ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নিরাপদ মাতৃত্ব হোক সবার অঙ্গীকার

নিরাপদ মাতৃত্ব হোক সবার অঙ্গীকার
×

ফাইল ছবি

মঞ্জুন নাহার

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৬ | ২২:৫৮

মাতৃস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, মাতৃমৃত্যু হ্রাস এবং নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতি বছর ২৮ মে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস পালন করা হয়। একটি সুস্থ মা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো সমাজ ও জাতির উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি। তাই মাতৃত্বকে নিরাপদ করা শুধু স্বাস্থ্যগত বিষয় নয়, এটি মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং টেকসই উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশ গত দুই দশকে মাতৃস্বাস্থ্য উন্নয়নে উলেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও এখনও বহু নারী গর্ভকালীন ও প্রসবজনিত জটিলতায় জীবন হারাচ্ছেন অথবা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছেন। তাই নিরাপদ মাতৃত্ব এখনো বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার, যদিও সামাজিক- সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যকে ‘মেয়েলি’ বিষয় হিসেবেই দেখা হয়।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় ৭৯ শতাংশ কমাতে সক্ষম হয়েছে, যা বৈশ্বিক গড় অগ্রগতির তুলনায় অনেক বেশি। এই অর্জনের পেছনে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম, দক্ষ ধাত্রী সেবা, কমিউনিটি ক্লিনিক, টিকাদান কর্মসূচি এবং নারীর স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির বড় ভূমিকা রয়েছে। তবে এই অগ্রগতি সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। দুর্গম চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নারীরা এখনও নিরাপদ মাতৃত্বসেবা থেকে পিছিয়ে আছেন।
 
বাংলাদেশে এখনও মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা, প্রসবকালীন জটিলতা এবং সময়মতো জরুরি সেবা না পাওয়া।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব মৃত্যুর বড় একটি অংশ প্রতিরোধযোগ্য যদি গর্ভবতী নারী সময়মতো দক্ষ স্বাস্থ্যসেবা পান। বর্তমানে দেশে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীর প্রয়োজনের মাত্র ৪১ শতাংশ পূরণ হয়েছে। ফলে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে দক্ষ ধাত্রী ও চিকিৎসকের সংকট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

পাশাপাশি বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৫১ শতাংশ মেয়ের বিয়ে ১৮ বছরের আগেই হয়ে যায়, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার ফলে কিশোরীরা দ্রত গর্ভধারণে বাধ্য হয়, যদিও তাদের শরীর ও মানসিক অবস্থা মাতৃত্বের জন্য প্রস্তুত থাকে না। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার কিশোরীর মধ্যে ১১৩ জন ১৯ বছর হওয়ার আগেই গর্ভধারণ করে। এছাড়া বিবাহিত কিশোরীদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা সেবার ব্যবহার কম এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের হার বেশি। অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ফলে অনেক নারী ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভপাত, অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা ও প্রসবজনিত জটিলতায় ভোগেন, যা মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় চার হাজার দুইশত নারী গর্ভধারণ ও প্রসবজনিত জটিলতায় মারা যান। তাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, কিশোরী স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং সহজলভ্য পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিত করা মাতৃমৃত্যুু কমানোর জন্য অত্যন্ত জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনও বর্তমানে মাতৃস্বাস্থ্যের জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানির ব্যবহার গর্ভবতী নারীদের উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে বন্যা, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক নারী জরুরি প্রসূতি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ মানবিক সংকটপূর্ণ এলাকাগুলোতেও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
 
নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, প্রত্যেক গর্ভবতী নারীর জন্য মানসম্মত ও সহজলভ্য গর্ভকালীন, প্রসবকালীন এবং প্রসবোত্তর সেবা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রত্যন্ত অঞ্চলে দক্ষ ধাত্রী ও জরুরি প্রসূতি সেবার বিস্তার ঘটাতে হবে। তৃতীয়ত, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ ও কিশোরী স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা সেবা, পুষ্টি সহায়তা এবং নারীর আর্থ-সামাজিক ক্ষমতায়ন বাড়াতে হবে।
 
সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, স্বাস্থ্যকর্মী, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম এবং পরিবারের সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে পুরুষদের সচেতন অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন মায়ের স্বাস্থ্য শুধু তার ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি একটি পরিবারের, সমাজের এবং জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।

নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- কোনো মা যেন অবহেলা, অজ্ঞতা বা সেবার অভাবে প্রাণ না হারান। একটি নিরাপদ মাতৃত্ব মানে একটি সুস্থ শিশু, একটি সুখী পরিবার এবং একটি সমৃদ্ধ জাতি। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি যেখানে প্রতিটি মা নিরাপদভাবে মাতৃত্বের স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন। নিরাপদ মাতৃত্ব  নারীর অধিকার, আর এই অধিকার বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ এখন সময়ের দাবি।

মঞ্জুন নাহার; মেরীস্টোপস বাংলাদেশের পার্টনারশীপ আন্ড ফান্ডরাইজিংয়ের প্রধান

আরও পড়ুন

×