস্তিষ্কের যে অংশ চিন্তাভাবনা, শেখা, কর্মপরিকল্পনা বা স্মৃতিশক্তির জন্য দায়ী, সেই অংশের ‘গ্রে ম্যাটার’ অনেকটা কমে যায়। ‘গ্রে ম্যাটার’ হলো মস্তিষ্কের সেই অংশ, যেখানে নিউরনের কোষদেহ জমা থাকে। এর সংকোচন বা হ্রাস পেলে শিশুর বুদ্ধিমত্তায় ব্যাপক প্রভাব ফেলে, শিশু শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। পড়ালেখায় অমনোযোগী হয়ে পড়ে। 

এই অবস্থা থেকে মুক্তিতে আজকের দিনে প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত শিশুর জন্য ডিজিটাল ডায়েট তৈরি করে দেওয়া। ডিভাইসের ব্যবহার সীমিত রাখতে হবে। বিছানা, ডাইনিং টেবিল এলাকাগুলো ডিভাইস ফ্রি জোন করা উচিত। ফোনের যে অ্যাপসগুলো শিশুর অক্ষরজ্ঞান, শব্দজ্ঞান, সৃজনশীল মেধার বিকাশ ঘটায়, সেই অ্যাপসগুলো সক্রিয় রাখতে হবে। অন্তত ১৬ বছরের আগে শিশুর নিজস্ব স্মার্টফোন দেওয়া উচিত হবে না–জরুরি প্রয়োজন ছাড়া। আর ডিভাইস ব্যবহারের সময় অভিভাবকের নির্দিষ্ট করে দেওয়া উচিত। 
মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত সময় কাটানো তাদের মস্তিষ্কে ডোপামিন দ্রুত নিঃসরণ ঘটে, আর ঘন ঘন নিঃসরণ ঘটলে তারা স্ক্রিনে থাকতেই আনন্দ পায়। বাস্তব জীবনকে তখন একেবারে নীরস মনে হয়। তাই অভিভাবকদের সচেতনতা অতি জরুরি। প্রযুক্তি বর্জন নয়, বরং এর সুষ্ঠু ব্যবহারই বয়ে আনতে পারে শিশুর জন্য আশীর্বাদ। 

মাহজাবিন আলমগীর: শিক্ষক

আরও পড়ুন

×