ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ঈদুল আজহা

হামের কালো মেঘের আড়ালে উৎসবের আলো

হামের কালো মেঘের আড়ালে উৎসবের আলো
×

আফসান চৌধুরী

আফসান চৌধুরী

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ০৬:৪৩ | আপডেট: ২৬ মে ২০২৬ | ০৬:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

সামাজিক ও ঐতিহাসিক বিবর্তনের অভিজ্ঞতা থেকে মনে করি, আমার ঈদ উদযাপন এখন বহুমাত্রিক। পারিবারিক ও পেশাগত কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং ভিন্ন সামাজিক পরিবেশে ঈদ করেছি। শহরের ঈদে যেমন আধুনিকতা, ব্যস্ততা ও আড়ম্বর বেশি দেখছি, তেমনি গ্রামের ঈদে আন্তরিকতা, পারস্পরিক যোগাযোগ ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া পেয়েছি। কোথাও ঈদ আনন্দের উৎসব, আবার কোথাও এটি পারিবারিক পুনর্মিলনের উপলক্ষ।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। আগে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ের প্রচলন বেশি ছিল। এখন প্রযুক্তির কারণে অনেক শুভেচ্ছাই সীমাবদ্ধ হয়েছে মোবাইল ফোন বা সামাজিক মাধ্যমে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার পার্থক্যও ঈদের আনন্দে ভিন্নতা তৈরি করে। তাই আমার কাছে ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং সমাজ, সংস্কৃতি ও সময়ের পরিবর্তনের একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা।

১৯৭১ সালের আগে এবং পরের ঈদ উদযাপনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। আমি এখানে প্রধানত শহুরে জীবনের কথাই তুলে ধরছি। এটাই আমার জীবনের অভিজ্ঞতা। স্বাধীনতার আগে শহুরে জীবনে একটা যৌথ বোঝাপড়া ছিল। তখন আমরা থাকতাম ঢাকার টিকাটুলীতে। সমাজটা ছিল অনেক বেশি পাকাপোক্ত ও শক্তিশালী। বন্ধু কে কিংবা শত্রু কে– এ নিয়ে আমাদের সামষ্টিক বোঝাপড়া ছিল। 
এ সংক্রান্ত একটা ঘটনা মনে পড়ছে। একদিকে যুদ্ধ চলমান, অন্যদিকে ঈদ উদযাপন; তবে স্বাভাবিকভাবে উদযাপনের পরিস্থিতি ছিল না। এমন একটি মুহূর্তে এক হিন্দু পরিবার আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। আম্মার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা আমার লোক’। মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ববর্তীকালে আমাদের পরিচয়ের কোনো সংকট ছিল না এবং গোষ্ঠী পরিচয় প্রধান ছিল। জীবনে তেমন জটিলতা ছিল না। সুফিয়া কামাল, সিকান্‌দার আবু জাফরের মতো মানুষ আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন। ফলে একাত্তরের আগে আমাদের ঈদ ছিল পাড়ার ঈদ। স্বাধীনতার পর এই আমেজ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করে। এই সংকট মূলত সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বয় ঘটাতে না পারার ব্যর্থতা। 

১৯৫৭ সালে পাঁচ বছর বয়সে আমি ভারতের শিলংয়ে ঈদ কাটিয়েছি। কী দারুণ মুহূর্ত! মেঘে ঢেকে যাচ্ছিল বাড়ির কিছু কিছু অংশ। তখন বাড়ির একজনকে বলতে শুনেছিলাম, মেঘ ঢুকে যেন ঈদের কাপড় নষ্ট করে না দেয়! এটি আমার বিস্ময়কর স্মৃতির মধ্যে একটি! ৮ বছর বয়সে ঈদের সময় নতুন পাঞ্জাবি চেয়ে পাইনি। এটি আরেকটি স্মৃতি। নিশ্চয় আনন্দের ছিল না। ঈদের সময় নতুন পাঞ্জাবি চাওয়াটাই তো স্বাভাবিক। তা ছাড়া বয়সের একটা ব্যাপার তো আছেই। এক ঈদে মা-বাবার সঙ্গে চকবাজার গিয়েছিলাম। দেখলাম এক আত্মীয় তাঁর স্ত্রীকে গহনা কিনে দিচ্ছিলেন। এগুলো ছোটবেলার ঈদ উদযাপনের খণ্ড খণ্ড স্মৃতি। এরই মধ্যে বহু বছর কেটে গেল। এবারের ঈদ আমার জীবনের ৭৫তম উদযাপন।   

