নিরাপত্তা
যে সমাজে শিশুরা নিরাপদ নয়
খায়ের মাহমুদ
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬ | ২২:০৮ | আপডেট: ০১ জুন ২০২৬ | ১৭:২৮
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন, বিশেষত কন্যাশিশু বা ক্ষেত্রবিশেষে বালকদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাগুলো সাম্প্রতিক সময়ে এমন ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে, যেটাকে এখন কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ ভাবার সুযোগ নেই। বরং গভীর সামাজিক, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের প্রতিফলন। পল্লবীর সাত বছর বয়সী শিশুটির ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শিশু ধর্ষণচেষ্টা, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনাসহ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। জনতার বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, মানববন্ধনের মতো প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে সমাজ এই পরিস্থিতিকে আর স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে না।
শিশু নির্যাতন নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের সামগ্রিক পরিসংখ্যানও বাংলাদেশের জন্য গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত অন্তত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার এবং অন্তত ১৭ জন শিশু ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যার শিকার হয়েছে। আবার ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২০ মাসে ৬৪৩ জন শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের পর প্রাণ হারিয়েছে, যা প্রতি মাসে গড়ে ৩২ জনের বেশি। দীর্ঘ সময়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, গত এক দশকে পাঁচ হাজার ছয়শর বেশি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সঙ্গে ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১-১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে ৯ জনই কোনো না কোনো ধরনের সহিংস আচরণের শিকার হয়।
ভয়ংকর দিক হলো, অপরাধীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিচিত ব্যক্তি, যেমন প্রতিবেশী বা আত্মীয়। ফলে শিশুদের নিরাপত্তা শুধু জনপরিসরে নয়, বরং ব্যক্তিগত পরিসরেও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। সামাজিক লজ্জা, ভয় এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপের কারণে অনেক পরিবার এই ঘটনাগুলো প্রকাশ বা মামলা করতে চায় না, যা অপরাধীদের জন্য এক ধরনের নীরব সুরক্ষা তৈরি করে।
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শক্তিশালী আইনি কাঠামো হিসেবে প্রণীত হয়। এই আইনে ধর্ষণ, ধর্ষণজনিত মৃত্যু, অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে, যার মধ্যে মৃত্যুদণ্ডও অন্তর্ভুক্ত। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, ডিএনএ পরীক্ষা, সাক্ষী সুরক্ষা এবং ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে বাস্তবে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে এই আইনের কার্যকারিতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারছে না।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়বদ্ধতার মধ্যে রয়েছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, শিশুদের প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, সুরক্ষা প্রদান এবং ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। একইভাবে সিডো সনদে কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। ইউনিসেফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি একটি সমন্বিত জাতীয় শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি, যেখানে সামাজিক সেবা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় থাকবে।
উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। যুক্তরাজ্যের ‘চিলড্রেন অ্যাক্ট’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিএপিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক রিপোর্টিং, দ্রুত তদন্ত ও পুনর্বাসনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব দেশে শুধু শাস্তি নয়, বরং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা– যেমন পরিবার পর্যবেক্ষণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কার্যক্রম এবং মানসিক সহায়তা– একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে শিশু সুরক্ষাকে সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থার মূল অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা বাংলাদেশে এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
আইনের শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে আমার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সমস্যা আইনের অভাব নয়, বরং আইনের কার্যকর প্রয়োগের অভাব।
আমরা দেখছি, আইন কঠোর কিন্তু বিচার ধীর; আইন আছে কিন্তু প্রয়োগে দুর্বলতা; শাস্তির বিধান আছে কিন্তু তার বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এই বৈপরীত্যই বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে এবং অপরাধীর মধ্যে ভয়ের পরিবর্তে এক ধরনের অব্যাহতির মনোভাব তৈরি করে। ফলে আইন তার প্রতিরোধমূলক কার্যকারিতা হারাতে বসেছে।
আমার মতে, বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত, ‘দ্রুত ও নিশ্চিত বিচার’– শুধু দ্রুত নয়, বরং এমন বিচার যা দৃষ্টান্ত তৈরি করে। দ্বিতীয়ত, ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’– স্কুল, পরিবার এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা ও নজরদারি বাড়ানো। তৃতীয়ত, ‘ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক বিচারব্যবস্থা’– যেখানে শিশুর মানসিক পুনর্বাসন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের দিকটি সমান গুরুত্ব পাবে।
একই সাথে শিশু নির্যাতন মোকাবিলায় শুধু কঠোর আইন নয়, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রয়োজন আছে। একটি শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন শুধু তার শরীর নয়, তার মানসিক জগৎও ভেঙে পড়ে। তাই বিচার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি তার পাশে দাঁড়ানো, তাকে মানসিকভাবে পুনর্গঠনে সাহায্য করা, এসব বিষয় আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। একই সাথে পরিবার, স্কুল এবং সমাজকে আরও সচেতন হতে হবে, শিশু যেন ভয় না পায়, কথা বলতে পারে, সাহায্য চাইতে পারে, এই পরিবেশ তৈরি করা সবচেয়ে জরুরি।
মনে রাখতে হবে, শিশু নির্যাতন কোনো একক আইনি সমস্যা নয়; এটি বহুমাত্রিক সংকট, যেখানে আইন, সমাজ এবং নৈতিকতা, সবকিছুর সমন্বিত ব্যর্থতা কাজ করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইনের কার্যকর প্রয়োগ, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনুসরণ এবং উন্নত দেশগুলোর সফল অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে প্রতিটি নতুন ঘটনা কেবল আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে, আর আমরা একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ ক্রমাগত হারাতে থাকব।
তাই শেষ প্রশ্নটি আমাদের সামনে থেকেই যায়, ‘শিশুর নিরাপত্তা না থাকলে, কেমন সেই সমাজ’? যে সমাজ তার সবচেয়ে নিরীহ সদস্যদের রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজ উন্নত হলেও মানবিক নয়। যে সমাজে শিশু ভয় নিয়ে বড় হয়, সেখানে কোনো অগ্রগতি সত্যিকার অর্থে পূর্ণতা পায় না। আর যে সমাজে একটি শিশুর কান্না আমাদের নড়বড়ে করে না, সেখানে আমাদের মানবিকতাকেই নতুন করে প্রশ্ন করতে হয়। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের, আমরা কি এমন একটি সমাজ গড়ব, যেখানে শিশুরা ভয় না পেয়ে হাসতে পারবে, নাকি এমন এক বাস্তবতা মেনে নেব, যেখানে প্রতিটি নতুন শিরোনামে আরেকটি শিশুর হারিয়ে যাওয়া গল্প জুড়ে যাবে?
খায়ের মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়; পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব লেস্টার, যুক্তরাজ্য
- বিষয় :
- শিশু হত্যা
- শিশুকে নির্যাতন
