ঈদুল আজহা
নদীর দেশে ঈদের উৎসব
প্রতীকী ছবি
শেখ রোকন
প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬ | ১৩:২২ | আপডেট: ২৮ মে ২০২৬ | ১৩:৪৩
প্রাচীন পূর্ববঙ্গে তথা আজকের বাংলাদেশে ইসলাম এসেছিল নদীপথে; মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদও তাই। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত পলিমাটির উর্বরতা ও প্রতুলতা যে কৃষকদের প্রধান পেশাজীবী সম্প্রদায় করে তুলেছিল, তারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল সবার আগে। অন্যান্য সম্প্রদায়, যেমন জেলেরা নতুন ধর্ম গ্রহণের বদলে যত সহজে জাল ও নৌকা নিয়ে নদীপথে আরও ভাটিতে চলে যেতে পারতো, ভূমিসর্বস্ব কৃষকের পক্ষে সেটা সম্ভব ছিল না। যে কারণে, তারা যেমন দলে দলে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিল, তেমনই দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণেও দ্বিধা করেনি। সে কারণেই কি ঈদের উৎসবে মাছের বদলে মাংসের কদর?
ঈদ উৎসবের প্রধান খাদ্যও মরুর দেশের খেজুর, খোরমা, রুটি থেকে নদীর দেশে এসে পানিবহুল সেমাই, ফিরনি, পায়েসে রূপান্তরিত হয়েছিল। আর ঈদুল আজহায় পশু কোরবানির ক্ষেত্রে আরবের উট-দুম্বার জায়গা দখল করে গরু-ছাগল। বাণিজ্যিকভাবে পশু পালন শুরুর আগে বাঙালি মুসলমান কৃষক ঘরেই লালিত গরু বা ছাগল কোরবানি দিত। ঈদুল আজহা সামনে রেখে গৃহপালিত পশুর সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের মায়া ও মমতার পরীক্ষা উপস্থিত হতো। উৎসব ও উৎকণ্ঠার এই সম্পর্ক হয়ে উঠেছিল গত শতাব্দির বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান উপজীব্য। এখনও প্রতিবছরই কোনও না কোনও কোরবানি পশুর হাটে কৃষক ও গরুর অনিবার্য বিচ্ছেদ সামাজিকমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমের ‘ভাইরাল আইটেম’ হয়ে ওঠে।
বাঙালি মুসলমান কৃষকের ঘরের গরু কেবল কোরবানির জন্য ছিল না, বলা বাহুল্য। লাঙ্গল-জোয়াল-কাতারি কাঁধে গরু হয়ে উঠেছিল কৃষকের চাষের সঙ্গী, দুই চাকার গাড়িতে পরিবহনের মাধ্যম, ধান মাড়াইয়ের ভরসা, ঘানিতে তেল ভাঙানোর ‘কলুর বলদ’। যখন কাঠের বদলে কলের লাঙল, গরুর গাড়ির বদলে ডিজেল চালিত ট্রাক্টর, পদচালিত মাড়াইয়ের বদলে হার্ভেস্টিং মেশিন, ঘানির বদলে তেল ভাঙানোর যন্ত্র আসতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে গরুর উপযোগিতা সীমিত হতে থাকে। গরুর গোবর যে প্রাকৃতিক সার ও কিষাণীর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো, রাসায়নিক কৃষির দাপটে সেটাও ফুরিয়ে যায়। প্রয়োজনও কমতে কমতে কেবল দুগ্ধ ও মাংস দানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
গরুর বহুমাত্রিক উপযোগিতা কমার মাধ্যমে ঘরে ঘরে গরু পালনও যখন কমতে থাকে, তখন কোরাবানির পশুর হাটে ক্রমেই বাড়তে থাকে ‘ভারতীয় গরু’।
এক পর্যায়ে, ২০১৫ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরপরই দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘গরু পাচার’ বন্ধে রীতিমত যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে কোরবানি হওয়া ৫০-৫৫ লাখ গরুর প্রায় অর্ধেকই আসতো সীমান্ত পেরিয়ে। ওই ঘোষণার পর অনেকে চিন্তিত হয়েছিলেন যে, ভারতীয় গরু ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারবে তো? কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে সীমান্তে যত কড়াকড়ি দেখা গেছে, গরুর দেশীয় উৎপাদন তত বেড়েছে। যেমন, বিজেপি সরকারের ঘোষণার আগের বছরগুলোতে যেখানে গড়ে ২১ লাখ ভারতীয় গরু বাংলাদেশে আসতো, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সেটা ১৪ লাখে এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সাড়ে ১১ লাখে নেমে আসে।
বলা বাহুল্য, গত কয়েক বছরে সেটা আরও কমে আসে। যেগুলো আসতো, তার নেপথ্যেও ছিল মূলত বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্যগুলোর গরু উৎপাদনকারী বা ব্যাপারিদের সঙ্গে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর যোগসাজস। অন্যথায়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনেই কোরবানির গরুর শতভাগ চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল।
