সমকালীন প্রসঙ্গ
মহিষের খ্যাতি এবং সরকারের বিড়ম্বনা
অ্যালবিনো জাতের মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। ছবি: সমকাল
সাইফুর রহমান তপন
প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৬ | ১৪:৪৭
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খ্যাতির বিড়ম্বনা’ নাটকে কাঙালি নামক এক ব্যক্তির তোষামোদীর ফাঁদে পড়ে মিথ্যে খ্যাতি ধরে রাখতে গিয়ে উকিল দুকড়ি দত্ত বেশ জব্দ হয়েছিলেন। বাংলাদেশ সরকারও ‘সেলিব্রিটি মহিষ’ নিয়ে জব্দ না হলেও বেশ বিড়ম্বনায় পড়েছে বলা যায়।
এবারের ঈদুল আজহায় সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র ছিল একটি মহিষ। মালিক নিছক খেয়ালবশত মহিষটির নাম রেখেছিলেন ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রের সবচেয়ে খেয়ালি রাষ্ট্রপতির নামে। খেয়ালিপনায় সংঘটিত ইরান যুদ্ধও তাঁকে বাংলাদেশেরও ঘরে ঘরে আলোচনায় এনেছে। নারায়ণগঞ্জের রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে লালিত-পালিত ‘অ্যালবিনো’ মহিষটির মাথার সামনের বাদামী চুলের বিন্যাস ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় খামারিদের মনে তাই চট করেই আলোচ্য নামটি এসে থাকতে পারে।
বাংলাদেশে মূলত কালো বা ছাইরঙা মহিষই দেখা যায়। কিন্তু কালো রঙের পেছনে যে রঞ্জকের ভূমিকা প্রধান সেই মেলানিনের অভাবে ‘অ্যালবিনো’ মহিষের রঙ হয় সাদা বা গোলাপি মিশ্রিত সাদা। গোলাপি-সাদা গাত্রবর্ণের সঙ্গে বিশেষ হেয়ার স্টাইল মিলে মহিষটি হয়ে ওঠে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমার্থক। ইউটিউবারদের কল্যাণে মহিষটি দ্রুত হয়ে পড়ে টক অব দ্য কান্ট্রি। দেশীয় সংবাদমাধ্যম ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও জায়গা করে নেয়।
এতে সৃষ্টি হয় জটিলতাও। গোটা মে মাস মহিষটির সেলিব্রিটি ভাবমূর্তি সবাই বেশ উপভোগ করলেও, গোল বাঁধে সেই মাহেন্দ্রক্ষণে, মহিষটিকে যখন কোরবানি করার সময় আসে। হোক পশু, নামে তো সে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তির সমতুল্য। তাকে কোরবানি? ওয়াশিংটনে এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবেই সম্ভবত সরকার সক্রিয় হয়। উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়ে স্থানীয় থানায় নিয়ে আসা হয় মহিষটিকে। সেখান থেকে ঈদের পরদিন শুক্রবার খোদ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মহিষটিকে সসম্মানে চিড়িয়াখানায় রেখে আসেন।
প্রসঙ্গত, ‘সেলিব্রিটি মহিষ’ বিক্রি করে খামারির কিন্তু নগদ লাভ তেমন হয়নি। বরং টাকা কিছু কমই পেয়েছেন তিনি, বলা যায়। ডেলিভারি দেওয়ার সময় ওজন হয়েছিল ৬৯০ কেজি, সে হিসেবে ৫৫০ টাকা কেজিতে দাম হয়েছে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৫০০ টাকা (বাংলা ট্রিবিউন)। অথচ অন্য খামারিকে উদ্ধৃত করে সমকাল অনলাইন জানিয়েছে, প্রতি কেজি ১৩০০-১৪০০ টাকা ধরে অ্যালবিনো মহিষ বিক্রি হয়। খবরে প্রকাশ, কেরানীগঞ্জের এক ব্যবসায়ী গত রেজার ঈদের আগেই রাবেয়া ফার্মের কাছ থেকে মহিষটি কিনেছিলেন। সম্ভবত এ কারণেই ইতোমধ্যে মহিষটি তুমুল সেলেব্রিটি খ্যাতি পেলেও তা থেকে ফায়দা তুলতে পারেননি খামারি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, মহিষটির জন্য বিশেষ শেড প্রস্তুত করা হয়েছে। সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকেও অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। জনগণের অর্থের শ্রাদ্ধ করে এক মহিষ সংরক্ষণে এলাহি আয়োজন বটে।
সেলিব্রিটি মহিষ সরকারের জন্য কতটা বিড়ম্বনা তৈরি করেছে, তা আরও স্পষ্ট হয় এলাহি আয়োজনের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে দেওয়া প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে। তিনি বলেছেন, অ্যালবিনো মহিষটি বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ইতিহাসে ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। প্রতি ১০ হাজার মহিষে মাত্র একটি এমন অ্যালবিনো বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম নিতে পারে। এ কারণেই মহিষটিকে সংরক্ষণের জন্য জাতীয় চিড়িয়াখানায় নেওয়া হয়েছে (সমকাল অনলাইন)।
তবে একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, গবেষক ও খামারিরা বলছেন, অ্যালবিনো মহিষ ‘বিরল’ নয়। তাঁদের মতে, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন খামারে অ্যালবিনো মহিষ পালন করা হচ্ছে। বিশেষত সাভার, উত্তরাঞ্চল ও উপকূলীয় অঞ্চলের কিছু খামারে গোলাপি মহিষ দেখা যায়। উপরন্তু, ঢাকার উপকণ্ঠের আশুলিয়ার শ্রীপুর গণকবাড়ী এলাকায় কাইয়ুম অ্যাগ্রো নামের একটি খামারে বর্তমানে প্রায় অর্ধশত অ্যালবিনো বা গোলাপি রঙের মহিষ রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই গোলাপি মহিষ বিক্রি করছেন এ খামারি।
মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্প নামকরণই যে সরকারের বিড়ম্বনার কারণ, তা স্পষ্ট। মহিষটির ডোনাল্ড ট্রাম্প নামকরণে সরকারের কোনো হাত ছিল না। তবে দুকড়ি দত্তেরই মতো তারা ওই নামকরণের দৌলতে মহিষটির সেলিব্রিটি বনে যাওয়া, এমনকি তার ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অনুভূতিতে স্থান পাওয়া, সম্ভবত উপভোগ করছিলেন। সে কারণেই শুরুতে মহিষটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে একেবারে শেষ মুহূর্তে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়ে এতে হস্তক্ষেপ করেছেন তারা। অযাচিত খ্যাতি কখনও কখনও আনন্দের কারণ হলেও তা যে বিড়ম্বনাও ডেকে আনতে পারে, এ শিক্ষাটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