স্বাধীনতার পর দেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে মৌলিক কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে এর প্রভাব আমাদের পরিবার ও ব্যক্তিজীবনে পড়েছে। জাতীয় জীবনে সংকট ও জটিলতা বেড়েছে। অস্থিরতা বেড়েছে, যে ধারা এখনও চলছে। গোষ্ঠীগত এবং পাড়ার ঈদ উদযাপনের মুহূর্তগুলো হারিয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনাগুলোর মধ্যেই আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি, বর্তমান জীবনযাপন ও রাষ্ট্রীয় নীতির সম্পর্কগুলো বিদ্যমান। 
বাংলাদেশের ঈদ উৎসব ধীরে ধীরে সামাজিক রূপ থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রূপে পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় ঈদ মানেই ছিল পাড়া-মহল্লাজুড়ে মিলনমেলা। ঈদের সকালে নতুন পোশাক পরে ছোটরা ঘরে ঘরে ঘুরত, বড়রা কোলাকুলি করতেন, আর প্রতিবেশীর দরজা ছিল সবার জন্য খোলা। সেই ঈদে সামাজিক বন্ধন ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দ। তখন ঈদের আগের রাতই ছিল ঈদের চেয়ে বেশি আনন্দের। তখনকার ঈদে ছিল কয়েকটি পর্ব। কাপড় বানাতে দেওয়া, চুল কাটানো, রান্নার প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে শুরু হতো উদযাপন। আমাদের বাড়িতে দর্জি আসতেন কাপড়ের মাপ নিতে। চুলও কাটাতে হতো বাড়িতে। একবার ঈদের আগের রাতে ১১টায় বাসায় ঢুকে দেখি আমার নানা আর নানি বাড়ির সবার জন্য রান্না করছেন। 

বিভিন্ন কারণে ঈদের চিত্র এখন অনেকটাই বদলেছে। মানুষ ক্রমেই পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। আত্মীয়তা ও প্রতিবেশী সম্পর্কের জায়গায় ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ঈদের সময় খাবার নিয়ে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। এতে কিছু সংকটও আছে। এই সংকট যেমন মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে, তেমনি স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও। আগে পরিবারের সবাই ঈদে একই খাবার খেতেন। যিনি রান্না করতেন তিনি জানতেন, সবাই কী খাবে। এখন অনলাইনে খাবার অর্ডার হয়। মানুষের ব্যক্তিত্বের বিচ্ছিন্নতার একটি দিক এতে স্পষ্ট। আবার বাইরের খাবারের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও বাড়ছে।
তবে এসব পরিবর্তনকে শুধু নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে; নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত পরিসরের প্রয়োজনও বেড়েছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়– ঈদের মূল শিক্ষা কি কেবল পরিবারে সীমাবদ্ধ, নাকি সমাজজুড়ে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই এর প্রকৃত সৌন্দর্য? ঈদের ঐতিহ্য ও মানবিক বন্ধন টিকিয়ে রাখতে হলে আবারও পারস্পরিক যোগাযোগ, প্রতিবেশী সম্পর্ক ও সামাজিক সম্প্রীতির সংস্কৃতি জাগিয়ে তুলতে হবে।

এই মাসজুড়ে আমরা হামের প্রকোপে অসংখ্য শিশুর মৃত্যু দেখছি। অন্যান্য অপরাধ তো বেড়েই চলেছে। কিন্তু আশি-নব্বইয়ের দশকে হামসহ অন্যান্য রোগের টিকাদান কর্মসূচি দারুণভাবে সফল হয়েছিল। এই সফলতার কারণ ছিল সমাজ কাঠামো। অর্থাৎ সমাজের কারণে টিকাদান কর্মসূচি সফল হয়েছিল; মন্ত্রণালয়ের জন্য নয়। গ্রামে মাতব্বরের বাড়ি টিকাকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, যা এখন উল্লেখযোগ্যভাবে তা কমে এসেছে। আশি-নব্বইয়ের দশকের মতো সফল টিকাদান কর্মসূচি এখন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এবারের ঈদে হামের একটা প্রভাব আমাদের জীবনে পড়বে। ভয় ও আশঙ্কা নিয়ে ঈদ উপযাপনের উদ্দেশ্যে অনেকে গ্রামের বাড়ি ফিরছেন। করোনার সময় অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু তখন সব বয়সের মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সে তুলনায় এবারের হামে শুধুই শিশুদের মৃত্যু অনেক বেশি ভারিহয়ে উঠেছে। শত শত পরিবারের এবার ঈদ হওয়ার কথা ছিল নতুন শিশুকে নিয়ে বিশেষ আনন্দের। তাদের জন্য কেমন হতে চলেছে এবারের ঈদ– আমরা ধারণা করতে পারি। মানুষের মনে বিষণ্নতা তৈরি হয়েছে শিশুদের মৃত্যুতে। ঈদ যেন হামের কালো মেঘে আচ্ছন্ন!

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় কাঠামো বিস্তৃত হলেও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় সক্রিয়তা বাড়েনি। ফলে নাগরিক প্রত্যাশা ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। সমাজে শিক্ষা, প্রযুক্তি, নগরায়ণ ও নাগরিক সচেতনতা দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু প্রশাসন, আইন প্রয়োগ ও জনসেবার মান অনেক ক্ষেত্রে সেই গতিতে উন্নত হয়নি। এর প্রভাব পড়ছে সামাজিক আস্থা, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের ওপর।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা রাজনীতিকেন্দ্রিক আলোচনায় এত বেশি নিমগ্ন, সমাজের মৌলিক সংকটগুলো প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে সামাজিক মূল্যবোধ, মানবিকতা, পারিবারিক বন্ধন, সংস্কৃতি ও নাগরিক দায়িত্ব নিয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা কম হচ্ছে। অথচ একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে ওঠে সুস্থ সমাজের ভিত্তির ওপর।

আফসান চৌধুরী: প্রাবন্ধিক ও গবেষক 

আরও পড়ুন

×