ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্মরণ

শহীদ জিয়ার সেই শপথ

শহীদ জিয়ার সেই শপথ
×

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ফাইল ছবি

সুলতান আহমেদ রাহী

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৬ | ১৭:১০

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরোত্তমের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ। বিশ্বের ইতিহাসে এমন কিছু নেতা আছেন, যাঁদের জীবন, কর্ম ও আদর্শ সময়ের সীমা অতিক্রম করে জাতির প্রেরণার উৎস হয়ে থাকে। শহীদ জিয়া তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবেই নন, বরং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের সাহসী রূপকার হিসেবেও ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক নির্মম সামরিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শাহাদাতবরণ করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর মৃত্যু শুধু একজন রাষ্ট্রপতির মৃত্যু ছিল না, বরং তা ছিল বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ওপর গভীর আঘাত। কিন্তু ব্যক্তি জিয়ার মৃত্যু হলেও তাঁর আদর্শ, দর্শন ও দেশগঠনের স্বপ্ন আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্ভিক্ষ, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায় বিপর্যস্ত। জনগণের মধ্যে হতাশা বাড়ছিল। সেই কঠিন বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু স্বাধীনতা অর্জনই যথেষ্ট নয়, স্বাধীনতার সুফল জনগণের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে না পারলে সেই স্বাধীনতা অর্থবহ হবে না।

এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেছিলেন: ‘জনসাধারণের সেই প্রত্যাশা আজও পূর্ণ হয়নি। তাহা পূরণ করিবার জন্য আমাদের নতুন করিয়া শপথ লইতে হইবে’। এই আহ্বান ছিল মূলত স্বাধীনতার চেতনায় দেশ পুনর্গঠন, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং জনগণকে নতুন উদ্যমে দেশগঠনে সম্পৃক্ত করার ডাক। তিনি জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন যে, স্বাধীনতা কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি রক্ষা করতে প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম, সততা, শৃঙ্খলা, আত্মনির্ভরতা এবং দেশপ্রেম। সেই ভাষণে তিনি আরও সতর্ক করেছিলেন, কিছু দেশবিরোধী চক্র বিদেশি প্ররোচনায় বিভ্রান্ত যুবকদের ব্যবহার করে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্টের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তাঁর এই দূরদর্শিতা আজও বিস্ময় জাগায়। কারণ সময় বদলেছে, কিন্তু ষড়যন্ত্রের ধরন বদলালেও উদ্দেশ্য বদলায়নি।

শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি এবং জনগণের ক্ষমতায়ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের প্রকৃত শক্তি জনগণ। তাই তিনি গ্রাম ও কৃষিকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন কর্মসূচি, গ্রামীণ উন্নয়ন, শিল্প উৎপাদন সম্প্রসারণ, রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ভিত নির্মাণ এবং আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গঠনে তাঁর অবদান আজ ও স্মরণীয়। তৎকালীন বিশ্বে বাংলাদেশকে যখন ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে অপমান করা হতো, তখন জিয়াউর রহমান জাতিকে আত্মবিশ্বাসী হতে শিখিয়েছিলেন। তিনি জনগণকে বুঝিয়েছিলেন, বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায় এবং মুসলিম বিশ্বসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ২৬ মার্চের সেই ভাষণেই তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেনঃ ‘বাংলাদেশ চিরদিন বাঁচিয়া থাকিবে। আমাদের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে আমরা কিছুতেই ক্ষুণ্ণ হইতে দিব না’। এই উচ্চারণ শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার এক দৃঢ় অঙ্গীকার। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায়ও তাঁর এই অবস্থান অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

জিয়াউর রহমান তরুণ সমাজকে জাতির ভবিষ্যৎ শক্তি হিসেবে দেখতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, যুবসমাজ যদি আদর্শ, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়, তাহলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। তাই তিনি যুবকদের হতাশা, সংঘাত ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতি থেকে বের হয়ে শিক্ষা, উৎপাদন ও দেশগঠনের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

আজকের বাংলাদেশেও জিয়াউর রহমানের সেই ‘নতুন শপথ’ নতুনভাবে গুরুত্ব বহন করে। রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক অস্থিরতা, নৈতিক অবক্ষয় ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের সময়ে তাঁর আদর্শ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, দেশপ্রেম মানে শুধু আবেগ নয়, বরং দায়িত্ব, সততা, ত্যাগ এবং জনগণের কল্যাণে অবিচল প্রতিশ্রুতি।

৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরোত্তমের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে তাঁর আদর্শ ধারণ করা এবং সেই আদর্শ বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। আমাদের নতুন করে শপথ নিতে হবে, জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করব, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করব, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করব এবং একটি আত্মনির্ভর, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ গড়ে তুলব।

শহীদ জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

সুলতান আহমেদ রাহী: সভাপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল

আরও পড়ুন

×