অন্যদৃষ্টি
প্রয়োজন জ্বালানি মিশ্রণ
মো. আমিনুর রহমান খান
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত আবারও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। ইরান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর এটিই তেলের সর্বোচ্চ দাম। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিস্থিতি কেবল তাৎক্ষণিক চাপ নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার স্পষ্ট স্মারক।
এই বাস্তবতায় ‘এনার্জি মিক্স’ বা জ্বালানি মিশ্রণের ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহজভাবে বলতে গেলে, একটি দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত সব উৎসের পরিকল্পিত ও ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয়ই হলো এনার্জি মিক্স। এতে তেল, গ্যাস ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানির পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তি এবং সৌর, বায়ু ও জলবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য উৎস অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানির প্রায় ৯২ শতাংশই আমদানি করতে হয়। একই সময়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় ব্যয়বহুল এলএনজির ওপর নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ ২৭০ কোটি ঘনফুটের বেশি নয়। এই ঘাটতি শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও কৃষি– সব খাতেই চাপ বাড়াচ্ছে।
বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ একটি ভারসাম্যপূর্ণ এনার্জি মিক্স গড়ে তুলছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক জ্বালানির প্রায় ৮০ শতাংশ এখনও জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে আসে। তবে নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক শক্তির অংশ ক্রমেই বাড়ছে। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক ও উরুগুয়ের মতো দেশ নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ালেও অন্যান্য উৎসের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে সরবরাহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। ফলে কোনো একটি উৎসে সংকট দেখা দিলেও পুরো ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যাটি হলো, আমরা এখনও একটি কার্যকর জ্বালানি মিশ্রণ গড়ে তুলতে পারিনি। গত পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ খাতে আমদানিনির্ভরতা ৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাও মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন ব্যয় এবং কৃষি খরচে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। দেশে ১০ লাখের বেশি শ্যালো টিউবওয়েল এবং বিপুলসংখ্যক ডিপ টিউবওয়েল ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়লে খাদ্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এ প্রেক্ষাপটে এলপিজি আমদানিতে একক ঋণগ্রহীতার সীমা শিথিলের সিদ্ধান্ত স্বল্প মেয়াদে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য, ব্যাংক ঋণের গুণগত মান এবং মূল্য নির্ধারণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে রেফারেন্স প্রাইস থাকলেও প্রিমিয়াম অংশ সবসময় সমানভাবে স্বচ্ছ নয়। তাই কার্যকর নজরদারি ও সমন্বিত নীতি প্রয়োজন।
সমাধান একক কোনো উৎসে নয়, বরং পরিকল্পিত এনার্জি মিক্সে। বর্তমান প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সক্ষমতায় শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে পুরো চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। আবার পুরোপুরি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ব্যবস্থাও দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নয়। তাই গ্যাস, নবায়নযোগ্য, পারমাণবিক শক্তি এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য উৎসের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করতে হবে।
এখানে পারমাণবিক শক্তির গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি হলেও এটি কয়েক দশক ধরে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বাংলাদেশে অন্তত পাঁচ হাজার মেগাওয়াট পারমাণবিক সক্ষমতা গড়ে তোলা গেলে আগামী ৫০ বছরের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বেসলোড নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। উন্নত দেশগুলোতে নবায়নযোগ্য শক্তির পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তিকে এই কারণেই কৌশলগতভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে, আমদানি ব্যয় হ্রাস পাবে এবং শিল্প খাতের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ব্যয়ও কমবে।
মো. আমিনুর রহমান খান:
চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার, এনার্জিপ্যাক পাওয়ার
জেনারেশন পিএলসি
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