গত এক দশকে ত্রিপুরা, আসামের রাজ্য সরকারে বিজেপি আসার পর সেটাও কমে গিয়েছিল। এবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারেও বিজেপির বিজয়ের পর বাংলাদেশের কোরবানির পশুর হাটে ভারতীয় গরুর আগমণ কার্যত শূন্য। গত কয়েকদিনের সংবাদমাধ্যম ঘেঁটে দেখছি, একেবারে সীমানতবর্তী কয়েকটি হাটে ভারতীয় গরুর আনাগোনা দেখা গেছে। সেগুলোও সীমান্তের দুই পাড়ের স্থানীয় চাহিদা ও সরবরাহ তত্ত্ব মেনে। সেই গরু আগের মতো ট্রাকে করে দেশের বিভাগীয় শহরগুলো পর্যন্তও আসেনি; রাজধানীর হাট-বাজার তো দূরের কথা।
বস্তুত, দেশীয় গরু পালনের সুবিধা কেবল কোরবানিতে মেলে না। অভ্যন্তরীণভাবে গরু পালন বেড়ে যাওয়ায় মাংসের চাহিদার পাশাপাশি গত এক দশকে দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদনও বেড়েছে। এটা ঠিক, জনবহুল ও উর্বর ভূমির বাংলাদেশে গোচারণের জন্য আলাদা ভূমির সংকট রয়েছে। কিন্তু সারাদেশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরগুলো এক্ষেত্রে ভরসা হয়ে উঠেছে। পতিত ঘেসো জমি হয়ে উঠেছে উৎপাদনমুখর। লাভের মুখ দেখতে পাওয়ায় অনুমিতভাবেই এগিয়ে এসেছেন ক্ষুদ্র কৃষক ও উদ্যোক্তারা।
দিন দুয়েক আগে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে ছিলাম। দেখে ভালো লাগছিল যে, বড় বড় নৌকা ভরে যেসব গরু সেতুর নিচ দিয়ে পরিবহন হচ্ছে, সেগুলো আকারে খানিকটা ছোট। এক দশক আগের মতো বড় সিং, বড় পায়ের ভারতীয় গরু নয়।
ক্ষদ্র অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণে আগেও লিখেছি, দেশীয় গরুর উৎপাদন ও বাজার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশেরই বরং উচিত সীমান্ত সীল করে দেওয়া, যাতে ভারতীয় গরু ঢুকতে না পারে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে একদা কৃষকের ঘরে ঘরে যে ‘গোয়ালভরা গরু’ প্রবাদ হয়ে উঠেছিল, সেটা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
নদীর দেশে ঈদের উৎসব সুচারু করতে এখন প্রয়োজন কেবল সুশৃঙ্খল কোরবানি প্রক্রিয়া। মনে আছে, ২০১৬ সালে ঈদুল আজহায় চার ‘ধ্রুপদী’ বিষয়- বনের পশু, মনের পশু, মহাসড়কের যানজট, রাজধানীর বর্জ্য অপসারণ- ছাপিয়ে সামাজিকমাধ্যম দখল করে নিয়েছিল ‘রক্তের নদী’। সেবার ঈদুল আজহা ছিল শরৎকালের মাঝামাঝি, আকস্মিক বৃষ্টিপাতে সড়কে-গলিতে পানি জমে ওই পরিস্থিতি হয়েছিল। এবার ঈদুল আজহা যদিও পঞ্জিকামতে গ্রীষ্মকালে, বর্ষার ঘনঘটা ইতিমধ্যেই দেখা দিয়েছে। কোরবানির পশুর রক্ত ব্যবস্থাপনায় সেজন্য দিতে হবে বাড়তি নজর।
এই ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নাগরিকদেরই নিতে হবে। সিটি কর্পোরেশন তো গত কয়েক বছর ধরেই কোরবানির বর্জ্য অপসারণে দৃশ্যমান সাফল্য দেখিয়ে চলেছে। কিন্তু তারা গ্যারেজে গ্যারেজে গিয়ে তরল রক্ত ধরে রাখবে কীভাবে? আর সেই রক্ত যে নালা ও খাল বেয়ে রাজধানীর চারপাশের নদীতেই নেমে যায়, ভুলে যাওয়া চলবে না।
মনে রাখতে হবে, নদীমাতৃক এই দেশে শত শত বছর ধরে গরু কোরবানির প্রধান পশু হয়ে ওঠার নেপথ্যে নদী-সিঞ্চিত পললভূমির অবদান অবিচ্ছেদ্য। ঈদের উৎসব বিশেষত ঈদুল আজহার কোরবানির পশু উৎপাদন, পরিবহন, বাজারজাতকরণেও নদীর অবদান অবিস্মরণীয়। কেবল সামান্য সৃঙ্খলা ও সচেতনতার অভাবে কোরবানির পশুর রক্তে নদীগুলোর দূষণ আরও বাড়ানোর আশঙ্কা আমরা চাইলেই দূর করতে পারি।
মোট কথা, কোরবানি গরুর ক্ষেত্রে ভারত-নির্ভরতা কাটিয়ে বাংলাদেশ যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠলো, এর পেছনে নদ-নদীর অবদান যেন আমরা ভুলে না যাই।
নীতি, ব্যবস্থাপনা ও বাজার ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে নদীর চরে চরে গড়ে উঠতে পারে আরও খামার বা বাথান। সেখানে গরুর খাবার শহুরে খামারের মতো কিনতে হবে না বলে উৎপাদন খরচ অনেক কমে আসবে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়েও দুধ ও মাংস রপ্তানি করে বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার সুইজারল্যান্ড।
বস্তুত ব-দ্বীপ মানেই গবাদি পশু পালনের সুবর্ণভূমি। কিন্তু বাংলাদেশে নদীর এসব সম্ভাবনা বরাবর উপেক্ষিত। বরং নদীমেরে ফেলার সম্ভাব্য সব আয়োজন সম্পন্ন। কোরবানি পশুর ক্ষেত্রে নদীর অবদান মনে রেখে হলেও আমরা যেন নদী দূষণ থেকে বিরত থাকি। ঈদ মোবারক, সবাইকে নদীময় শুভেচ্ছা!
শেখ রোকন: লেখক ও নদী-গবেষক
[email protected]
