সমাজ
সামষ্টিক বিবেকের কাছে প্রশ্ন
আহমদ এনায়েত মনজুর
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশুকে যে পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তা মূলত আমাদের সমাজ কাঠামোর চরম নৈতিক ধস, মনস্তাত্ত্বিক বিকার এবং এক গভীর আত্মিক দেউলিয়াত্বের নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশ। এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার প্রতি অশনিসংকেত।
ক্ষোভের পণ্যকরণ বনাম কাঠামোগত উদাসীনতা
উক্ত হত্যার পর ফেসবুক বা অন্যান্য ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম ক্ষোভে ফেটে পড়েছে। প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। কিন্তু এই ক্ষোভের আয়ু অল্পদিন। স্ক্রিনের অবিরত নতুন নতুন তথ্যের ভিড়ে কিছুদিনের মধ্যেই আমরা আরেকটি নতুন বিষয় নিয়ে মেতে উঠি এবং পুরোনো নির্মমতাকে ভুলে যাই। এই ভার্চুয়াল প্রতিবাদ অনেক সময় আমাদের নিজেদের ভেতরের আসল কাঠামোগত দায় থেকে এক ধরনের ছদ্ম-মুক্তি দেয়। অপরাধের সংস্কৃতিকে আড়াল করে দীর্ঘস্থায়ী করার সুযোগও করে দেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের ‘সহানুভূতির ক্লান্তি’।
প্রতিদিনের সংবাদপত্রে ক্রমাগত নৃশংসতার খবর পড়তে পড়তে নাগরিক সমাজ এখন এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক জড়তায় আক্রান্ত। অন্যায় দেখতে দেখতে তা যখন আমাদের চোখ-সওয়া হয়ে যায়, তখন সমাজের সহজাত প্রতিরোধ ক্ষমতাটাই ভেঙে পড়ে। পল্লবীর শিশুটির এই মর্মান্তিক পরিণতি আসলে আমাদের সেই অসাড়তা ভাঙারই এক সংকেত।
সমকালীন বিকার ও সহানুভূতির বিনাশ
মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে এই অপরাধ একজন মানুষের চরম মানসিক বিকৃতি ও ব্যক্তিত্বের ভয়াবহ স্খলনকে নির্দেশ করে। যখন একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের মনে একটি অবোধ শিশুর অসহায়ত্ব ও আর্তনাদ ন্যূনতম দয়া বা অপরাধবোধ জাগাতে ব্যর্থ হয়, তখন বুঝতে হবে, আমাদের চারপাশেই এমন কিছু মানুষরূপী দানব তৈরি হচ্ছে যারা ভেতর থেকে পুরোপুরি আবেগহীন ও মৃত।
আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক চিন্তায় এটি চরম দুর্বল ও অরক্ষিত সত্তার ওপর নিজের বিকৃত নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার এক পৈশাচিক প্রদর্শন। সমাজ যখন ব্যক্তিকে সুস্থ উপায়ে নিজের অস্তিত্ব প্রকাশের পথ দেখাতে ব্যর্থ হয়, তখন এসব বিকৃতমনা মানুষ সমাজ কাঠামোর সবচেয়ে দুর্বল অংশের (বিশেষ করে শিশু ও নারী) ওপর নিজের সব ক্ষোভ ও বিকৃতির হিংস্র বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
মন্দের স্বাভাবিকীকরণ ও অস্তিত্বের সংকট
আমাদের সমাজে ‘মন্দের স্বাভাবিকীকরণ’ এখন এক চাক্ষুষ সত্য। যখন কোনো সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তখন অপরাধীর মনে এই ধারণার জন্ম হয়– সে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাবে। খুনি সোহেল রানা যে ঠান্ডা মাথায় অপরাধ করার পর আত্মগোপনের চেষ্টা করেছে, তা এরই প্রমাণ যে, এই অপরাধীরা আমাদের ব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে কতটা নিশ্চিত।
আমাদের আধুনিক ভোগবাদী সংস্কৃতি মানুষকে আত্মিক সত্তা হিসেবে না দেখে এক ধরনের ‘ভোগের বস্তু’ হিসেবে দেখতে শেখাচ্ছে। শিশুটিকে নিজের বিকৃত ইচ্ছার বস্তু বানানো সেই মানবিকতারই চূড়ান্ত অবমাননা।
অন্তরের আলো বনাম বাহ্যিক আচার
ধর্মের মূল সুর যখন কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে আবদ্ধ, যেখানে আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটে না, তখন সমাজ আত্মাহীন হয়ে পড়ে। ইসলামের মূল দর্শন হলো মানুষের জান ও মালের হেফাজত। একইভাবে অন্য ধর্মেও অহিংসাকে বলা হয়েছে পরম ধর্ম। বৌদ্ধ ধর্মের ‘করুণা’ ও খ্রিষ্টধর্মের ‘নিষ্পাপ আত্মাকে ভালোবাসা’র যে শাশ্বত দর্শন– এই অপরাধী তা সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে নিজেকে প্রকৃতির চোখে অভিশপ্ত করে তুলেছে। পরকালের জবাবদিহি ও কর্মফলের অমোঘ বিধান থেকে এই খুনিদের নিষ্কৃতি নেই।
আমাদের অঙ্গীকার ও চূড়ান্ত দাবি
কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা বাহ্যিক বড় বড় অবকাঠামো কোনো সমাজকে সভ্য করে তোলে না, যদি সেখানে একটি ৮ বছরের শিশু রাতে নিরাপদে ঘুমাতে না পারে। আলোচ্য শিশুটির বিদেহী আত্মা আজ আমাদের সামষ্টিক প্রগতির সব অহংকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে গেছে।
খুনি সোহেল রানা দোষ স্বীকার করেছে। আমরা দাবি জানাই, কোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা বা আইনি মারপ্যাঁচ ছাড়াই দ্রুততম সময়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এই নরপশুর সর্বোচ্চ সাজা হোক এবং অনতিবিলম্ববে তা বাস্তবায়িত হোক। একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ পর্যন্ত আমাদের এই ক্ষোভ যেন সাময়িক ট্রেন্ডে হারিয়ে না যায়। ভুক্তভোগী পরিবারকে ন্যায়বিচার এনে দেওয়া এবং সমাজ থেকে এই মনস্তাত্ত্বিক বিকার দূর করাই হোক আমাদের আজকের সম্মিলিত শপথ।
আহমদ এনায়েত মনজুর: উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, পূবালী ব্যাংক পিএলসি
- বিষয় :
- সমাজ
